ইউক্রেন শান্তি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া ট্রাম্পের ‘ড্রোন মানব’ কে এই ড্যান ড্রিসকল
গত সপ্তাহে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন শান্তি পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার পর পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। ঠিক সেই সময়ই ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে পাঠান এমন একজনকে, যাকে এই ভূমিকায় দেখা অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল। খবর বিবিসি'র।
৩৯ বছর বয়সী ড্যান ড্রিসকল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে কমবয়সী আর্মি সেক্রেটারি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর কাছে তিনি 'ড্রোন গাই' বা 'ড্রোন মানব' নামে পরিচিত—যুদ্ধক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রতি তার গভীর আগ্রহের কারণেই এই পরিচয়।
এতদিন তিনি মূলত সেনাবাহিনীর বাজেট, রসদ ও জনবলসংক্রান্ত কাজেই যুক্ত ছিলেন। রাশিয়া বা ইউক্রেন নিয়ে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তো নেই-ই, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও তার কোনো পটভূমি নেই। এমনকি এর আগে তিনি কখনো কোনো সরকারি পদেও দায়িত্ব পালন করেননি।
স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে—প্রশাসনের ভেতরে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এই ব্যক্তি আসলে কে?
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ঘনিষ্ঠ মিত্র
প্রশাসনে ড্রিসকলের প্রভাব বাড়ার মূল কারণ ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স-এর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ভ্যান্সের মাধ্যমেই তিনি ট্রাম্পের নজরে আসেন।
বন্ধু ভ্যান্সের মতোই ড্রিসকলও প্রথমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরে মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এরপর তিনি ইয়েল ইউনিভার্সিটি থেকে আইনের ডিগ্রি নেন। পড়াশোনা শেষ করে দুজনেই কিছুদিন ফিন্যান্স সেক্টরে কাজ করেন।
সামরিক জীবনে ড্রিসকল ২০০৭ সালে সেনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি একটি ক্যাভালরি প্লাটুনের নেতৃত্ব দেন এবং ২০০৯ সালে কয়েক মাস ইরাকে দায়িত্ব পালন করেন।
আইন স্কুলে পড়ার সময় একটি ভেটেরান ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে ভ্যান্সের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ড্রিসকল জানান, ভ্যান্স তখন নতুন ছাত্রদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, শুরুতে নিজেদের বেমানান মনে হলেও কয়েক মাস পর সবাই ঠিকই মানিয়ে নেবেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ভ্যান্স তার বন্ধু ও মেন্টরে পরিণত হন।
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে ড্রিসকল পরিবারের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডে ছুটি কাটাচ্ছিলেন। তখন ভ্যান্স তাকে ফোন করে জানান, তিনি ট্রাম্পের রানিং মেট (ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী) হতে যাচ্ছেন এবং প্রচারণায় যোগ দিতে বলেন।
ড্রিসকল তার পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ ক্যারোলাইনা-এর অ্যালামনাই ম্যাগাজিনকে জানান, ফোন পাওয়ার পরদিনই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন। এরপর একটি আউটলেট মল থেকে তড়িঘড়ি করে একটি স্যুট কেনেন এবং উবার নিয়ে সরাসরি রিপাবলিকান ন্যাশনাল কনভেনশনে যোগ দেন।
ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর সিনেটের ভোটে দ্রুত আর্মি সেক্রেটারি হিসেবে ড্রিসকলের নিয়োগ নিশ্চিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে 'ন্যাশনাল গার্ড' মোতায়েনের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের হয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যা প্রশাসনে তার প্রভাব আরও বাড়িয়ে দেয়। পরে তিনি 'ব্যুরো অফ অ্যালকোহল, টোব্যাকো, ফায়ারআর্মস অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভস'-এর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পান।
ইউক্রেনে আকস্মিক সফর
ড্রিসকল প্রায়ই ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে বেশ কার্যকর, কারণ এগুলো তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং বিপুল পরিমাণে তৈরি করা সম্ভব।
