দেশি কিউপিড: ডেটিং অ্যাপের যুগে পাত্র-পাত্রীদের ডিজিটাল ঘটক
প্রজন্ম প্রজন্মান্তরে বাংলাদেশে বিয়ের শুরু হতো শুধু দুটি পরিবারের মাধ্যমে নয়, বরং তৃতীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে—ঘটক। কিন্তু গত প্রায় ২০ বছরে স্মার্টফোনের বদৌলতে ঘটকদের ভূমিকা অনেকটাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।
প্রথমে আসে জীবনসঙ্গী খোঁজার বা ম্যাচমেকিং ওয়েবসাইটগুলো, যা যেকোনো খালা-ফুপু বা আত্মীয়স্বজনের পরিচিতির পরিসরের চেয়ে অনেক বড় পরিসরে সম্ভাব্য পাত্র-পাত্রীর সন্ধান দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়।
তারপর এল বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপস, যা ম্যাচমেকিং থেকে মানুষের স্পর্শকে সম্পূর্ণরূপে মুছে দিয়েছিল—যেখানে একজন অপরিচিত মানুষের বুড়ো আঙুল দিয়ে স্ক্রিন বা পর্দা সোয়াইপ করেই মাত্র আধ সেকেন্ড সময়ের মধ্যে কেবল আপনার ছবি এবং একটি গাণিতিক নিয়ম বা অ্যালগরিদম আপনার যোগ্যতা বিচার করে ফেলে। এটি দক্ষ বা দ্রুতগতির হলেও, অত্যন্ত ফাঁপা বা প্রাণহীন।
তবে নেরিসা নাসিন সেই প্রাণহীন পদচিহ্নগুলোই অনুসরণ করে 'দেশি কিউপিড' নামে একটি জীবনসঙ্গী খোঁজার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সোয়ার্থমোর থেকে অর্থনীতিতে পড়াশোনা করে আসা নাসিনের মতে, বিয়ের জন্য উপযুক্ত মানুষ খুঁজে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবসময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল মানুষের। ঘটকরা যেমন দুই পরিবারের সঙ্গে বসে তাদের উপযুক্ততা বিচার করতেন, সেটিই ছিল আসল মূল্যবান কাজ—যা কোনো ম্যাচমেকিং অ্যাপ কখনোই অনুকরণ করতে পারবে না।
নাসিন বলেন, 'আমরা আরেকটি এমন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চাইনি, যেখানে মানুষকে শুধু ছবির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হবে। আমাদের পুরো উদ্দেশ্য ছিল বিচার-বিবেচনা, যত্ন এবং প্রাসঙ্গিকতাকে আবারও ফিরিয়ে আনা।'
যদিও 'ঘটক' শব্দটির অর্থ সহায়তাকারী, তবে এই একটি শব্দ নাসিনের দক্ষতার প্রকৃত মূল্যায়নের জন্য অনেক কম হয়ে যায়।
তিনি তার মাথায় পুরো সম্প্রদায়ের যোগ্য পাত্র-পাত্রীদের একটি জীবন্ত আদমশুমারি বা তালিকা বহন করেন। বর ও কনে একে অপরকে দেখার আগেই, তিনি উভয় পরিবারকে মেপে দেখতেন এবং এটিকে একটি ভালো জোড়া হিসেবে আখ্যা দিতেন—যেন একটির জন্যই অন্য পরিবারটি তৈরি হয়েছে। তিনি জানতেন কোন পরিবারের ছেলেটি তার ডিগ্রি বা পড়াশোনা শেষ করছে, কোন পরিবারের মেয়েটি সহজে বিয়েতে রাজি হচ্ছে না, এবং কাদের আর্থিক হিসাব বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তাদের ঠিকানার চেয়েও বেশি সমৃদ্ধ।
এটি সাধারণ কোনো ম্যাচমেকিং অ্যাপ নয়
এই পার্থক্যের বিষয়টি নাসিন খুব স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন। অনেকেই মনে করেন, দেশি কিউপিডও অসংখ্য ম্যাচমেকিং অ্যাপের মতো আরেকটি নতুন উদ্যোগ।
একটি ডেটিং অ্যাপ আসলে আপনার কাছে কী চায়? এটি আপনার কাছে কিছু ছবি, একটি চতুর বা আকর্ষণীয় সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এবং পছন্দের একটি গোছানো তালিকা চায়, যা জনসাধারণের ব্রাউজ বা দেখার জন্য সাজানো থাকে যাতে একজন অপরিচিত ব্যক্তি আপনাকে মূল্যায়ন করতে পারে এবং সামনে এগিয়ে যেতে পারে।
কিন্তু দেশি কিউপিড সম্পূর্ণ বিপরীত নীতিতে পরিচালিত হয়। এখানে গ্রাহকরা ব্যক্তিগতভাবে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জমা দেন। এরপর একজন মানুষ—কোনো অ্যালগরিদম নয়, কোনো আঙুলের স্পর্শে বাছাই নয়—তার দেওয়া ওইসব তথ্য মনোযোগ দিয়ে পড়েন দেখেন; তারপর তার সঙ্গে কে মিলবে, তা যাচাই করেন।
প্ল্যাটফর্মটির স্লোগানই বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করেছে—'ঘটকও নয়, ম্যাচমেকিং অ্যাপও নয়।'
