রক্ত নয়, অন্য কিছুরও ক্ষুধা ছিল প্রাগৈতিহাসিক এই জোঁকের
যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনের ওয়াউকেশা কাউন্টির চারপাশে আজ যদি কেউ তাকায়, তাহলে হয়তো কল্পনাই করা কঠিন যে এই অঞ্চল এক সময় ছিল এক জীবন্ত ক্রান্তীয় উপকূল, যেখানে বাস করত ট্রাইলোবাইট, পৃথিবীর প্রাচীনতম বিচ্ছু, আর চোয়ালবিহীন মেরুদণ্ডী প্রাণী। কিন্তু ৪৩৭ মিলিয়ন বছর আগে, সিলুরিয়ান যুগে, এসব প্রাণী এখানেই বেঁচে ছিল, মারা যেত, আর অনেকেই জোয়ারের স্রোতে ভেসে গিয়ে আটকা পড়ত নোনাজলে — পরে মাইক্রোবের স্তরে আবৃত হয়ে আশ্চর্যজনকভাবে সংরক্ষিত হতো। এমনকি অনেক নরমদেহী প্রাণীর চোখ, পরিপাকতন্ত্র, এমনকি হৃদপিণ্ডের মতো অঙ্গের চিহ্নও থেকে গেছে এই জীবাশ্মে।
সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের এক দল এই অঞ্চলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য জীবাশ্ম আবিষ্কারের কথা জানিয়েছেন—যা এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রাচীনতম জোঁক প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত। বুধবার আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক জার্নাল "পিয়ারজে"-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এই পরজীবীটি জোঁকের অস্তিত্বের ইতিহাস অন্তত ২০০ মিলিয়ন বছর পেছনে ঠেলে দিয়েছে। গবেষকরা এর চমকপ্রদ শোষণক্ষমতা ও বিস্ময়কর খাদ্যাভ্যাসও তুলে ধরেছেন।
আজকের দিনে জোঁককে চিকিৎসা বিজ্ঞানে রক্ত টানার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, আবার এই প্রাণী জলাভূমি বা আদ্র বনভূমিতে চলাচলকারীদের জন্য ভয়ের কারণ। তবে এদের বিবর্তনীয় ইতিহাস আজও রহস্যাবৃত, কারণ নরম দেহের কারণে জোঁকের জীবাশ্ম খুবই বিরল।
"জোঁক হলো জীববিবর্তনের এমন এক শাখা যার ফসিল বা জীবাশ্মের রেকর্ড প্রায় শূন্য," বলেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রিভারসাইডের জীবাশ্মবিদ কারমা ন্যাংলু, যিনি গবেষণাপত্রটির সহলেখক।
ন্যাংলু দক্ষিণ-পূর্ব উইসকনসিনের খনিগুলোতে পাওয়া জীবাশ্ম নিয়ে একটি প্রবন্ধ পড়ছিলেন, যেখানে কৃমির মতো কিছু প্রাণীকে সম্ভাব্য জোঁক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তিনি বিষয়টি জানান টরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক জোঁক বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল দে কারলকে, যিনি নতুন গবেষণাটির প্রধান লেখক।
দে কারল বিশেষভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠেন যখন তিনি ম্যাডিসনের উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব জাদুঘরে রাখা প্রায় দুই ইঞ্চি লম্বা এক জীবাশ্মের ছবি দেখেন। "এটিই আমাদের কাছে সবচেয়ে 'জোঁকসদৃশ' মনে হয়েছে," তিনি বলেন। "ছবিটা দেখেই আমরা বুঝেছিলাম, আমাদের হাতে বিশেষ কিছু এসেছে।"
গবেষকরা ঘণ্টার মতো আকারের ওই জীবাশ্মটি বিশ্লেষণ করে একাধিক চিহ্নিত বৈশিষ্ট্য খুঁজে পান। প্রাণীটির শরীর খণ্ডিত এবং শেষ প্রান্তে একটি প্রশস্ত সাকার বা চোষক অঙ্গ রয়েছে, যা আধুনিক জোঁকের সেঁটে থাকার কাঠামোর সঙ্গে মিলে যায়। বিজ্ঞানীরা প্রাণীটির নাম দিয়েছেন "ম্যাক্রোমাইজন (বৃহৎ সাকার) সিলুরিকাস"।
ম্যাক্রোমাইজন প্রজাতিটি জোঁকের উদ্ভবকালকে সিলুরিয়ান যুগ পর্যন্ত পেছনে নিয়ে যায় এবং যা জোঁক গোত্রের সব প্রাণের বিবর্তন নিয়ে বিদ্যমান ধারণাগুলো প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আজকের দিনে অধিকাংশ জোঁক বাস করে মিঠাপানিতে, যা এতদিন এদের পূর্বপুরুষের আবাস হিসেবে বিবেচিত ছিল। কিন্তু ম্যাক্রোমাইজন ছিল এক নোনাজলীয় সামুদ্রিক প্রাণী।
বিজ্ঞানীরা এতদিন ধরে ধারণা করতেন, প্রাচীনতম জোঁক ছিল রক্তচোষা। আধুনিক জোঁকেরা, এমনকি যারা রক্ত খায় না তারাও, রক্ত জমাট বাধা প্রতিরোধকারী একগুচ্ছ রাসায়নিক বহন করে। কিন্তু ম্যাক্রোমাইজন যেহেতু এমন এক পরিবেশে বাস করত যেখানে মেরুদণ্ডী প্রাণী খুব কম ছিল, তাই শুধু রক্ত খেয়ে টিকে থাকা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
বরং গবেষকরা মনে করেন, এই প্রাণী হয়তো ছোট অমেরুদণ্ডী প্রাণী গিলে খেত বা তাদের শরীরের ভেতরের তরল শুষে নিত।
"আজকের কিছু জোঁক আর্থ্রোপোডের সঙ্গে লেগে থেকে তাদের দেহের নরম ঝিল্লির ফাঁক দিয়ে শরীরের তরল টেনে নেয়," বলেন দে কারল। "ওয়াউকেশা এলাকায় অনেক ট্রাইলোবাইটের জীবাশ্ম আছে, তাই আমরা মনে করি সেগুলোই হতে পারে এদের প্রধান খাদ্য উৎস।"
তবে মিলওয়াকি পাবলিক মিউজিয়ামের জীবাশ্মবিদ কেনেথ গ্যাস, যিনি গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না, বলেন যে ম্যাক্রোমাইজন -এর সামনের অংশ সম্পূর্ণ না থাকায় এটিকে নিশ্চিতভাবে জোঁক বলা কঠিন। গত বছর ড. গ্যাস ও তার সহকর্মীরা ওয়াউকেশার আরেকটি সন্দেহজনক জোঁক জীবাশ্ম নিয়ে গবেষণা করে দেখেছিলেন, সেটি আসলে একটি কৃমি যা খোলস বদলের মাঝপথে জীবাশ্মে পরিণত হয়েছিল। সেখানে যে "সাকার" দেখা গিয়েছিল, তা আসলে ঝরে পড়া ত্বক।
তবু ড. গ্যাস এখনও সম্ভাবনাটি উড়িয়ে দিচ্ছেন না যে প্রাগৈতিহাসিক উইসকনসিনে জোঁকেরা ট্রাইলোবাইটদের আতঙ্কে পরিণত হয়েছিল।
"যদি জোঁকের অস্তিত্ব এত প্রাচীন হয়, তাহলে ওয়াউকেশায় তাদের জীবাশ্ম পাওয়া মোটেই বিস্ময়কর নয়," তিনি বলেন।
