নির্বাচনী ফল ঘোষণার আগের দিন গিনি-বিসাউয়ের ক্ষমতা নিল সেনাবাহিনী, রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে এক জেনারেল
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনি-বিসাউয়ে সেনা অভ্যুত্থানের পর জেনারেল হর্তা এন'টামকে দেশের নতুন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) দেশটির সেনাসদরে এক সংক্ষিপ্ত ও সাদামাটা আয়োজনে তিনি শপথ গ্রহণ করেন। তাকে এক বছরের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। খবর বিবিসি'র।
এর আগে জেনারেল এন'টাম প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শপথ গ্রহণের সময় তাকে বেশ গম্ভীর দেখাচ্ছিল।
এই অভ্যুত্থানকে ঘিরে দেশটির ভেতরেই বড় ধরনের অভিযোগ উঠেছে। গিনি-বিসাউয়ের সুশীল সমাজের একটি অংশের দাবি, বিদায়ী প্রেসিডেন্ট উমারো সিসোকো এমবালো নিজেই সেনাবাহিনীর সহায়তায় এই 'সাজানো অভ্যুত্থান' ঘটিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, গত রোববারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে যাওয়ার আশঙ্কায় ফলাফল প্রকাশ ঠেকাতেই তিনি এই কৌশল নিয়েছেন। ২৭ নভেম্বর নির্বাচনের ফল প্রকাশের কথা ছিল।
এমবালোর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ফার্নান্দো দিয়াসও একই অভিযোগ করেছেন। তবে এমবালো এসব অভিযোগের কোনো জবাব দেননি। এর আগেও তিনি একাধিকবার তার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান চেষ্টার অভিযোগ তুলেছিলেন, যা বিরোধীদের মতে ভিন্নমত দমনের অজুহাত।
সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে এবং নির্বাচনের ফল প্রকাশও আটকে দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সেনা কর্মকর্তা সংবাদ সংস্থা এএফপি-কে জানিয়েছেন, এমবালোকে সেনাসদরে আটক রাখা হয়েছে এবং তার সঙ্গে 'ভালো আচরণ' করা হচ্ছে।
ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আফ্রিকান ইউনিয়ন (এইউ)। সংস্থার চেয়ারম্যান মাহমুদ আলি ইউসুফ অবিলম্বে প্রেসিডেন্ট এমবালো ও আটক অন্যান্য কর্মকর্তাদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি চলমান নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানান।
অভ্যুত্থানের ঘোষণা দেওয়ার ঠিক আগেই নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়, প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে গুলির শব্দ শোনা গেছে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। গুলিবর্ষণ প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলে এবং গ্রিনিচ মান সময় দুপুর ২টা ( পূর্বাঞ্চলীয় সময় অনুসারে সকাল ৯টা) নাগাদ থেমে যায় বলে জানিয়েছেন রয়টার্সের এক সাংবাদিক।
নাম না প্রকাশের শর্তে বিসাউয়ের এক গাড়িচালক সেসময়ের আতঙ্কের দৃশ্যের বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, 'মানুষ চারদিকে দৌড়াচ্ছে।'
তবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
গত রোববারের নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল বৃহস্পতিবার প্রকাশ করার কথা ছিল নির্বাচন কমিশনের। প্রথম দফা ভোটের পর উভয় পক্ষই বিজয়ের দাবি করেছিল।
গিনি-বিসাউয়ে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে জয়ী হওয়া গত তিন দশকে কোনো প্রেসিডেন্টের পক্ষে সম্ভব হয়নি; এমবালো সেই রেকর্ড গড়ার লক্ষ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন।
এমবালোর মুখপাত্র আন্তোনিও ইয়ায়া সেইদি রয়টার্সের কাছে দাবি করেন, হামলাকারীরা দিয়াসের সঙ্গে যুক্ত, যদিও এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ তিনি দেননি। এদিকে, মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি দিয়াসের মুখপাত্র।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী দোমিঙ্গোস সিমোয়েস পেরেইরা ২০১৯ সালের বিতর্কিত রানঅফে এমবালোর কাছে হেরে যান। তিনি এ নির্বাচনে দিয়াসকে সমর্থন দিয়েছিলেন। তিনি জানান, এই ঘটনার সঙ্গে দিয়াসের কোনো সম্পর্ক নেই।
দিয়াস নিরাপদে আছেন এবং বিসাউতেই অবস্থান করছেন বলে জানান পেরেইরা।
অভ্যুত্থানের ইতিহাস
সেনেগাল ও গিনির মাঝখানে অবস্থিত গিনি-বিসাউ মাদক পাচারের রুট হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৪ সালে পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই দেশটির রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। গত পাঁচ দশকে দেশটিতে অন্তত ৯ বার অভ্যুত্থান বা অভ্যুত্থান চেষ্টা হয়েছে।
এমবালো বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে অন্তত তিনটি অভ্যুত্থানচেষ্টা হয়েছে। তবে তার সমালোচকরা অভিযোগ করেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে দমন-পীড়ন চালাতে সংকট তৈরি করতেন ও অতিরঞ্জিত করে দেখাতেন।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গুলির শব্দ শোনা যায়, যা এমবালোর সরকার এক অভ্যুত্থানচেষ্টা বলে উল্লেখ করেছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় এমবালো সংসদ ভেঙে দেন, এবং তখন থেকে দেশটিতে কার্যকর কোনো আইনসভা নেই।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানচেষ্টার ঘটনা ঘটে অক্টোবরের শেষ দিকে, যখন কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে যে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের সন্দেহে বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রোববারের ভোটের আগে পরিস্থিতিও ছিল উত্তেজনাপূর্ণ। বিরোধীরা দাবি করেন, এমবালো ইতিমধ্যেই তার মেয়াদ অতিগ্রহণ করেছেন।
এমবালোর শাসনামলের সময় কোকেন পাচারের ব্যবসা যেন আরও প্রসারিত হয়েছে। ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইমের বিরুদ্ধে গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভের আগস্ট রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এটি এখন আগের চেয়ে বেশি লাভজনক হতে পারে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিচার বিভাগীয় পুলিশ জানিয়েছে যে ভেনেজুয়েলা থেকে বিসাউয়ে অবতরণ করা একটি বিমান থেকে তারা ২.৬৩ টন কোকেন জব্দ করেছে।
