বিশ্বের প্রথম কার্বন-নেগেটিভ দেশ ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর বার্তা: ‘জনগণের ভালো থাকাই আমাদের মূল এজেন্ডা’
জলবায়ু সংকটের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী পশ্চিমা ধনী দেশগুলো যদি পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে তাদের নাগরিকদের স্বাস্থ্য ও সুখ—উভয়ই বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বের প্রথম কার্বন-নেগেটিভ দেশ ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে এমনটাই মনে করেন।
পূর্ব হিমালয়ের কোলে অবস্থিত জীববৈচিত্র্যে ভরপুর গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেশ ভুটান বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম উন্নত জলবায়ু্র দেশ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী তোবগে বলেন, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক এবং জিডিপির চেয়ে 'মোট জাতীয় সুখ' বা গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস (জিএনএইচ) বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার কারণেই এই অর্জন সম্ভব হয়েছে।
তোবগে বলেন, 'সীমিত সম্পদ আর বিশাল ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও আমরা জলবায়ু কার্যক্রম, সামাজিক অগ্রগতি, সংস্কৃতি রক্ষা এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে পেরেছি। কারণ, আমাদের উন্নয়ন এজেন্ডার কেন্দ্রে রয়েছে জনগণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুখ এবং ভালো থাকা।"
তিনি আরও বলেন, 'আমরা যদি এটি করতে পারি, তবে উন্নত ধনী দেশগুলোর—যাদের সম্পদ ও রাজস্ব অনেক বেশি—অবশ্যই কার্বন নিঃসরণ কমাতে এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আরও অনেক বেশি কিছু করা উচিত।"
জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন যখন শেষ পর্যায়ে, তখন ভুটানের জলবায়ু প্রতিশ্রুতি সবার নজর কেড়েছে। দেশটির অর্থনীতির প্রতিটি খাতে কার্বন প্রশমনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জলবিদ্যুৎ, সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং গ্রিন হাইড্রোজেনের মতো নবায়নযোগ্য শক্তির উৎপাদন বৃদ্ধি। পাশাপাশি পরিবহন, ভবন নির্মাণ এবং কৃষি খাতেও দক্ষতা বৃদ্ধি ও কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
চীন ও ভারতের মাঝখানে অবস্থিত স্থলবেষ্টিত দেশ ভুটানের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে সাত লাখ, যার অর্ধেকই কৃষিজীবী। ২০২৩ সালে ভুটান জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়া সপ্তম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। গত তিন দশকে গণতন্ত্রে উত্তরণের পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা এবং গড় আয়ু বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির ফলে এই সাফল্য এসেছে।
তবে এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পরিবেশ নষ্ট করে আসেনি। বরং পরিবেশের মানদণ্ড কঠোর করে এবং বায়ু, পানি ও মাটির গুণমান রক্ষা করেই তারা এগিয়েছে। তোবগে বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য হলো মোট জাতীয় সুখ। জিডিপি কেবল একটি হাতিয়ার মাত্র। এর মানে হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এমন হওয়া যাবে না যা জনগণের সুখ বা ভালো থাকার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।"
তবে এলডিসি তালিকা থেকে বের হওয়া ভুটানের জন্য একটি বড় মাইলফলক হলেও এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল, সাহায্য এবং কারিগরি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ কমে গেছে। অথচ বন্যা, খরা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত দেশটিতে বেড়েই চলেছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নে ভুটানের অবদান নগণ্য। দেশটির ৭২ শতাংশ এলাকা বনাঞ্চল, যা কার্বন শোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকারের মতে, প্যারিস চুক্তির ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্যের সঙ্গে পুরোপুরি বা প্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা নেওয়া হাতেগোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে ভুটান অন্যতম।
ভুটানের এই পরিবেশপ্রেম কেবল জাতিসংঘের জলবায়ু প্রক্রিয়ার অংশ নয়, এর শেকড় আরও গভীরে। ভুটানিরা বিশ্বাস করেন, প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানে তাদের দেবতারা বাস করেন। একারণেই দেশটির বন এবং নির্দিষ্ট কিছু জলাশয়ে মানুষের প্রবেশ নিষেধ। এমনকি পর্বতারোহণও সেখানে নিষিদ্ধ। বিশ্বের সর্বোচ্চ আরোহণ না করা পর্বত 'গাংখার পুয়েনসাম' (উচ্চতা ৭,৫০০ মিটারের বেশি) ভুটানেই অবস্থিত।