তবে আর্মি সেক্রেটারি পদে মনোনীত হওয়ার পর শুরুতে তাকে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় তেমন দেখা যায়নি। সেই পর্যায়ে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির পরিকল্পনায় মূলত তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ-এর ওপরই নির্ভর করছিলেন।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার যৌথ প্রণীত ২৮ দফার একটি পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। এর কিছু মূল বিষয় নিয়ে ইউক্রেন তাৎক্ষণিক উদ্বেগ জানায়—পরে তাদের ইউরোপীয় মিত্ররাও একই সুরে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
এ পরিস্থিতির পরপরই পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে ইউক্রেনে এক অঘোষিত সফরে যান ড্রিসকল। জানুয়ারিতে ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর কিয়েভ সফরকারী এটিই ছিল সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ মার্কিন সামরিক প্রতিনিধিদল। মার্কিন সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র জানান, ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং যুদ্ধ অবসানের প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করাই এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল।
ড্রিসকল প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর তথ্যমতে, এরপর তাকে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে এক সংবর্ধনাও দেওয়া হয়।
এরপরের দিনগুলোতে জেনেভায় ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আরও আলোচনায় অংশ নেন ড্রিসকল। সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই মিলে একটি 'হালনাগাদকৃত ও পরিমার্জিত শান্তি কাঠামো' তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।
সিবিএস নিউজ-এর তথ্য অনুযায়ী, এরপর তিনি আবুধাবিতে রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
মঙ্গলবার ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, শান্তি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার অংশ হিসেবে তিনি তার দূত স্টিভ উইটকফকে মস্কোয় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন-এর সঙ্গে দেখা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আরও জানান, ড্রিসকল ইউক্রেনীয় পক্ষের সঙ্গেও বৈঠকে অংশ নেবেন।
ভবিষ্যৎ দূত... নাকি প্রতিরক্ষামন্ত্রী?
আর্মি সেক্রেটারি হিসেবে ড্যান ড্রিসকলকে মনোনয়ন দেওয়ার সময় ট্রাম্প লিখেছিলেন, 'তার অভিজ্ঞতার এমন এক শক্তিশালী সংমিশ্রণ রয়েছে, যা তাকে একজন প্রথা ভেঙে দেওয়া ব্যক্তি এবং আমূল পরিবর্তনকারী হিসেবে কাজ করতে সাহায্য করবে।'
ওয়াশিংটনে এখন কেউ কেউ ভাবছেন, ড্রিসকলের এই যোগ্যতা ও বিশ্বমঞ্চে তার সাম্প্রতিক উত্থান কি বড় কোনো সংকেত দিচ্ছে? প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যদি কখনো পদত্যাগ করেন, তবে ড্রিসকল কি তার জায়গা নিতে পারেন?
যদিও তিনি আগে কখনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না, ড্রিসকল কংগ্রেসে সিনেটের 'ভেটেরান অ্যাফেয়ার্স কমিটি'-তে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করেছেন। ২০২০ সালে নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস) একটি আসনে দাঁড়িয়ে তিনি পরাজিত হন। তার এক সাবেক অধ্যাপক বলেছিলেন, ড্রিসকলের লক্ষ্য ছিল 'সেনাবাহিনীতে কাজ করা, আইন বিষয়ে পড়া এবং রাজনীতিতে আসা'।
এমন সম্ভাবনাও রয়েছে যে, ট্রাম্পের বিশেষ দূত কিথ কেলগ জানুয়ারিতে দায়িত্ব ছাড়লে ড্রিসকল আনুষ্ঠানিকভাবে ইউক্রেন বিষয়ক মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব পেতে পারেন।
অথবা তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীর লাখ লাখ সদস্যের প্রধান হিসেবেই থেকে যেতে পারেন। ড্রিসকল আগেই জানিয়েছেন, তার বাবা ও দাদাও সেনাবাহিনীতে ছিলেন। তিনি প্রায়ই সেনাবাহিনীকে আধুনিকভাবে পুনর্গঠনের স্বপ্নের কথা বলেন।
ইউক্রেন সফরের কয়েক দিন আগে 'দ্য কনভারসেশন' পডকাস্টে ড্রিসকল ভবিষ্যতের যুদ্ধের একটি রূপরেখা তুলে ধরেন। তার মতে, অদূর ভবিষ্যতে 'প্রতিটি পদাতিক সেনা যুদ্ধে ড্রোন বহন করবে' এবং সেনাদের আরও বেশি নির্ভর করতে হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ওপর। কারণ, যুদ্ধের দ্রুতগতির সঙ্গে মানুষের মস্তিষ্ক তখন আর তাল মেলাতে পারবে না।
অক্টোবরে এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, 'পরিবর্তনের সময় এখনই। আর আমরা জয়ী হব সিলিকন ও সফটওয়্যার (প্রযুক্তি) দিয়ে—আমাদের সেনাদের রক্ত বা শরীর দিয়ে নয়।'
