দুর্গন্ধযুক্ত জুতা যেভাবে ভারতের ইগ নোবেলজয়ী গবেষণার প্রেরণা জোগালো
প্রায় প্রতিটি পরিবারেই এমন একজন থাকেন যার জুতার দুর্গন্ধ উপেক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। তাদের জুতা যখন একই সঙ্গে অন্যদের জুতার সঙ্গে সাজিয়ে রাখা হয়, তখন শুধু দুর্গন্ধ নয়- বরং গৃহসজ্জায়ও এটি প্রভোবে ফেলে। এ সমস্যা কারও একার না এটি সার্বজনীন।
বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, দুজন ভারতীয় গবেষক মনে করেন, বিষয়টি শুধু দুর্গন্ধের নয়—এর পেছনে বিজ্ঞানও রয়েছে।
দুর্গন্ধযুক্ত জুতা কীভাবে মানুষের জুতার তাক ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে, তা বোঝার জন্য, তারা গবেষণায় নেমে পড়েন। আর এই গবেষণার মাধ্যমেই তারা প্রবেশ করেন রসিকতা ও সৃজনশীলতায় ভরপুর ইগ নোবেল পুরস্কার-এর জগতে—যেখানে অদ্ভুত কিন্তু উদ্ভাবনী বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে সম্মান জানানো হয়।
৪২ বছর বয়সী বিকাশ কুমার দিল্লির কাছেই শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তার স্নাতকে পড়া শিক্ষার্থী সারথক মিত্তল (২৯) ও তার মাথায়ই প্রথম দুর্গন্ধযুক্ত জুতা নিয়ে গবেষণা করার ধারণা আসে। বর্তমানে মিত্তল একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে কাজ করছেন।
মিত্তল বলেন, তিনি প্রায়ই দেখতেন, হোস্টেলের করিডোরজুড়ে সারি সারি জুতা পড়ে থাকে। সেগুলো কক্ষের বাইরে জোড়ায় জোড়ায় রাখা হতো। শুরুতে তাদের ভাবনা ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য কিভাবে একটি নান্দনিক জুতার তাক ডিজাইন করা যায়?
কিন্তু গবেষণায় গভীরে যেতে যেতে তারা দেখলেন, প্রকৃত সমস্যা বিশৃঙ্খলা নয়—বরং জুতার দুর্গন্ধই আসল অপরাধী, যা শিক্ষার্থীদের জুতা বাইরে রাখতে বাধ্য করছিল।
মিত্তল বলেন, 'জায়গার অভাব বা জুতার রাখার জায়গা ছিল না বিষয়টা এমন না। আসল সমস্যা ছিল বারবার ঘেমে যাওয়া পা এবং ক্রমাগত জুতা ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট দুর্গন্ধ।'
এরপর দু'জনই বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে একটি জরিপ শুরু করেন, যেখানে তারা একদম মানবিক এক প্রশ্ন তোলেন—যদি আমাদের স্নিকারস থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়, তাহলে কি জুতার তাক ব্যবহারের পুরো অভিজ্ঞতাই নষ্ট হয়ে যায় না?