দেশটির সংবিধানের একটি সম্পূর্ণ অনুচ্ছেদ পরিবেশ রক্ষার জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে, যেখানে দেশের অন্তত ৬০ শতাংশ এলাকা সবসময় বনাচ্ছাদিত রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সরকার ও প্রতিটি নাগরিকের জন্য পরিবেশ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সব ধরনের পরিবেশগত অবক্ষয় রোধ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তোবগে বলেন, 'আমরা যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করি, তার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি শোষণ করছি। আমরা জীববৈচিত্র্য ও বনের যত্ন নিচ্ছি। আমরা 'নেচার পজিটিভ' এবং 'কার্বন নেগেটিভ' একটি দেশ। তবুও স্থলবেষ্টিত পাহাড়ি দেশ হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে খারাপ প্রভাব আমাদেরই পোহাতে হচ্ছে।'
বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে পর্বতমালা। ফলে ভুটানের হিমবাহ গলছে এবং হ্রদ উপচে পড়ছে। বন্যায় কৃষিভিত্তিক জনপদগুলো বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং রাস্তাঘাট মেরামতের খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
তোবগে বলেন, 'উন্নত বিশ্বকে তাদের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব পালন করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অভিযোজন এবং নিঃসরণ কমাতে অর্থ ও প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করতে হবে। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো, তাদের নিজেদের কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। ভুটানের মতো ছোট দেশগুলো তাদের সাধ্যের চেয়েও বেশি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভয়াবহ, এমনকি ধনী দেশগুলোর জন্যও।'
গত বছর 'কপ-২৯' সম্মেলনে ভুটান পানামা, সুরিনাম এবং মাদাগাস্কারের সঙ্গে মিলে একটি জোট গঠন করে। এই তিনটি দেশও কার্বন-নেগেটিভ বা কার্বন-নিউট্রাল। বৈশ্বিক জলবায়ু কার্যক্রমে তাদের বিশাল অবদানের স্বীকৃতি আদায় এবং জাতিসংঘের জলবায়ু আলোচনায় প্রভাব বিস্তার করাই এই জোটের লক্ষ্য।
তোবগে আক্ষেপ করে বলেন, 'জলবায়ু পরিবর্তনের সব আলোচনায় কেবল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতির ওপর জোর দেওয়া হয়, আসল ফলাফলের ওপর নয়। আমরা চাই আমাদের অবদান এবং আমরা যেসব সুযোগ ত্যাগ করেছি, তার স্বীকৃতি ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক। এটি অন্য দেশগুলোকে কেবল কার্বন নিউট্রাল হওয়ার স্বপ্ন দেখাতেই নয়, বরং দ্রুত সেই লক্ষ্যে কাজ করতে উৎসাহিত করবে। প্রায়ই দেখা যায় খারাপ আচরণের স্বীকৃতি ও পুরস্কার মেলে, আর ভালো কাজকে গুরুত্ব না দিয়ে অবহেলা করা হয়। আমাদের এই ধারা উল্টে দিতে হবে।'
গত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে তথাকথিত 'জি-জিরো' দেশগুলোর নেতারা বৈঠক করেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, আগামী বছর ভুটানে এই জোটের উদ্বোধনী শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সেখান থেকে পিছিয়ে থাকা উন্নত বিশ্বের প্রতি জলবায়ু সমাধানের বার্তা দেওয়া হবে।
তোবগে বলেন, 'আপনারা শিল্পোন্নত দেশ হতে পারেন, শিল্পায়নের সুফল আপনারা ভোগ করেছেন এবং বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এখন সময় এসেছে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি তা বিচার করার। আপনাদের শিল্পায়ন বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্টে ফেলার দরকার নেই, তবে একে টেকসই করতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'জিডিপি কিসের জন্য? কার্বন নিঃসরণ কমানো কিসের জন্য? সবকিছুই তো জনগণের সুখ ও ভালো থাকার জন্য হতে হবে। আমরা যা-ই করি না কেন, পৃথিবী টিকে থাকবে। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণ বা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এই জরুরি তাগিদ এখন আমাদের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের জন্য।'
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, 'আমরা আমাদের জনগণের যত্ন নিচ্ছি, আমাদের অর্থনীতি বাড়ছে এবং একই সঙ্গে আমরা পরিবেশকেও রক্ষা করতে পেরেছি। যদি আমাদের মতো ছোট উন্নয়নশীল দেশ এটি করতে পারে, তবে বড় দেশগুলো কেন বড় ভূমিকা রাখতে পারবে না, তার কোনো অজুহাত হতে পারে না। সর্বোপরি, তারাই তো বিশ্বের নেতা।'
