ডুবে যাওয়া এক নারী যেভাবে হয়ে উঠলো পরিচিত সিপিআর ম্যানিকুইন
১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে নরওয়ের খেলনা নির্মাতা আসমুন্ড লার্ডাল এক অদ্ভুত প্রস্তাব পেলেন: তাকে এমন একটি বাস্তবসম্মত পুতুল তৈরি করতে হবে যা দেখে মনে হবে একজন অজ্ঞান রোগী।
তখন অস্ট্রিয়ান ডাক্তার পিটার সাফার সবে সিপিআর-এর মূল কৌশলগুলো আবিষ্কার করেছেন। সিপিআর হলো এমন একটি জীবন রক্ষাকারী পদ্ধতি, যা হৃৎপিণ্ড হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলেও মস্তিষ্ক ও শরীরের জরুরি অঙ্গগুলিতে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ চালু রাখে এবং হৃৎপিণ্ডকে আবার সচল হতে সাহায্য করে।
এই যুগান্তকারী পদ্ধতিটি সাধারণ মানুষকে শেখাতে খুব আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু এতে একটি বড় সমস্যা দেখা দিল। মানুষের বুকের উপর দুই হাত দিয়ে গভীর চাপ প্রয়োগ করার সময় প্রায়শই রোগীর পাঁজর ভেঙে যেত। এর ফলে বাস্তবিকভাবে সিপিআর শেখানো ছিল খুবই কঠিন।
এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়েই তার পরিচয় হলো লার্ডালের সাথে। চল্লিশের কোঠায় থাকা লার্ডাল ছিলেন একজন সাহসী উদ্ভাবক। শিশুদের খেলনা আর মডেল গাড়ি তৈরির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে নরম প্লাস্টিক সম্পর্কে গভীর জ্ঞান দিয়েছিল। তিনি এমনকি নরওয়েজিয়ান সিভিল ডিফেন্সের সাথে প্রশিক্ষণের জন্য নকল ক্ষত তৈরিতেও কাজ শুরু করেছিলেন।
কয়েক বছর আগে লার্ডাল নিজেই তার ছেলেকে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছিলেন তার বুকে চাপ দিয়ে ফুসফুস থেকে পানি বের করে। তাই তিনি ডাক্তার সাফারকে সাহায্য করতে আগ্রহী হলেন। এরপর দুজনে মিলে একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ মডেল তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেন।
নরওয়ের এই খেলনা নির্মাতার মনে একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল: ম্যানিকুইনটি দেখতে মোটেও ভীতিকর হওয়া চলবে না। আর যেহেতু পুরুষরা একজন পুরুষ পুতুলের মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস দিতে চাইবে না, তাই এটি একজন নারীর আদলে হওয়া উচিত।
এই ভাবনা থেকেই তিনি একটি উপযুক্ত মুখের সন্ধানে নামলেন।
সেইনের অচেনা নারী
তিনি সেই মুখটি খুঁজে পেলেন তার শ্বশুর-শাশুড়ির বাড়িতে, নরওয়ের মনোরম শহর স্টাভাঞ্জারে।
সেটি ছিল একজন যুবতীর তৈলচিত্র। ছবিতে দেখা যাচ্ছিল, তার চুল পাশ দিয়ে সিঁথি করা এবং ঘাড়ের কাছে আলতো করে বাঁধা। চোখ দুটি শান্তভাবে বন্ধ, চোখের পাতা সামান্য ভেজা, আর ঠোঁটে লেগে আছে এক মৃদু, বিষণ্ণ হাসি।
এই একই মুখ,কয়েক দশক ধরে ইউরোপের অগণিত বাড়িতে দেয়ালে খোঁদাই করা নকশার আদলে শোভা পাচ্ছিল।
আসল এই পরিচিত চেহারাটি কার তা নিয়ে নানা ধরনের গুজব প্রচলিত আছে। তবে একটি গল্প যেন সেই অঞ্চলে রূপকথা হিসেবেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। সেটি হলো, এই মুখটি আসলে ১৯ শতকে প্যারিসের সেইন নদীতে ডুবে যাওয়া এক নারীর।
সেই সময়ে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে একটি প্রথা ছিল। যে মৃতদেহগুলোর পরিচয় জানা যেত না, সেগুলোকে কালো মার্বেলের স্ল্যাবের ওপর রেখে শহরের মর্গের জানালার ধারে প্রদর্শন করা হতো। এই মর্গটি নটর ডেম ক্যাথেড্রালের পাশেই অবস্থিত ছিল।
এই প্রথার মূল উদ্দেশ্য ছিল, সাধারণ মানুষ মৃতদেহটিকে চিনতে পারে কিনা এবং তাদের সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারে কিনা, তা দেখা। কিন্তু বাস্তবে, এটি প্যারিসীয়দের জন্য এক ভয়ংকর কৌতূহলের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল।
গল্প অনুসারে, একজন রোগ বিশেষজ্ঞ সেই নারীর সৌন্দর্য এবং মুখের শান্ত অভিব্যক্তিতে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি একজন ভাস্করকে দিয়ে তার মুখের একটি ডেথ মাস্ক তৈরি করিয়েছিলেন। ডেথ মাস্ক হলো মৃত্যুর পরপরই একজন ব্যক্তির মুখ থেকে তৈরি করা প্লাস্টার বা মোমের ছাঁচ।
প্যারিস পুলিশের আর্কাইভে এই ঘটনার কোনো নথি পাওয়া যায়নি, তাই এই গল্পের সত্যতা যাচাই করা অসম্ভব।
তবে, কথিত এই ডেথ মাস্কের ভাস্কর্যটি মানুষের কল্পনাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকেই এর অজস্র প্রতিলিপি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
খুব দ্রুতই তার মুখ প্যারিসের অভিজাত সেলুন এবং ধনী ব্যক্তিদের বাড়িতে একটি সাধারণ চিত্রে পরিণত হলো।
