ভাজার জন্য কি অলিভ অয়েল ব্যবহার করা উচিত? কীভাবে বেছে নেবেন সঠিক রান্নার তেল
সুপারশপে থরে থরে সাজানো থাকে রান্নার নানা ধরনের তেল। এর মধ্যে যেমন তুলনামূলক কম দামের সূর্যমুখী ও ভেজিটেবল অয়েল বা ক্যানোলা তেল থাকে, তেমনি স্বাস্থ্য উপকারের দাবি করা বেশি দামের অলিভ, অ্যাভোকাডো ও নারকেল তেলও থাকে।
প্রশ্ন হলো আপনি কোনটি খাবেন বা আপনার কোন রান্নায় কোন তেল কাজে লাগবে তা বুঝবেন কীভাবে?
রান্নার তেল নিয়ে এই বিভ্রান্তি নতুন নয়। অলিভ, সূর্যমুখী, ক্যানোলা, নারকেল বা অ্যাভোকাডো—কোন তেল স্বাস্থ্যকর, আর কোনটি নয়—তা নিয়ে বিতর্ক চলছে বহু বছর ধরেই।
বিষয়টির গুরুত্ব বোঝার জন্য প্রতিটি তেলে থাকা ভিন্ন ভিন্ন ধরনের চর্বি সম্পর্কে জানতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সব তেল শরীরে একইরকম প্রভাব ফেলে না—কিছু তেল শরীরে খারাপ কোলেস্টেরল বাড়ায়, আবার কিছু তেল কোলেস্টেরল কমাতেও সাহায্য করে।
কোলেস্টেরল হলো একটি প্রাকৃতিক চর্বিজাত পদার্থ, যা লিভারে তৈরি হয় এবং কিছু খাবারেও থাকে। তবে শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলে রক্তনালির ভেতর চর্বির আস্তরণ জমতে থাকে। এতে রক্তনালি সরু বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এতসব বিপরীতমুখী তথ্যের কারণে কোন তেল বেছে নেবেন তা অনেকের কাছেই বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশনের অধ্যাপক নীতা ফরুহি বিবিসির স্লাইসড ব্রেড পডকাস্টে বলেন, কোনো একটি তেলই জাদুকরি সমাধান নয়। তিনি রান্নার তেল নিয়ে প্রচলিত তিনটি ভুল ধারণার ব্যাখ্যা দেন।
১. রান্নায় সূর্যমুখী ও ক্যানোলা তেল ব্যবহার করুন
ক্যানোলা তেল ও সূর্যমুখী তেলের সমালোচনা করা হয় প্রায়ই। অনেকেই বলেন, এগুলো অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত এবং হৃদরোগের জন্য ক্ষতিকর প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু এর কোনো প্রমাণ নেই।
আসলে এই তেলগুলোতে অস্বাস্থ্যকর স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ খুবই কম—মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ। বরং এগুলোতে স্বাস্থ্যকর মোনো ও পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট প্রচুর থাকে। এর মধ্যে পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটে থাকা ওমেগা–৩ ও ওমেগা–৬ আমাদের মস্তিষ্ক ও হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।
ফরুহি বলেন, এই তেলগুলো আমাদের জন্য 'একেবারে নিরাপদ'।
তার মতে, মাখন, লার্ড বা ঘির মতো স্যাচুরেটেড ফ্যাটের বদলে এগুলো ব্যবহার করলে রোগের ঝুঁকি কমানো যায়। এছাড়া এগুলো দামেও সাশ্রয়ী।
২. মার্জারিন খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করতে পারে
মার্জারিন নিয়ে বহু বছর ধরে অনেকের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। আগে এতে ট্রান্সফ্যাট থাকত, যা হৃদরোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তবে আধুনিক মার্জারিনে ট্রান্সফ্যাটের পরিমাণ প্রায় শূন্য বলে ফরুহির দাবি। তাই এটি স্বাস্থ্যকর খাবারের অংশ হতে পারে এবং খারাপ কোলেস্টেরল কমাতেও সাহায্য করতে পারে।