তারা ১৪৯ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মধ্যে এক জরিপ চালান—যাদের ৮০ শতাংশই পুরুষ। ফলাফল প্রকাশ করে এমন একটি সত্য, যা আমরা অনেকেই জানি কিন্তু খুব কমই স্বীকার করি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি জানান জরিপে অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী স্বীকার করেছেন, নিজেদের বা অন্য কারও জুতার দুর্গন্ধে তারা বিব্রত হয়েছেন।
প্রায় সবাই ঘরে জুতাগুলো তাকেই রাখেন।
আর খুব কম মানুষই ডিওডোরাইজিং পণ্য সম্পর্কে শুনেছেন।
আর প্রচলিত ঘরোয়া উপায়গুলো—যেমন জুতার ভেতরে চায়ের ব্যাগ রাখা, বেকিং সোডা ছিটিয়ে দেওয়া, বা ডিওডোরান্ট স্প্রে করা—তেমন কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।
তাই তারা আশ্রয় নেন বিজ্ঞানের। পূর্ববর্তী গবেষণায় জানা ছিল, দুর্গন্ধের মূল কারণ কাইটোকোকাস সেডেন্টারিয়াস নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যা ঘামে ভেজা জুতায় জন্মায় ও বেড়ে ওঠে।
তাদের পরীক্ষায় দেখা যায়, অল্প সময়ের জন্য অতিবেগুনি রশ্মি প্রয়োগ করলে এই ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয়ে যায় এবং দুর্গন্ধ সম্পূর্ণভাবে দূর হয়ে যায়।
তাদের গবেষণাপত্রে লেখকদ্বয় উল্লেখ করেন, ভারতের প্রায় প্রতিটি ঘরেই কোনো না কোনো ধরনের জুতার তাক রয়েছে। তাই যদি এমন একটি তাক তৈরি করা যায়, যা জুতাকে দুর্গন্ধমুক্ত রাখে, তবে তা হবে এক অসাধারণ ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা।
তারা দুর্গন্ধযুক্ত জুতাকে একটি সমস্যা হিসেবে নয়, বরং প্রচলিত জুতার তাককে পুনরায় নকশা করার এক সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
ফলাফল? এটি কোনো সাধারণ অর্গোনমিকস গবেষণা ছিল না, বরং এক চমৎকার অভিনব ধারণা। একটি ইউভিসি আলো-সংবলিত জুতার তাকের প্রোটোটাইপ, যা শুধু জুতা রাখার জন্য নয়, বরং সেগুলোকে জীবাণুমুক্তও করে। (উল্লেখ্য: অতিবেগুনী রশ্মি বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের হয়, তবে কেবল ইউভিসি ব্যান্ড-এরই জীবাণুনাশক ক্ষমতা রয়েছে।)
পরীক্ষার জন্য গবেষকরা ব্যবহার করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়াবিদদের ব্যবহৃত জুতা, যেগুলোতে তীব্র দুর্গন্ধ ছিল। যেহেতু ব্যাকটেরিয়া সবচেয়ে বেশি জমে জুতার আঙুলের দিকটায়, তাই ইউভিসি আলো সেই অংশে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছিল।
গবেষণায় তারা দুর্গন্ধের মাত্রা পরিমাপ করেন আলোর সংস্পর্শে থাকার সময়ের সঙ্গে তুলনা করে। দেখা যায়, মাত্র ২ থেকে ৩ মিনিটের ইউভিসি যথেষ্ট ছিল ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে এবং দুর্গন্ধ দূর করতে।
তবে বিষয়টি এতটা সহজ ছিল না—অতিরিক্ত আলো প্রয়োগে অতিরিক্ত তাপ তৈরি হয়, যা শেষে জুতার রাবার পুড়িয়ে দেয়। তাই তাদের এমন একটি সন্তুলিত সময়সীমা খুঁজে বের করতে হয়েছে, যা একদিকে জীবাণু ধ্বংস করবে, আবার অন্যদিকে জুতার ক্ষতিও করবে না।
গবেষকরা শুধু ইউভিসি টিউবলাইট জুতার দিকে তাক করে বসে থাকেননি—তারা প্রতিটি ধাপে দুর্গন্ধের পরিবর্তন নিখুঁতভাবে পরিমাপ করেছেন।