নাসিন বলেন, 'ম্যাচমেকিং অ্যাপগুলোতে আপনি অপরিচিত মানুষের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এখানে আমরা চাই, মানুষ যেন অনুভব করে যে সত্যিই কেউ তাকে বোঝার চেষ্টা করছে।'
একটি ইনস্টাগ্রাম স্টোরি থেকে অপেক্ষমাণ তালিকা
একজন মেকআপ আর্টিস্ট কীভাবে জীবনসঙ্গী খোঁজার প্ল্যাটফর্ম খোলার সিদ্ধান্ত নিলেন, তা জিজ্ঞাসা করা হলে নাসিন হেসে ওঠেন।
সবকিছুর শুরু হয় এমন একটি বার্তা দিয়ে, যা তিনি শতবার পেয়েছেন—'আমার সঙ্গে ওর পরিচয় করিয়ে দাও, ও খুব সুন্দর।'
একদিন তিনি বিষয়টি আর এড়িয়ে না গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা প্রকাশ করেন, যেখানে জানতে চান, কারা পরিচয়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী খুঁজতে আগ্রহী।
পরদিন সকালেই ৫০ জনেরও বেশি মানুষ সাড়া দেন।
নাসিন বলেন, 'আমি সত্যিই ভেবেছিলাম, হয়তো কয়েকজন বন্ধু মজা করে উত্তর দেবে। কিন্তু একের পর এক উত্তর আসতেই থাকল। তখনই বুঝলাম, মানুষ বিষয়টিকে আমি যতটা ভেবেছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।'
এরপর তিনি সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত কাজটি করেন—চাহিদাটি সত্যিই আছে কি না, তা যাচাই করেন। তিনি একটি অনলাইন তথ্যফরম সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেন। সেখানেও আগ্রহ একইভাবে বজায় থাকে।
মানুষ সত্যিই গুরুত্বের সঙ্গে এবং নির্দিষ্টভাবে একজন উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খুঁজতে চাইছিল।
নাসিন স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'ওই তথ্যফরমটি আমার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছিল। মানুষ শুধু আর, "আমার পরিচয় করিয়ে দিন" লিখছিল না। তারা লিখছিল, তাদের জীবনে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ, কোন বিষয়গুলোতে তারা ক্লান্ত, আর কেমন মানুষকে তারা খুঁজছে।'
নাসিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় নিজেই প্রোগ্রাম লেখা শিখেছিলেন এবং সেই জ্ঞান ব্যবহার করে প্রায় একাই প্ল্যাটফর্মটির প্রথম সংস্করণ তৈরি করেন। পরে তিনি একটি ছোট দলকে সঙ্গে নেন।
তবে উদ্যোক্তা হিসেবে এটি তার প্রথম উদ্যোগ ছিল না। মহামারির শুরুর দিকে তিনি চালডালে কাজ করেছিলেন এবং নিজের একটি ব্যবসাও পরিচালনা করছিলেন।
নাসিন বলেন, 'মানুষ এতটাই জটিল যে, শুধু একটি পরিচিতি-তথ্য বা প্রোফাইল দিয়ে তাকে পুরোপুরি বোঝা যায় না। অনেক সময় একটি ছোট উত্তরে এমন অনেক কিছু বোঝা যায়, যা দশটি নিখুঁত ছবিতেও বোঝা যায় না।'
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত প্ল্যাটফর্মটির জনপ্রিয়তা পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিপণন বা বিজ্ঞাপন ছাড়াই, মূলত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে মুখের কথার মাধ্যমেই এটি ছড়িয়ে পড়েছে।
প্ল্যাটফর্মটির ওয়েবসাইটে বর্তমানে ৮০০-এরও বেশি মানুষ সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী খুঁজতে অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন।
নাসিনের ভাষ্য, নিবন্ধনকারীদের মধ্যে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বিদেশে বসবাস করেন।
তিনি বলেন, 'বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা আমাদের সেবায় ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছেন। তাদের কাছে দেশি কিউপিড মানে এমন একজন মানুষকে খুঁজে পাওয়া, যিনি তাদের সংস্কৃতি বোঝেন এবং যাকে সবকিছু আলাদা করে ব্যাখ্যা করতে হয় না।'
এ মুহূর্তে দলটি ইচ্ছাকৃতভাবেই বিপণন বা বিজ্ঞাপনের কাজ থেকে বিরত থাকছে—লজ্জার কারণে নয়, বরং বাস্তব হিসাবের কারণে।