তবে খাবার টেবিল থেকে মাখনকে পুরোপুরি বাদ দিতে নিষেধ করেন তিনি।
ফরুহি বলেন, 'যদি মাখন খুব পছন্দ করেন, টোস্টে খেতে পারেন।'
রান্নায় মার্জারিন ও মাখন দুটোই ব্যবহার করা যায়। তবে মাঝে মাঝে এগুলোর বদলে তেল ব্যবহার করাই ভালো, কারণ তেলে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ কম।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দৈনিক ক্যালরির ১০ শতাংশের কম স্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণ করা উচিত। রান্নায় মাখনের বদলে তেল ব্যবহার করলে বিষয়টি মেনে চলা সহজ হয়।
৩. অলিভ অয়েল ডিপ ফ্রাইয়ের জন্য উপযুক্ত নয়
তেল গরম হলে ভিন্নভাবে আচরণ করে। তাই কিছু তেল কড়া ভাজার জন্য অনুপযুক্ত।
এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও উপকারী উপাদান থাকে, তবে এর স্মোক পয়েন্ট কম হওয়ায় এটি সালাদ ড্রেসিং বা খাবারের ওপর ছড়িয়ে খাওয়ার জন্য ভালো, কিন্তু ডিপ ফ্রাই বা কড়া ভাজার জন্য ভালো নয়।
স্মোক পয়েন্ট হলো সেই তাপমাত্রা, যখন তেলের চর্বি ভেঙে যায় এবং ক্ষতিকর যৌগ তৈরি হয়, যা খাবারের স্বাদ নষ্ট করতে পারে।
রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী টিম হেওয়ার্ড বলেন, তিনি হালকা ভাজার জন্য সাধারণ অলিভ অয়েল ব্যবহার করেন। কিন্তু কড়া ভাজার জন্য, যেমন ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা ব্যাটার করা মাছ, সূর্যমুখী বা ক্যানোলা তেল ব্যবহার করাই ভালো। এগুলো উচ্চ তাপে ভাঙে না।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, তেল অতিরিক্ত গরম করলে বিষাক্ত রাসায়নিক তৈরি হতে পারে।
তবে ফরুহির মতে, ঘরোয়া রান্নায় এ ধরনের ঝুঁকি তেমন নেই।
দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায়ও দেখা গেছে, ক্যানোলা তেল সব ধরনের দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমায়।
কোন রান্নায় কোন তেল ব্যবহার করবেন?
সহজ কৌশল হলো-
দৈনন্দিন রান্নায়: সূর্যমুখী বা ক্যানোলা তেল সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যকর। সাধারণ অলিভ অয়েলও ব্যবহার করা যায়।
সালাদ বা খাবারের ওপর ছড়ানোর জন্য: এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল স্বাদ ও স্বাস্থ্য উপকার দুটোই বাড়ায়।
কড়া ভাজার জন্য: ক্যানোলা বা সূর্যমুখী তেলের মতো উচ্চ স্মোক পয়েন্টযুক্ত তেল ব্যবহার করুন।
স্বাদের বৈচিত্র্যের জন্য: তিল, নারকেল বা অ্যাভোকাডো তেল ঠান্ডা খাবারে ব্যবহার করা যায়, যদিও এগুলোতে অলিভ অয়েলের মতো স্বাস্থ্য উপকার নেই।
সামগ্রিকভাবে ফরুহি বলেন, কোনো এক ধরনের তেলকে নিখুঁত ভাবার চেয়ে পুরো খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, 'আমি বলব, আপনার স্বাদ ও খরচের বিষয় বিবেচনা করে বিভিন্ন ধরনের তেল ব্যবহার করুন। এতে স্বাস্থ্যের জন্যও উপকার পাওয়া যাবে।'
