ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনার বিকল্প: আরব নেতাদের ৫৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অনুমোদন
মিশরের রাজধানী কায়রোতে অনুষ্ঠিত এক জরুরি শীর্ষ সম্মেলনে আরব নেতারা ৫৩ বিলিয়ন ডলারের গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনা অনুমোদন করেছেন। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'গাজা দখল' এবং দুই মিলিয়নের বেশি ফিলিস্তিনিকে স্থানান্তরের পরিকল্পনার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেই এ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। খবর বিবিসি'র।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সম্মেলনের শেষে আরব লীগের মহাসচিব আহমেদ আবুল গীত ঘোষণা করেন, "মিশরের পরিকল্পনাই এখন আরব পরিকল্পনা।"
ট্রাম্পের প্রস্তাবের বিষয়ে সরাসরি উল্লেখ না করলেও তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, "আরব বিশ্বের অবস্থান যে কোনো ধরনের স্থানচ্যুতি প্রত্যাখ্যান করা, তা স্বেচ্ছায় হোক বা জোরপূর্বক।"
মিশর একটি বিস্তারিত ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেছে, যার মধ্যে ৯১ পৃষ্ঠার একটি চকচকে নথি রয়েছে। এতে পরিকল্পিতভাবে আশপাশের অঞ্চল ও বিশাল জনসমাগমের স্থানগুলোর ছবি সংযুক্ত করা হয়েছে। এটি মূলত ট্রাম্পের 'মধ্যপ্রাচ্য রিভেরা' পরিকল্পনার পাল্টা পরিকল্পনা হিসেবে সামনে আনা হয়েছে। এই পরিকল্পনাটি আরব বিশ্ব এবং এর বাইরেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
নতুন পরিকল্পনাটি শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি রাজনৈতিক বিষয় এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারকেও গুরুত্ব দেয়।
সম্মেলনে মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি বলেন, গাজার পুনর্গঠনের পাশাপাশি একটি সমান্তরাল পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সেখানে ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আরব রাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশ এই সমাধানকেই চিরস্থায়ী সংঘাত নিরসনের একমাত্র পথ বলে মনে করে।
তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা এটিকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
নতুন পরিকল্পনায় প্রস্তাব করা হয়েছে, গাজা সাময়িকভাবে ফিলিস্তিনি সরকারের অধীনে গাজা ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হবে। কমিটি দক্ষ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত হবে।
হামাসের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পরিকল্পনায় 'জঙ্গিগোষ্ঠীর বাধা' সম্পর্কে অস্পষ্ট উল্লেখ থাকলেও বলা হয়েছে, ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের কারণগুলো দূর করা গেলে এই সমস্যা সমাধান হবে।
কিছু আরব রাষ্ট্র হামাসকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলার পক্ষে মত দিলেও অন্যরা বলছে, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ফিলিস্তিনিদেরই থাকা উচিত। হামাস জানিয়েছে, তারা গাজা পরিচালনায় কোনো ভূমিকা রাখবে না। তবে নিরস্ত্রীকরণ তাদের জন্য 'রেড লাইন'।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে 'দূরদর্শী' বলে প্রশংসা করেছেন। তিনি হামাস তো বটেই, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্যও কোনো ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা রাখতে চান না বলে জানিয়েছেন।
নিরাপত্তা প্রশ্নে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।
এছাড়া, এই বিশাল পুনর্গঠন প্রকল্পের অর্থ সংগ্রহের জন্য আগামী মাসে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। উপসাগরীয় কিছু ধনী দেশ ব্যয় বহনের আগ্রহ দেখালেও তারা নিশ্চিত হতে চায়, এই অবকাঠামোগুলো ভবিষ্যতে নতুন কোনো যুদ্ধে ধ্বংস হবে না।
বর্তমানে গাজায় যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছে, তা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
গাজা পুনর্নির্মাণের এই আরব পরিকল্পনাটি তিনটি পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম পর্যায়ে ধ্বংসস্তূপ অপসারণ ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ নিষ্কাশনের কাজ শুরু করা হবে। এটি শেষ করতে প্রায় ছয় মাস সময় লাগবে। পরবর্তী দুই ধাপ কয়েক বছর ধরে চলবে।
এই সময়ে ১.৫ মিলিয়ন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হবে। পরিকল্পনার নথিতে আধুনিকভাবে নির্মিত বাসস্থান, সবুজায়ন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ছবি দেখানো হয়েছে।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, "ফিলিস্তিনিরা কেন অন্য কোথাও চলে যেতে চায় না?" তিনি গাজাকে 'ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থান' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জাতিসংঘ বলছে, এ অঞ্চলের প্রায় ৯০ শতাংশ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, স্কুল, হাসপাতাল, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ লাইনসহ জনজীবনের মৌলিক অবকাঠামো প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
এরপরও ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে 'স্বর্ণের গাজা' নামে একটি এআই-জেনারেটেড ভিডিও পোস্ট করেন। এতে দেখা যায়, তার নিজস্ব একটি বিশাল মূর্তি, ইলন মাস্ক সমুদ্র সৈকতে জলখাবার উপভোগ করছেন এবং তিনি ও নেতানিয়াহু শার্টবিহীন সূর্যাস্ত উপভোগ করছেন। ভিডিওতে ক্যাপশন দেওয়া ছিল, 'ট্রাম্প গাজা অবশেষে এখানে।'
মিশরের পরিকল্পনা সম্পর্কে কায়রোতে এক ব্রিফিংয়ে অংশ নেওয়া এক পশ্চিমা কূটনীতিক মন্তব্য করেন, "এটি পরিষ্কার, তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে মাথায় রেখেই পরিকল্পনাটি সাজিয়েছে। এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সুপরিকল্পিত।"
এ পরিকল্পনার সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞরা টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছেন। পাশাপাশি দুবাইয়ের হোটেল ডেভেলপারদের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগানো হচ্ছে।
এছাড়া, হিরোশিমা, বৈরুত ও বার্লিনের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরগুলো কীভাবে পুনর্গঠিত হয়েছে, সে অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেওয়া হয়েছে। মিশরের 'নতুন কায়রো' প্রকল্প থেকেও অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে, যেখানে মরুভূমির মধ্যে বিশাল প্রশাসনিক শহর গড়ে তোলা হয়েছে। যদিও এতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, তিনি তার পরিকল্পনাগুলো কারও ওপর চাপিয়ে দেবেন না। তবে এখনো জোর দিয়ে বলছেন, তার পরিকল্পনাই "বাস্তবসম্মত সমাধান"।
তবে এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আরব রাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের। তাদের পরিকল্পনাই কি চূড়ান্ত হবে, নাকি ট্রাম্পের প্রস্তাব কোনোভাবে পুনরুজ্জীবিত হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
