দুই নেতা, দুই অভ্যুত্থান: ২০২৪ এর বাংলাদেশের সাথে ২০২৫ এর নেপালের তুলনা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকায় এক ঐতিহাসিক দিন। টানা আন্দোলন, পুলিশের গুলি আর অসংখ্য প্রাণহানির পর শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে বাধ্য হন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। সেদিন শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান।
সে ঘটনার এক বছরেরও বেশি সময় পেরোতে না পেরোতেই, ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেশী নেপালে প্রায় একই দৃশ্যপট। টানা বিক্ষোভে চাপে পড়ে অবশেষে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। খবরে বলা হচ্ছে, তিনিও নাকি দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন।
দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই দেশেই আন্দোলনের ঢেউ একই ফল বয়ে এনেছে—শাসক বদল। আর দুটো আন্দোলনের প্রকৃতিতেও রয়েছে লক্ষণীয় মিল।
এক বিপ্লব থেকে আরেক বিপ্লবের দ্রোহযাত্রায়
বাংলাদেশের জন্মের পেছনে ভাষা আন্দোলন আর মুক্তিযুদ্ধের মতো ঐতিহাসিক গণআন্দোলনের ভূমিকা অপরিসীম। এসব আন্দোলনে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের ভূমিকা ছিল। অথচ পঞ্চাশ বছর পর সেই দলই কলঙ্কিত হলো কর্তৃত্ববাদী শাসনের জন্য। ছাত্র-যুবকেরা রাস্তায় নেমে আওয়াজ তুলল শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে। একসময় যে দল বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাকেই এবার সরিয়ে দিল আরেক বিপ্লব।
নেপালে ছবিটা কম নাটকীয় নয়। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন বামপন্থীরা। ২০০৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। সেই সময় কেপি শর্মা ওলির দল- সিপিএন (ইউএমএল) ছিল জোট সরকারের অংশ। অথচ এখন রাজনীতির সেই পর্ব উল্টে গেছে। সাধারণ মানুষের বিদ্রোহে পদ হারালেন ওলি, আর অনেক নেপালি আবারও রাজতন্ত্র ফেরানোর দাবিও তুলছেন।
তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব
বাংলাদেশে শেখ হাসিনা-বিরোধী আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল ছাত্র-যুবকদের প্ল্যাটফর্ম- বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সরকারি দমনপীড়ন, গুলিতে মৃত্যু—কোনো কিছুই তাদের দাবির সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। অবশেষে তারাই আন্দোলনের জয় ছিনিয়ে নেয়।
নেপালেও আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে 'জেন জি'। প্রথমে তারা রাস্তায় নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে। কিন্তু অল্প সময়েই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর শাসকশ্রেণির ভোগ-বিলাসের বিরুদ্ধে। নিহত হয়েও দমে যায়নি তরুণেরা, বরং আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়েছে।
সুবিধাভোগী শ্রেণির বিরুদ্ধে ক্ষোভ
বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মূলে ছিল সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ। স্বাধীনতার অর্ধশতক পরে জন্ম নেওয়া তরুণেরা মনে করেছে, এই কোটার কারণে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুনে সুপ্রিম কোর্টের একটি আদেশের পর থেকে এই আন্দোলন বেগবান হয় এবং শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলন দমাতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা বিদায় নিতে বাধ্য হন।
নেপালে সূচনাটা হয়েছিল ফেসবুক-টিকটক নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দিয়ে। কিন্তু পরে আন্দোলন রূপ নেয় 'নেপোকিডস'-বিরোধী অভিযানে। বিক্ষোভকারীরা স্লোগান তোলে—মন্ত্রী-সাংসদদের সন্তানরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে, অথচ সাধারণ মানুষ ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
দমনপীড়নে জয় পাওয়া যায়নি
বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের দমননীতি ভয়াবহ ছিল। জুলাইয়ে গণ-আন্দোলন দমাতে গিয়ে সরকারি বাহিনী ও তাদের সমর্থকদের গুলি, সহিংস হামলায় প্রাণ হারান দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ। তবু মৃত্যুর মিছিল থামাতে পারেনি জনতার বিপ্লব, বরং তা ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। অবশেষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন- গণভবনেও ঢুকে পড়ে বিক্ষুব্ধ জনতা, হাসিনাও তার আগেই দেশ ছাড়েন।
নেপালেও প্রথম দিকে একই কৌশল নেয় সরকার। সেনা ও দাঙ্গা পুলিশ নামিয়ে আন্দোলন দমন করতে চেয়েছিলেন ওলি। কিন্তু এর ফল হয়েছে উল্টো। কাঠমান্ডু থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে। সরকারি দমনপীড়নে ১৯ জন নিহত হলেও বিক্ষোভ আরও জোরদার হয়। শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না ওলির হাতে।
