ফেসবুকে বিশ্বকাপ: মৌসুমি ফ্যান বনাম আসল ফ্যান
ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই বাধে হুলস্থুল কাণ্ড। হঠাৎ করেই দেশের ফুটবল ভক্তদের জাতীয়তায় পরিবর্তন আসে! কেউ ব্রাজিল, কেউ আর্জেন্টিনা, কেউবা জার্মানি-স্পেন-ফ্রান্স। গায়ে চড়ে প্রিয় দলের জার্সি, ছাদে-দেয়ালে ওড়ে পতাকা। পাড়ার মোড়ে চায়ের কাপে ঝড় ওঠে, ফেসবুকের নিউজফিড ভরে যায় ফুটবলীয় দর্শনে। উপচে পড়া এই ভক্তিরসেই জমে ওঠে বিশ্বকাপ। অবশ্য গন্ডগোলও কম বাধে না। প্রায়ই সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়—অমুক জায়গায় বচসা, তমুক জায়গায় মাথা ফাটাফাটি!
দল নিয়ে দ্বন্দ্ব তো চিরন্তন। এর বাইরে আরেকটি কলহ এ সময় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় 'মৌসুমি ফ্যান বনাম আসল ফ্যান' লড়াই! এই বিতর্কের কোনো ফিফা স্বীকৃতি নেই, 'ফ্যান' ক্যাটাগরির নেই কোনো অফিশিয়াল সার্টিফিকেট। তবু এর দেখা মেলে চার বছর পর পর।
তা 'আসল ফুটবল ফ্যান' কারা? এরা সাধারণত আত্মস্বীকৃত! তবে পরিচয় খুব স্পষ্ট। এরা প্রায় সারা বছরই ফুটবলের খোঁজখবর রাখেন। ফুটবলের ইতিহাস-ভূগোল-দর্শন এদের নখদর্পণে। কোন কোচের কী ট্যাকটিকস, কে কোন ক্লাবে ট্রান্সফার হচ্ছেন, কোন খেলোয়াড়ের খেলার ধরন কী—সবই জানেন তারা। রাত জেগে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ দেখার পর সকালে ক্লাস কিংবা অফিসে গিয়ে লাল চোখ নিয়ে চলে তাদের নিখুঁত ম্যাচ বিশ্লেষণ! সোজা কথায়, ফুটবল খেলা দেখাকে 'শিল্পের' পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া কট্টর ভক্তরাই নিজেদের মনে করেন ফুটবলের 'প্রকৃত' ফ্যান।
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এদের মনে হালকা দুশ্চিন্তা শুরু হয় (নিন্দুকেরা অবশ্য বলেন 'হিংসা'!)। কারণ তারা জানেন, এবার মাঠে নামবে 'মৌসুমি ফ্যান'রা। চার বছর ধরে যাদের ফুটবল নিয়ে কোনো পোস্ট দেখা যায়নি, তারাই হঠাৎ প্রোফাইল পিকচার বদলে আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের জার্সি পরে হাজির। কেউ কেউ নাকি এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে ম্যাচ প্রেডিকশন দেন, যেন এইমাত্র কোচের সঙ্গে ট্যাকটিক্যাল মিটিং সেরে এলেন!
এদের নিয়েই 'আসল ফুটবল ফ্যান'দের যত ঠাট্টা-বিদ্রূপ। সামাজিক মাধ্যমে চলে পোস্টের পর পোস্ট আর মিম-বর্ষণ। 'তোমরা অফসাইড বোঝো তো?'—এমন সব বাক্য দিয়েই শুরু হয়ে যায় তক্কাতক্কি! 'সিজনাল' ফ্যানদের জন্য প্রিয় দলের খেলোয়াড়দের নাম মুখস্থ করানোর কোর্সও অফার করে বসেন কোনো কোনো গর্বিত 'আসল ফ্যান'। ফেসবুকে তারা বাতলে দেন মৌসুমি ফ্যান শনাক্ত করার উপায়! যেমন: 'মৌসুমি ফ্যান তারাই যারা মনে করে জুলে রিমে বিশ্বকাপ না! নিজের পছন্দের দল যত খারাপই খেলুক, তারা তা মানতে চায় না। তারা মনে করে, নিজের প্রিয় খেলোয়াড়ের চেয়ে ভালো বিশ্বে আর কেউ নেই।'
একেকজন তো 'সিজনাল'দের যন্ত্রণায় রেগেমেগে অস্থির হয়ে ওঠেন। এক 'আসল ফ্যান' যেমন ফেসবুকে লিখেছেন, 'সিজনাল ফুটবল ফ্যান কারা জানেন? ক্লাব ফুটবল চললে এদের দেখা পাওয়া যায় না। ইউসিএল, লিগ, কোপা লিবার্তাদোরেস কিছুই দেখে না। কিন্তু ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ, কোপা আমেরিকা বা ইউরোর সময় হঠাৎ করেই ফুটবল পণ্ডিত হয়ে যায়। সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার হচ্ছে এরা খেলা বোঝার চেয়ে তর্ক বেশি করে। একটা ম্যাচ দেখেই পুরো ফুটবলের ইতিহাস বুঝে ফেলছে এমন ভাব নিয়ে কথা বলে। একজন প্লেয়ার একটা ম্যাচ খারাপ খেললেই ওভাররেটেড আর ভালো খেললেই সর্বকালের সেরা বলা শুরু করে দেয়।'
বিশ্বকাপে নিজের প্রিয় দলকে সমর্থন করতে আসা তথাকথিত 'মৌসুমি' ভক্তরাও কম যান না। তারাও ফেসবুকে একহাত নেন নিজেদের 'ফুটবল বিশেষজ্ঞ' মনে করা ভক্তদের। 'যারা নিজেদের প্রকৃত ফ্যান দাবি করে, এদের কি টিম থেকে স্যালারি দেয়?'—প্রশ্ন করেন তারা। 'ফুটবল দেখার জন্য পিএইচডি লাগে নাকি?'
