ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ওপর ক্রমেই চাপ বাড়ছে
গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের মধ্যে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ওপর আরও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার চাপ বাড়ছে। এরই মধ্যে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির ২০০ জনেরও বেশি সংসদ সদস্য।
শুক্রবার রাজনৈতিক অঙ্গনের ২২১ জন এমপি একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেন। চিঠিতে আগামী সপ্তাহে ফিলিস্তিন সংক্রান্ত জাতিসংঘ সম্মেলনের আগেই লেবার নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়, 'আমরা আশা করি, এই সম্মেলনের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য সরকার জানাবে—কখন এবং কীভাবে তারা বহু প্রতীক্ষিত দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নের জন্য কাজ করবে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কীভাবে এই লক্ষ্যে সমন্বয় সাধন করবে।'
এতে আরও বলা হয়, 'আমরা বুঝি, যুক্তরাজ্যের পক্ষে সরাসরি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হওয়ার কারণে ব্রিটেনের স্বীকৃতি বিশ্বে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। সে কারণেই আমরা আপনাদের এই পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।'
লেবার পার্টির এমপি সারা চ্যাম্পিয়ন জানান, চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা নয়টি ভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এসব দলের মধ্যে রয়েছে লেবার, কনজারভেটিভ, লিবারেল ডেমোক্র্যাট, স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি) ও গ্রিন পার্টি।
এমন সময় এই খোলা চিঠি প্রকাশ পেল, যখন গাজা উপত্যকার ওপর ইসরায়েলের লাগাতার বোমাবর্ষণ ও অবরোধ নিয়ে যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বজুড়ে জনগণের ক্ষোভ বাড়ছে। এতে ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে, প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ।
এটি এমন এক সময়েও এসেছে, যখন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বৃহস্পতিবার ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবেন।
তিনি এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে লেখেন, 'মধ্যপ্রাচ্যে একটি ন্যায্য ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তির প্রতি ফ্রান্সের ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি—ফ্রান্স ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে।'
তিনি লেখেন, 'আমি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে এই ঘোষণা আনুষ্ঠানিকভাবে দেব। তবে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো গাজায় যুদ্ধ থামানো এবং সেখানকার মানুষের জন্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা।'
মাখোঁর ঘোষণার কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, এ সিদ্ধান্ত 'সন্ত্রাসবাদকে পুরস্কৃত করার শামিল'।
তবে গত অক্টোবরে শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে গাজায় এখন পর্যন্ত ৫৯ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
ইসরায়েলি অবরোধের কারণে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবিক সংকট চরমে পৌঁছেছে। জাতিসংঘ ও শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক ফিলিস্তিনি শিশু বর্তমানে চরম অপুষ্টিতে ভুগছে এবং মৃত্যুর মুখোমুখি।
শুক্রবার দেওয়া এক বিবৃতিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, 'গাজায় যে ভয়াবহ দৃশ্য প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে, তা কোনোভাবেই থামছে না।'
তিনি বলেন, 'জিম্মিদের ধরে রাখা, ফিলিস্তিনিদের না খাইয়ে রাখা ও তাদের জন্য সাহায্য বন্ধ করে দেওয়া, চরমপন্থি বসতকারীদের সহিংসতা বাড়ানো এবং গাজায় ইসরায়েলের অতিরিক্ত হামলা—এই সবকিছুই একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।'
তবে তিনি এখনই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেননি। বরং বলেন, তিনি 'এই অঞ্চলে শান্তির একটি কার্যকর পথ খুঁজে বের করার জন্য কাজ করছেন।'
কিয়ার স্টারমার বলেন, 'এই পথটি এমন কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে, যার মাধ্যমে বর্তমান যুদ্ধবিরতির জরুরি প্রয়োজনীয়তা এক সময় স্থায়ী শান্তিতে পরিণত হতে পারে।'
তিনি বলেন, 'ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া অবশ্যই ওই পদক্ষেপগুলোর একটি হতে হবে—এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। তবে এটা এমন একটা বড় পরিকল্পনার অংশ হতে হবে, যার মাধ্যমে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান ও ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের জন্য স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে।'
শুক্রবার বিকেলে লন্ডনে কিয়ার স্টারমারের বাসভবনের সামনে থেকে প্রতিবাদ কর্মসূচির খবর জানাতে গিয়ে আল জাজিরার সাংবাদিক মিলেনা ভেসেলিনোভিচ বলেন, বিক্ষোভকারীরা ব্রিটিশ সরকারের অবস্থানের বিরুদ্ধে 'চরম ক্ষোভ' প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, 'তাদের অনেকেই নিজেকে অসহায় মনে করেন। তাই তারা এখানে জড়ো হন, যতটা পারে শব্দ করে প্রতিবাদ জানান—এই আশায় যে, যারা ক্ষমতায় আছে, তারা সেটা লক্ষ্য করবে।'
'তারা চান, কিয়ার স্টারমার যেন তার হাতে থাকা ক্ষমতা ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে এই সংকট নিরসনে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করেন।'
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং অস্ত্রচুক্তি স্থগিত করার আহ্বানও ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
ভেসেলিনোভিচ জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার প্রস্তুতির মধ্যে কিয়ার স্টারমার 'একটি জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে' পড়েছেন। ট্রাম্প শুক্রবার স্কটল্যান্ড সফরে যাচ্ছিলেন।
তিনি বলেন, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর স্বীকৃতির ঘোষণার ফলে যুক্তরাজ্যের ওপর চাপ বেড়েছে—কারণ ব্রিটেন ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই ঘনিষ্ঠ মিত্র।
তবে তিনি জানান, ট্রাম্প ইতোমধ্যে মাখোঁর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।
ভেসেলিনোভিচ বলেন, 'এখানে একটি স্পষ্ট ফারাক দেখা যাচ্ছে—একদিকে ইউরোপের অবস্থান, যা অনেকটাই জাতিসংঘের মানবিক সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলে যায়; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, যা প্রায় শতভাগ ইসরায়েল সরকারের বক্তব্যের সাথেই মিলে যায়।'
'এই দুই অবস্থানের মাঝখানেই অবস্থান করছেন কিয়ার স্টারমার, যিনি উভয় পক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চান।'