এই মুখটি 'ল'ইনকন্যু দে লা সেইন' – অর্থাৎ 'সেইনের অচেনা নারী' নামে পরিচিতি লাভ করে। অচিরেই তিনি লেখক, কবি এবং শিল্পীদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠলেন।
ফরাসি লেখক আলবার্ট কামু তাকে "ডুবন্ত মোনালিসা" বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। অন্যদিকে, অস্ট্রিয়ান কবি রেইনার মারিয়া রিলকে তার শান্ত অভিব্যক্তি সম্পর্কে বলেছিলেন, "এটি সুন্দর ছিল, কারণ এটি হাসছিল, কারণ এটি এত ছলনাময়ভাবে হাসছিল, যেন এটি সব জানে।"
রেসুসি অ্যানি
লার্ডাল স্টাভাঞ্জারের সেই ছবির পেছনের কিংবদন্তি সম্পর্কে জানতেন কিনা, তা স্পষ্ট নয়। তবে ১৯৬০ সালে, তিনি এই মুখটিকে নতুন জীবন দেন, যখন প্রথম সিপিআর পুতুলটি আনুষ্ঠানিকভাবে সেই মুখের আদলে তৈরি করে চালু করা হয়।
এই পুতুলটিতে নরম প্লাস্টিকের একটি ধড় ছিল – যার বুক সিপিআর অনুশীলনের জন্য চাপযোগ্য ছিল – এবং মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস দেওয়ার জন্য এর ঠোঁট খোলা রাখা হয়েছিল।
পুতুলটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এটি ফায়ার স্টেশন, স্কুল, হাসপাতাল, স্কাউট গ্রুপ এবং এয়ারলাইন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে সিপিআর প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
অবশেষে লার্ডাল এর একটি নামও দিলেন: 'রেসুসি অ্যানি', যা "রেসাসিটেশন" বা 'পুনরুজ্জীবন' শব্দটির সংক্ষিপ্ত রূপ। অ্যানি নরওয়ে এবং ফ্রান্সে একটি পরিচিত মেয়েদের নাম। এতে বোঝা যায় যে, এই সময়ে খেলনা নির্মাতা মুখের পেছনের প্রচলিত গল্প সম্পর্কে জেনেছিলেন। ইংরেজিভাষী বিশ্বে তিনি 'সিপিআর অ্যানি' নামেই পরিচিত হন।
কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সময় রোগীর জ্ঞান আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য 'অ্যানি, আর ইউ ওকে?' – একটি পরিচিত বাক্যে পরিণত হয়।
১৯৮০-এর দশকে, সেইন নদীতে অ্যানিকে পাওয়ার প্রায় এক শতাব্দী পর, মাইকেল জ্যাকসন পপ সংস্কৃতিতে তাকে অমর করে তোলেন।
গল্প প্রচলিত আছে, এই সুপারস্টার একটি প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ সেশনে এই বাক্যটি শুনেছিলেন। তিনি এটিকে তার জনপ্রিয় গান 'স্মুথ ক্রিমিনাল'-এ ব্যবহার করেন। হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের মতো করে তিনি বারবার বলতে থাকেন: "অ্যানি, আর ইউ ওকে? সো, অ্যানি, আর ইউ ওকে? আর ইউ ওকে, অ্যানি?"
'তিনি গর্বিত হবেন'
১৯৮১ সালে লার্ডাল মারা গেলেও, তার প্রতিষ্ঠিত সংস্থা লার্ডাল মেডিকেল জরুরি চিকিৎসা প্রশিক্ষণ ও অত্যাধুনিক স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তি উন্নয়নে একটি বিশাল শক্তি হিসেবে আজও কাজ করে চলেছে।
অ্যানি নিজেও সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হয়েছে। তার মধ্যে যুক্ত হয়েছে আলোর ঝলকানি, ফুসফুসের প্রতিক্রিয়া জানানোর ব্যবস্থা এবং সেন্সর যা নির্দেশ করে সিপিআর-এর চাপ সঠিক ছন্দে পড়ছে কিনা।
তবে একটি জিনিস অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে, অ্যানির সেই চেনা মুখটি।
লার্ডাল মেডিকেলের কর্পোরেট কমিউনিকেশনস পরিচালক পল ওফটেডাল জানান, অ্যানির পেছনের গল্পটি সত্যি হোক বা না হোক, সিপিআর-এর মতো জীবন রক্ষাকারী অনুশীলনে বিশ্বজুড়ে মানুষকে জড়িত করতে এর ইতিবাচক প্রভাব অপরিসীম।
তিনি আরও বলেন, প্রতি ২০ জনের মধ্যে ১ জন তাদের জীবনে একবার হলেও কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের (হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া) মুখোমুখি হন, যার ৭০ শতাংশই ঘটে বাড়ির বাইরে।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, তাৎক্ষণিক সিপিআর কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পর একজন ব্যক্তির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা দ্বিগুণ বা এমনকি তিনগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
এখন অ্যানির সাথে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, বয়স, শরীরের ধরন এবং মুখের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন নতুন ধরনের ম্যানিকুইনও যুক্ত হয়েছে। লার্ডাল তাদের পণ্যে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে।
লার্ডাল মেডিকেল অনুমান করে, অ্যানি এবং তার সহযোগী রেসাসিটেশন ম্যানিকুইনগুলো বিশ্বজুড়ে ৫০ কোটিরও বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দিতে ব্যবহৃত হয়েছে।
ওফটেডাল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, অ্যানি যেই হোক না কেন, "বিশ্বে তার এই গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য অবশ্যই তিনি গর্বিত হবেন।"