একটি সফটওয়্যার মুহূর্তেই অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, কিন্তু দক্ষ একজন ঘটককে সেইভাবে দ্রুত তৈরি করা যায় না।
নাসিনের মতে, প্রকৃত সীমাবদ্ধতা আগ্রহী মানুষের অভাব নয়; বরং দক্ষ মানুষ খুঁজে পাওয়া।
তিনি বলেন, 'আপনি পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পারেন। কিন্তু একজন মানুষকে সত্যিকার অর্থে বোঝার কাজটি কখনো স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা যায় না।'
এটি কীভাবে কাজ করে
অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে সুযোগ পাওয়ার পর একজন ঘটক আবেদনকারীকে কয়েকটি প্রশ্ন করেন।
এরপর তিনি আবেদনকারীর পারিবারিক পটভূমি, মূল্যবোধ এবং বিয়ের উদ্দেশ্য বিবেচনা করে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে মাত্র একজন সম্ভাব্য সঙ্গীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। পরিচয়টি হয় বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে, কোনো পরিচয়ভিত্তিক অ্যাপের মতো এলোমেলো বার্তা পাঠিয়ে নয়।
এখানে এমন একটি বিকল্পও রয়েছে, যেখানে কেউ ধর্মীয় অনুশীলনে কতটা আন্তরিক, নাকি মূলত সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালি—সেটিও জানানো যায়।
প্রতিটি পরিচয়ের জন্য নির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট ফি রয়েছে, যা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে যেমন পরিশোধ করা যায়, তেমনি আন্তর্জাতিক অনলাইন অর্থপ্রদানের ব্যবস্থার মাধ্যমেও দেওয়া যায়।
এতে নিবন্ধন বা সাইন আপ করা যায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। তবে একবার উপযুক্ত জোড় বা সঙ্গী মিলে গেলে এই প্ল্যাটফর্মের চার্জ বা ফি কার্যকর হয়। ব্যবহারকারীদের তাদের নির্বাচিত সঙ্গীর সাথে প্রথমবার সামনাসামনি দেখা করার ব্যবস্থা করার জন্য ৫০ ডলার চার্জ করা হয়। যদি তাদের যোগাযোগ আরও এগিয়ে যায় এবং এই দম্পতি তৃতীয়বারের মতো দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন, তবে প্ল্যাটফর্মটি অতিরিক্ত আরও ১০০ ডলার চার্জ বা ফি নেয়।
নাসিন বলেন, 'মানুষ এতটাই জটিল যে, একটি পরিচিতি-তথ্যে তার সবকিছু ধরা পড়ে না। অনেক সময় একটি ছোট উত্তরই দশটি নিখুঁত ছবির চেয়ে অনেক বেশি কিছু বলে দেয়।'
প্ল্যাটফর্মটির ওয়েবসাইটে একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, 'কথা বলা শুরু করতে আমার কিছুটা সাহসের প্রয়োজন হয়েছিল। কিন্তু তারপর থেকে সবকিছু খুব সহজ ছিল। আমাদের কথোপকথন ছিল স্বাভাবিক, আরামদায়ক এবং সত্যিই উপভোগ্য—যদিও আমরা শুধু বার্তা ও ভয়েস বার্তা বিনিময় করেছি। একটুও অস্বস্তিকর লাগেনি, আর তিনি পুরো সময়ই ভদ্র আচরণ করেছেন।'
পরনিন্দামুক্ত বা গসিপহীন একজন ঘটক
ঐতিহ্যগত ঘটকদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তথ্য। তারা অনেক কিছু জানতেন। কিন্তু একই সঙ্গে সেটিই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। কে কোথায় প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, কার পরিবারের আর্থিক অবস্থা কেমন, কোন বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে গেছে—এসব বিষয়ই প্রায়ই সন্ধ্যার আড্ডার পরনিন্দা বা গসিপে পরিণত হতো।
নাসিন বিশ্বাস করেন, চাইলে আপনি প্রথমটি অর্থাৎ তথ্য নিজের কাছেও রাখতে পারবেন এবং দ্বিতীয়টি অর্থাৎ পরনিন্দা বা গসিপকেও পুরোপুরি বাদ দিতে পারছেন।
তিনি বলেন, 'ঘটকের ধারণাটি আমার ভালো লাগে। কিন্তু পরনিন্দা, সামাজিক চাপ এবং এমন অনুভূতি—যেন আপনার সিদ্ধান্তের মালিক অন্য সবাই—এসব আমার ভালো লাগে না। দিনশেষে, মানুষ এখনও চায় তাকে যেন সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়। শুধু পছন্দ বা লাইক পাওয়া নয়, কিংবা পর্দায় আঙুলের সোয়াইপ বা টান খাওয়া নয়—মানুষ চায় কেউ তাকে সত্যিই দেখুক বা বুঝুক।'
