বিশ্বকাপের মাঠে যেভাবে আরব-ইসরায়েল মুখোমুখি
সপ্তাহখানেক হল, শুরু হয়েছে ফুটবল বিশ্বকাপ-২০২২ এর আসর। প্রথমবারের মতো কোনো মুসলিম আরব দেশ আয়োজন করেছে এবারের বিশ্বকাপ। ইতোমধ্যেই এবারের আয়োজনে আরব দেশ কাতারের বিভিন্ন নিয়মনীতি, যেমন- দর্শক গ্যালারিতে মদ বিক্রি নিষেধসহ পাশ্চাত্য নানান সংস্কৃতি বর্জন করা হয়েছে, যা বেশ আলোড়ন তুলেছে বিশ্ব মিডিয়ায়। সেইসঙ্গে, দর্শকদের মাঝে বিশ্বকাপের উদন্মাদনায় আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে। আর তা হল, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু। দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে।
বিশ্বকাপ আসরের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মিশরের এক ফুটবল ভক্তকে সরাসরি সম্প্রচারে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন এক ইসরায়েলি সাংবাদিক। এ সময় মাইক্রোফোনের দিকে ঝুঁকে তাকে 'প্যালেস্টাইন' বলতে শোনা যায়।
চলতি সপ্তাহে দোহার রাস্তার আরেকটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, লেবাননের একদল লোক এক ইসরায়েলি সাংবাদিকের লাইভ করার সময় চিৎকার করে বলছেন, "এখানে কোনো ইসরায়েল নেই। এটি প্যালেস্টাইন।"
বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে কাতারের দোহায় ঢল নেমেছে বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার মানুষের। এরইমধ্যে আরব দেশগুলোর ফুটবলমোদী এবং ইসরায়েলি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে দেখা গেছে বেশ কয়েকবার। সেসব ভিডিও আবার ছড়িয়েও পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সোশ্যাল মিডিয়ায়। ফুটবল টুর্নামেন্টের এই সুযোগে নতুন করে আরও একবার জেগে উঠেছে আরব বিশ্বের পুরনো ও অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব।
মুসলিম দেশ কাতারে বিশ্বকাপের মঞ্চায়নের জন্য এলজিবিটিকিউ প্লাস হিসেবে পরিচিতদের উপস্থিতি, বিয়ার ও ওয়াইনের সহজলভ্যতা ইত্যাদি বিষয়ে ফিফার চিরায়ত নিয়মে ছাড় দিতে হয়েছে। এ নিয়ে ইতোমধ্যেই পশ্চিমে আলোচনার বিষয় হয়েছে কাতার। আবার এরই মাঝে পশ্চিমের মিত্র এবং অধিংকাশ আরবের চক্ষুশূল ইসরায়েলকে নিয়ে আরবদের মন্তব্যেও নতুন করে উঠে আসছে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু।
কাতারের সঙ্গে যদিও ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই, তবে বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে তেল আবিব থেকে দোহায় সরাসরি ফ্লাইটের জন্য বিশেষ অনুমতি দিয়েছে কাতার। ইসরায়েলি কূটনীতিকদের তাদের নাগরিকদের কনস্যুলার সেবা প্রদানে দেশের একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে অবস্থান করারও বিশেষ অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এরসঙ্গে কাতার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, বিশেষ এই অনুমতি কেবল সাময়িক সময়ের জন্য। শুধু বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে। সম্প্রতি সময়ে কিছু আরব দেশ যেভাবে ইসরায়েকে স্বীকৃতি দিয়েছে ও সম্পর্ক স্থাপন করেছে, কাতার সে ধরনের কোনো পদক্ষেপ নিতে একেবারেই আগ্রহী নয়।
