মস্তিষ্কে বিশেষ ইমপ্লান্টে বিষণ্নতামুক্তি, তিন দশক পর ‘আনন্দ’ অনুভব করলেন ব্যক্তি
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তীব্র বিষণ্নতায় ভোগা এক ব্যক্তি আশ্চর্যজনকভাবে রোগমুক্তির পথে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বিশেষভাবে তৈরি করা একটি 'ব্রেন পেসমেকার' বা মস্তিষ্ক উদ্দীপক যন্ত্র তার মস্তিষ্কের ভিন্ন ভিন্ন অংশে বৈদ্যুতিক সিগন্যাল পাঠিয়ে এই পরিবর্তন এনেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেমিয়ান ফেয়ার বলেন, 'অনেক বছর পর তিনি প্রথমবার আনন্দ অনুভব করেছেন।'
বিশ্বব্যাপী বিষণ্নতায় ভোগা অনেক রোগীর ক্ষেত্রে প্রচলিত চিকিৎসা কাজ করে না। অন্তত দুই ধরনের অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ব্যবহারেও উন্নতি না হলে রোগটিকে বলা হয় চিকিৎসা প্রতিরোধী বিষণ্নতা। এ ধরনের রোগীর জন্য শক থেরাপি বা ইলেকট্রোকনভালসিভ থেরাপি (ইসিটি) ব্যবহার করা হলেও তা অনেক সময় ব্যর্থ হয়। ফেয়ার বলেন, 'এগুলো সবার জন্য একইভাবে ব্যবহার করা হয়। অথচ প্রতিটি মস্তিষ্ক আলাদা—তাই সঠিক জায়গায় প্রয়োগ না করলে রোগমুক্তি আসে না।'
এই সমস্যার সমাধানে ৪৪ বছর বয়সী এক ব্যক্তির জন্য ভিন্নধর্মী চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন ফেয়ার ও তার সহকর্মীরা। মাত্র ১৩ বছর বয়সে প্রথম হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ওই রোগী গত তিন দশকে অন্তত ২০ ধরনের চিকিৎসা—অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, কাউন্সেলিং, ইসিটি—সবই গ্রহণ করেছিলেন। তবুও কাজ হয়নি। তিনবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
শুরুতে রোগীর মস্তিষ্কের এমআরআই স্ক্যান করে গবেষকরা চারটি স্নায়ু-কার্যকর নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করেন, যেগুলো বিষণ্নতার সঙ্গে যুক্ত। দেখা যায়, তার স্যালিয়েন্স নেটওয়ার্ক—যা উদ্দীপনা প্রক্রিয়াজাত করে—সাধারণ মানুষের তুলনায় চার গুণ বড়।
পরবর্তীতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মস্তিষ্কের ভেতরে চারটি স্থানে ইলেকট্রোড বসানো হয়। কয়েকদিন পর প্রতিটি নেটওয়ার্ক আলাদাভাবে উদ্দীপিত করা হলে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। যেমন, 'ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক' সক্রিয় করার সময় রোগীর চোখে আনন্দের অশ্রু আসে। অ্যাকশন-মোড ও স্যালিয়েন্স নেটওয়ার্কে উদ্দীপনা দিলে তিনি শান্ত অনুভব করেন, আর ফ্রন্টোপ্যারাইটাল নেটওয়ার্কে উদ্দীপনায় মনোযোগ বাড়ে।
এরপর গবেষক দল ইলেকট্রোডগুলোকে রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপিত ক্ষুদ্র ব্যাটারির সঙ্গে যুক্ত করে দেন। এটি মস্তিষ্কের ভিন্ন নেটওয়ার্কে প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর এক মিনিট করে বৈদ্যুতিক সিগন্যাল পাঠায়—যেন হৃদপিণ্ডের মতো মস্তিষ্কেরও একটি পেসমেকার কাজ করছে।
অস্ত্রোপচারের সাত সপ্তাহের মধ্যেই রোগীর আত্মহননের চিন্তা বন্ধ হয়ে যায়। নয় মাসের মাথায় হ্যামিলটন বিষণ্নতা স্কেলে তাকে রোগমুক্ত ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে এই উন্নতি স্থায়ী ছিল, যদিও কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার পর সামান্য অবনতি হয়েছিল।
লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক মারিও জুরুয়েনা বলেন, 'এটি অসাধারণ ফলাফল। চিকিৎসা প্রতিরোধী বিষণ্নতা মোকাবেলায় এটি বড় ধরনের সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।'
গবেষকরা জানিয়েছেন, আগের তুলনায় এ পদ্ধতিতে জটিল প্রযুক্তি ও দীর্ঘ হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন হয় না। তবে বৃহত্তর পরিসরে কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য এখনো 'র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল্ড ট্রায়াল' [দৈবভিত্তিতে পরীক্ষা] প্রয়োজন। আগামী দুই বছরের মধ্যে তারা এ ধরনের পরীক্ষা শুরু করতে চান।
