তেহরানে বিস্ফোরণ, ট্রাম্পের নির্দেশে ইসরায়েলের হামলা বন্ধের ঘোষণার পরও উত্তপ্ত পরিস্থিতি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইসরায়েল হামলা বন্ধ করেছে বলে ঘোষণা দেওয়ার পরও আজ মঙ্গলবার ইরানের রাজধানী তেহরানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
তেহরানে অবস্থানরত দুইজন প্রত্যক্ষদর্শী টেলিফোনে রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তারা দুটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর রেডিও জানিয়েছে, তেহরানের কাছে একটি ইরানি রাডার স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকেও দাবি করা হয়, নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার পর আর কোনো হামলা চালানো হয়নি।
এদিকে, নেদারল্যান্ডসে অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে যাত্রার সময় ট্রাম্প বলেন, তার নির্দেশে ইসরায়েল হামলা বন্ধ করেছে। এর আগে, এক বিস্ময়কর মন্তব্যে তিনি দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরায়েলকে কড়া ভাষায় ভর্ৎসনা করেছিলেন। যদিও দুই দিন আগেই ইরানের ওপর চালানো সামরিক অভিযানে তিনি ইসরায়েলের পাশে ছিলেন।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ এক পোস্টে বলেন, "সব যুদ্ধবিমান ফিরে আসবে...। কেউ আহত হবে না, যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে!"
এর আগে আরও একটি পোস্টে ট্রাম্প লিখেছিলেন, "ইসরায়েল, ওই বোমাগুলো ফেলো না। তাহলে এটা হবে (যুদ্ধবিরতির) বড় ধরনের লঙ্ঘন হবে। এখনই তোমাদের পাইলটদের ফিরিয়ে আনো!"
হোয়াইট হাউস ছাড়ার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, তিনি উভয় পক্ষের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনায় তিনি অসন্তুষ্ট, তবে বিশেষভাবে ইসরায়েলের প্রতি ক্ষুব্ধ, কারণ তারা (যুদ্ধবিরতির) সমঝোতা হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হামলা শুরু করে।
"এখন আমাকে ইসরায়েলকে শান্ত করতে হবে," বলেন ট্রাম্প। "ইরান আর ইসরায়েল এতদিন ধরে এত কঠোরভাবে লড়ছে যে, তারা নিজেরাই আর বুঝতে পারছে না আসলে কী করছে।"
ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'অ্যাক্সিওস'-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে জানিয়েছেন, ইসরায়েল পুরোপুরি হামলা বন্ধ না করে, বরং আক্রমণের মাত্রা কমাবে।
এর আগে মঙ্গলবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল ইজ্রেল কাৎজ বলেছিলেন, তেহরানে নতুন করে হামলার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি, কারণ ইরান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
তবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা ৩০ মিনিট পর পর্যন্ত ইসরায়েলের বিমান হামলা অব্যাহত ছিল।
স্বস্তির বাতাস
দুই দেশের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলেও—যুদ্ধ শেষ হওয়ার পথ তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। ১২ দিন আগে ইসরায়েল ইরানের ওপর আকস্মিক হামলা চালায়, এবং দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এরপর থেকে পরিস্থিতি ছিল টানটান উত্তেজনাপূর্ণ।
"আমরা খুশি, খুবই খুশি। কে মধ্যস্থতা করল বা কীভাবে হলো সেটা বড় কথা নয়। যুদ্ধ শেষ, এটা শুরুই হওয়া উচিত ছিল না," বলেন তেহরানে ফিরতি পথে থাকা ৩৮ বছর বয়সী রেজা শরিফি, যিনি পরিবারের সঙ্গে রাজধানী ছাড়ার পর কাস্পিয়ান সাগরের উপকূলবর্তী রাশতে অবস্থান করছিলেন।
তেল আবিবের সফটওয়্যার প্রকৌশলী আরিক ডায়মেন্ট বলেন, "দুঃখজনকভাবে, এটা আমার পরিবার ও আমার জন্য অনেক দেরিতে এসেছে, কারণ গত রোববারের বোমা হামলায় আমাদের বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে যেমন বলে, দেরিতে হলেও ভালো, আমি আশা করি এই যুদ্ধবিরতি নতুন শুরুর সুযোগ হবে।"
ট্রাম্প তাঁর সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ পোস্ট করে বলেন, "যুদ্ধবিরতি এখন কার্যকর। দয়া করে কেউ তা লঙ্ঘন করবেন না!"
গত ১৩ জুন ইসরায়েল আকস্মিক হামলা চালিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানে এবং ইরানের সামরিক নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের হত্যা করে। এটি ১৯৮০'র দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংকট।
ইসরায়েল বলেছে, প্রয়োজনে ইরানের ধর্মীয় শাসকদের পতন ঘটাতেও প্রস্তুত তারা। তবে ইরান দাবি করেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না।
ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, ইসরায়েলের বিমান হামলায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। তবে দেশটির কঠোর গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের কারণে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলে ২৮ জন নিহত হয়েছে। সেখানেও যুদ্ধ সম্পর্কিত বিষয়ে গণমাধ্যমে কড়া সেন্সর রয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই প্রথম এত বড় সংখ্যায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে প্রাণহানি ঘটিয়েছে।