যদিও ইসরায়েল বা ফিলিস্তিন কেউই খেলছে না বিশ্বকাপে, তবে দুপক্ষের ফুটবল ভক্তরা এসেছেন খেলা উপভোগ করতে। রোববার উদ্বোধনী ম্যাচের আগে কাতারের একদল ফুটবল ভক্তকে ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে স্টেডিয়ামে আসা দর্শকদের স্বাগত জানাতে দেখা যায়।
তাদেরকে এ সময় বলতে শোনা যায়, "আমরা ফিলিস্তিনের মানুষের ভালো চাই, এবং সমস্ত মুসলিম জনগণ ও আরব দেশগুলো ফিলিস্তিনের পতাকা ধারণ করছে, কারণ আমরা তাদের পক্ষে।"
তিউনিসিয়া, সৌদি আরব এবং আলজেরিয়ার সমর্থকরাও ম্যাচগুলোতে ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে খেলা দেখেছেন।
এদিকে, ইসরায়েলিদের দোহায় প্রবেশের অনুমতি দিতে কাতারের সঙ্গে চুক্তি করেছে ফিফা। একইভাবে এই চুক্তির আওতায় ফিলিস্তিনিদেরও তেল আবিব থেকে দোহায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার প্রায় সপ্তাহখানেক পর এখন পর্যন্ত, ঠিক কতজন ইসরায়েলি নিরাপত্তাকে ডিঙিয়ে কাতারে প্রবেশ করতে পেরেছেন তা এখনও স্পষ্ট নয়। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতারে পৌঁছানো অনেকেই জর্ডান বা মিশর হয়ে এসেছেন।
টুর্নামেন্টের শুরুতে, প্রায় ৪ হাজার ইসরায়েলি এবং ৮ হাজার ফিলিস্তিনি সমর্থক কাতারে প্রবেশের ভিসা পেয়েছিলেন; যদিও ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, আশা করা হচ্ছে অন্তত ২০ হাজার ইসরায়েলি শেষ পর্যন্ত কাতার যাওয়ার ভিসা পাবেন।
ভাইরাল ভিডিওগুলোর একটিতে একজন ইসরায়েলি আক্ষেপ করে বলেছেন, আরব বিশ্বের অনেক দেশ এখন ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে, সম্পর্ক স্থাপন করেছে। তারপরেও বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে এসে সেসব দেশের লোকেরাই ইসরায়েল বিদ্বেষী কথা বলছে।
অন্যদিকে, বিশ্বকাপের কাভারেজ দিতে ইসরায়েলের চ্যানেল থার্টিন স্পোর্টস-এর রিপোর্টার তাল শোরের অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, লাইভ সম্প্রচারের সময় কাতারের কর্মকর্তারা তার সঙ্গে আন্তরিক থাকলেও ফিলিস্তিনি এবং অন্যান্য আরব দেশের ফুটবল ভক্তদের সঙ্গে তার অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর ছিল না।
অনেকেই তাকে লক্ষ্য করে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। একজন মোবাইল ফোনে চিৎকার করে বলছিলেন, ইসরায়েলিদের এ দেশ থেকে বের করে দেওয়া উচিত।
ইসরায়েলি সাংবাদিক বলেন, "আমি ইসরায়েলি পাসপোর্ট নিয়ে আসতে পেরে খুবই আনন্দিত ছিলাম, ভেবেছিলাম ইতিবাচক কিছু হতে চলেছে। কিন্তু এটি দুঃখজনক, এটা অপ্রীতিকর। লোকেরা আমাদের অভিশাপ এবং হুমকি দিচ্ছিল।"
চলমান বিশ্বকাপ উত্তেজনায় অংশ নিতে ইরানের মতো কট্টর ইসরায়েল বিরোধী দেশ থেকে হাজার হাজার দর্শক এসেছে। আনুমানিক ১.২ মিলিয়ন বিদেশি ফুটবল সমর্থকরা বিশ্বকাপজুড়ে কাতারে অবস্থা করবেন। এ সময় নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে ইসরায়েলি কূটনীতিকরা একটি ভিডিও তৈরি করেছেন। সে ভিডিওতে তারা ইসরায়েলি নাগরিকদের 'লো প্রফাইল' হয়ে থাকতে বলেছেন। অর্থাৎ, নিজেদের ইসরায়েলি সত্ত্বার বহিঃপ্রকাশ ঘটে এমনকিছু করতে না করা হয়েছে তাদের। এ বিষয়ে তাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
নাগরিকদের উদ্দেশ্যে কূটনীতিক লিওর হাইয়াত বলেন, "আপনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে আপনার ইসরায়েলি জাতিসত্ত্বা এবং পরিচয় বোঝা যায় এমন কিছু করবেন না।"