শুরুর অবস্থায় জুতার গন্ধকে বর্ণনা করা হয় 'তীব্র, ঝাঁঝালো, পচা চিজের মতো'। ২ মিনিট পর সেটি নেমে আসে 'অত্যন্ত হালকা, সামান্য পোড়া রাবারের মতো' গন্ধে। ৪ মিনিটে গিয়ে দুর্গন্ধ সম্পূর্ণ দূর হয়ে যায়, বদলে আসে এক ধরনের 'গড়পড়তা পোড়া রাবারের গন্ধ'। আর ৬ মিনিট পর জুতা হয়ে ওঠে গন্ধহীন ও ঠান্ডা।
তবে সময়সীমা বাড়িয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট করলে পরিস্থিতি উল্টো হয়ে যায়—গন্ধে তখন মেশে 'তীব্র পোড়া রাবারের গন্ধ', আর জুতা গরম হয়ে ওঠে।
এতে প্রমাণিত হয়, বিজ্ঞানে সময়ের সঠিক হিসাবও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত দুই গবেষক প্রস্তাব দেন এমন এক জুতার তাকের, যাতে ইউভিসি টিউবলাইট সংযুক্ত থাকবে—যা শুধু জুতা রাখার জন্য নয় বরং তা জীবাণুমুক্তও করবে।
তাদের এই ধারণা শুরুতে তেমন কোনো সাড়া পায়নি। কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইগ নোবেল পুরস্কার কর্তৃপক্ষ বিষয়টি লক্ষ্য করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
গত ৩৪ বছর ধরে দেওয়া হয় এ ইগ নোবেল পুরস্কার। সাময়িকী 'অ্যানালস অব ইমপ্রোবেবল রিসার্চ' ও হার্ভার্ড-র্যাডক্লিফের কয়েকটি গ্রুপের যৌথভাবে এ পুরস্কার দিয়ে থাকে। এই পুরস্কার প্রতিবছর ১০টি বিভাগে দেওয়া হয়, যার লক্ষ্য হলো—'মানুষকে প্রথমে হাসানো, তারপর ভাবতে বাধ্য করা… অস্বাভাবিককে উদযাপন করা, কল্পনাশক্তিকে সম্মান জানানো।'
কুমার বলেন, 'আমরা এই পুরস্কার সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। এটি ছিল ২০২২ সালের পুরোনো এক গবেষণাপত্র—আমরা কখনো কোথাও পাঠাইওনি। ইগ নোবেল টিম নিজেরাই এটি খুঁজে পেয়ে আমাদের ফোন করে। আর ঘটনাটাই এমন যে, আপনাকে একই সঙ্গে হাসাবে এবং ভাবাবে।'
পুরস্কারটির উদ্দেশ্য গবেষণাকে যাচাই বা স্বীকৃতি দেওয়া নয়, বরং সেটিকে উদযাপন করা—বিজ্ঞানের মজার দিকটিকে সামনে আনা।
কুমার বলেন, 'বেশিরভাগ গবেষণাই কৃতজ্ঞতাহীন কাজ। এগুলো কেবল আবেগ ও ভালোবাসা থেকে করা হয়। এই পুরস্কার সেই গবেষণাকে জনপ্রিয় করে তোলারও এক উপায়।'
এই বছর পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকায় দুই ভারতীয় গবেষকের সঙ্গে রয়েছেন আরও একঝাঁক বিচিত্র ও মজার গবেষক। এর মধ্যে জাপানি জীববিজ্ঞানীরা গরুর গায়ে রং করে মাছি তাড়ানোর কৌশল উদ্ভাবন করেছেন। তারা আরও খুঁজে পেয়েছেন, টোগোর রঙিন গিরগিটি, যাদের রয়েছে চার ধরনের চিজের পিজার প্রতি দুর্বলতা রয়েছে। মার্কিন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা আবিষ্কার করেছেন, রসুন খেলে বুকের দুধ শিশুদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়। ডাচ গবেষকদের মতে অ্যালকোহল বিদেশি ভাষা শেখায় দক্ষতা বাড়ায়, যদিও এতে ফলখেকো বাদুড়েরা উড়তে গিয়ে হোঁচট খায়। এদিকে এক ইতিহাসবিদ, যিনি ৩৫ বছর ধরে নিজের নখের বৃদ্ধির হার অনুসরণ করেছেন আর কয়েকজন পদার্থবিজ্ঞানী পাস্তা সসের রহস্য অনুসন্ধান করছেন।
দুর্গন্ধযুক্ত জুতা নিয়ে গবেষণায় পুরস্কার জেতা যেন দুই ভারতীয় গবেষকের জন্য মানদণ্ড আরও উঁচু করে দিয়েছে।
কুমার বলেন, 'শুধু স্বীকৃতি নয়, এটি আমাদের ওপর এক ধরনের দায়িত্বও চাপিয়েছে—এখন আমাদের এমন বিষয় নিয়ে আরও গবেষণা করতে হবে যা সাধারণত মানুষ ভাবে না। আমাদের এসব বিষয়ে আমাদের প্রশ্ন তুলতে হবে। অর্থাৎ, আজকের দুর্গন্ধময় স্নিকারস-ই হতে পারে আগামী দিনের যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সূচনা '
