জাতিসংঘে ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা অনুমোদন, গঠন করা হবে আন্তর্জাতিক বাহিনী
গাজা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ দফা পরিকল্পনাকে সমর্থন জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের করা একটি খসড়া প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। খবর বিবিসি'র।
পরিকল্পনায় একটি 'ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স' (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠনের প্রস্তাব রয়েছে, যেখানে একাধিক নামহীন দেশ অবদান রাখার আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও সোমালিয়াসহ পরিষদের ১৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। কোনো দেশই বিরোধিতা করেনি। রাশিয়া ও চীন ভোটদানে বিরত ছিলl।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র বলেন, প্রস্তাব গ্রহণ 'যুদ্ধবিরতি সুসংহত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ'। তবে হামাস প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, এটি ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও দাবির প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে।
প্রস্তাব পাস হওয়ার পর টেলিগ্রামে হামাস লিখেছে, পরিকল্পনাটি 'গাজা উপত্যকার ওপর একটি আন্তর্জাতিক অভিভাবকত্ব চাপিয়ে দিচ্ছে, যা আমাদের জনগণ এবং তাদের দলগুলো প্রত্যাখ্যান করে'।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, 'আন্তর্জাতিক বাহিনীকে গাজায় দায়িত্ব পালন করানো, যার মধ্যে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের নিরস্ত্রীকরণও রয়েছে, তাদের নিরপেক্ষতা নষ্ট করবে এবং দখলদারের স্বার্থে সংঘাতের পক্ষ হিসেবে দাঁড় করাবে।'
প্রস্তাব অনুযায়ী, আইএসএফ ইসরায়েল ও মিশরের পাশাপাশি একটি নতুন প্রশিক্ষিত ও পরীক্ষিত ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে কাজ করবে। এর লক্ষ্য, সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হামাসসহ 'অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে স্থায়ীভাবে নিরস্ত্র করার প্রক্রিয়া' গতিশীল করা।
এখন পর্যন্ত ওই এলাকার পুলিশ বাহিনী হামাসের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে।
জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ জানান, আইএসএফকে 'এলাকা সুরক্ষিত করা, গাজার নিরস্ত্রীকরণে সহায়তা করা, সন্ত্রাসী অবকাঠামো ভেঙে ফেলা, অস্ত্র অপসারণ করা এবং ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার' দায়িত্ব দেওয়া হবে।
এছাড়া, নিরাপত্তা পরিষদ 'বোর্ড অফ পিস' (বিওপি) নামে একটি অন্তর্বর্তীকালীন শাসন কাঠামো গঠনের অনুমোদন দেয়। এটি একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক, অরাজনৈতিক কমিটির তত্ত্বাবধানে গাজার পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তা তদারকি করবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, দুই বছরের যুদ্ধের পর গাজার পুনর্গঠনের অর্থায়ন বিশ্বব্যাংকের সমর্থিত একটি ট্রাস্ট ফান্ড থেকে আসবে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আইএসএফ এবং বিওপি উভয়ই একটি ফিলিস্তিনি কমিটি ও পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি কাজ করবে।
নিরাপত্তা পরিষদের এই ভোটকে 'ঐতিহাসিক' বলে অভিহিত করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেন, এটি বিওপি-কে 'স্বীকৃতি ও সমর্থন' দেওয়ার একটি উপায়। এর চূড়ান্ত সদস্যদের নাম শিগগিরই ঘোষণা করা হবে এবং তিনিই এর সভাপতিত্ব করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ট্রুথ সোশ্যাল–এ তিনি লিখেছেন, 'এটি জাতিসংঘের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম অনুমোদন হিসেবে স্থান পাবে, যা সারা বিশ্বে আরও শান্তি আনবে এবং এটি একটি সত্যিকারের ঐতিহাসিক মুহূর্ত!'
আগের খসড়াগুলোর তুলনায় এ প্রস্তাবে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রত্বের একটি বিশ্বাসযোগ্য পথের উল্লেখ রয়েছে, যা পরিষদের বেশ কয়েকজন সদস্য চেয়েছিলেন।
ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিরোধিতা করে আসছে, যা ভবিষ্যতের রাষ্ট্রগঠনের পথে বড় বাধা। অন্যদিকে, প্রধান আরব রাষ্ট্রগুলো খসড়া প্রস্তুতকারীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে চাপ দেয়।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র বলেন, প্রস্তাবটিকে 'মাঠ পর্যায়ে নির্দিষ্ট এবং জরুরিভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ... হিসেবে অনুবাদ' করতে হবে এবং এটি 'দুই-রাষ্ট্র সমাধান অর্জনের জন্য একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার' দিকে নিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) এবং মিশর, সৌদি আরব ও তুরস্কসহ বেশ কয়েকটি আরব ও মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ দ্রুত প্রস্তাবটি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। পিএ বলেছে, শর্তগুলো 'জরুরিভাবে এবং অবিলম্বে' বাস্তবায়ন করতে হবে।
রাশিয়া ও চীন ভেটো না দিলেও ভোটদানে বিরত থাকে—মূলত পিএসহ আরও আটটি আরব ও মুসলিম দেশের সমর্থনের কারণে তারা প্রস্তাব আটকে দেয়নি।
তবে মস্কো ও বেইজিং উভয়ই প্রস্তাবের সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, মূল প্রক্রিয়াগুলোর কাঠামো অস্পষ্ট, এতে জাতিসংঘের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত নয় এবং দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের অঙ্গীকারও যথেষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করা হয়নি।
পরিকল্পনার প্রাথমিক ধাপ—ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং জিম্মি-বন্দী বিনিময়—১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়েছে। রাষ্ট্রদূত ওয়াল্টজ একে 'ভঙ্গুর, ভঙ্গুর প্রথম পদক্ষেপ' বলে মন্তব্য করেছেন।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা কার্যত ইসরায়েল–হামাস যুদ্ধ স্থগিত করেছে। সংঘাতটি শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর, যেখানে প্রায় ১,২০০ জন ইসরায়েলি নিহত এবং ২৫১ জন জিম্মি হন।
হামাস-পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, এরপর থেকে গাজায় ইসরায়েলি অভিযানে ৬৯,৪৮৩ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