ফিফা থেকে নাকি 'আসল ফ্যান'রা মাসিক রেশন পান—এমন টিপ্পনী কাটতেও দেখা যায় ফেসবুকে। ফিফার এই রেশনের কাল্পনিক একটি তালিকাও পাওয়া গেল! 'প্রকৃত বাংলাদেশের একজন রেগুলার ফুটবল ফ্যানের জন্য ফিফা থেকে মাসিক বরাদ্দকৃত রেশন সামগ্রীর নাম ও পরিমাণ:
১) কফি- ২.০০ কেজি
২) চিনি- ৪.০০ কেজি
৩) মুড়ি- ৫.০০ কেজি
৪) চানাচুর- ৪.০০ কেজি
৫) টোস্ট বিস্কুট- ৫.০০ কেজি
৬) ইয়ার প্লাগ- ২.০০ পিস
৭) কোলবালিশ- ১টি
৮) গাঁজা বা ভাং গাছের শাখা-প্রশাখা- ৫০০.০০ গ্রাম
'প্রকৃত ফ্যান'দের রাগিয়ে দেওয়ার পদ্ধতিও বাতলে দিচ্ছেন অনেকে। এই যেমন জাকারিয়া তাসরিক নামে একজন কয়েকটি কৌশল বের করেছেন। তিনি লিখেছেন, ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ আসছে। সিজনাল ফ্যান হিসেবে অলটাইম ফ্যানদের রেজবেইট করার কিছু টিপস:
১. স্ট্রাইকার না বলে বলবেন সেন্টার ফরোয়ার্ড।
২. কেউ ফরমেশন নিয়ে কথা বললে বলবেন—ফরমেশনে গোলকিপার নেই কেন? কেউ যদি বলে ৪-৪-২ বেস্ট ফরমেশন, আপনি বলবেন ১-৪-৪-২। টিমে ১১ জন খেলে, ১০ জন না।
৩. কেউ ডিফেন্ডারের প্রশংসা করলে বলবেন, 'ও তো বল কাটাইতে পারে না, লাভ কী?'
৪. অফসাইডের রুল সব থেকে গরম ইস্যু। নিজের মতো বানিয়ে নেবেন।
৫. থ্রু বল, লং পাস, গ্রাউন্ড পাস—বেশি বেশি ব্যবহার করবেন কথায়।
৬. মেসি না রোনালদো গোট (GOAT)—এই কথা উঠলে বলবেন যে রবার্তো কার্লোস গোট।
৭. কোচের ব্যাপারে কথা চললে বলবেন ফাব্রিজিও রোমানো বেস্ট।
৮. সেন্টার ব্যাক সামনে এসে খেলে না কেন—এ ব্যাপারে মতামত দেবেন।
৯. গোলকিপারের সাথে ১ বনাম ১ (1v1) সিনারিওতে বলবেন, জিকে রাশ দিল না কেন?
১০. পছন্দের টিম হেরে গেলে বলবেন সব মেক্সিকান ইমিগ্রেন্টদের দোষ।
অনেক ফুটবল ভক্তেরই হয়তো সারা বছর খেলা নিয়ে মাতামাতি নেই, বছরজুড়ে ফেসবুক সরগরম করেন না ম্যাচ প্রেডিকশন দিয়ে। তবে বিশ্বকাপ এলেই বদলে যায় সব। ফুটবল নিয়ে মেতে ওঠেন তারা। অনেকের মতে, এই ভক্তরাই বিশ্বকাপের প্রাণ!
ওমর শরিফ রায়হান নামে একজন লিখেছেন, 'আমি মনে করি সিজনাল ফ্যান হওয়াটা কোনো খারাপ বিষয় না। সব মানুষের জীবন, ব্যস্ততা আর আগ্রহ একরকম হয় না। কেউ সারা বছর খেলা ফলো করে, আবার কেউ শুধু বড় টুর্নামেন্টের সময় নিজের প্রিয় দলকে সাপোর্ট করে। শেষ পর্যন্ত ফুটবল তো আনন্দ আর আবেগের জায়গা।'
তবে নিজেদের 'ফ্যান' ক্যাটাগরি নিয়ে যতই দ্বন্দ্ব থাকুক, বিশ্বকাপে প্রিয় দলের জয় উদযাপনে তেমন কোনো পার্থক্য থাকে না। হয়তো একজন সারা বছর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ দেখেন, অন্যজন চার বছরে একবার বিশ্বকাপ দেখেন। কিন্তু প্রিয় দলের ম্যাচ টাইব্রেকারে গেলে দুজনের বুকই ধড়ফড় করে। গোল মিস হলে দুজনই মাথায় হাত দেন। আর জয় পেলে একই উল্লাস!
ফুটবলের আসল সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই। এটি মানুষকে একই আবেগে যুক্ত করতে পারে। তাই 'মৌসুমি' ফ্যান আর 'বোদ্ধা' ফ্যানদের একে অন্যকে নিয়ে মজা করাটাও বিশ্বকাপ উন্মাদনারই অংশ হয়ে ওঠে। একজন ফুটবলকে ভালোবাসেন অভ্যাস থেকে, আরেকজন উৎসব হিসেবে। কিন্তু ভালোবাসা তো ভালোবাসাই। কারণ বিশ্বকাপের রাতে গোল হওয়ার পর পাশের বাসা থেকে ভেসে আসা চিৎকার শুনে বোঝার উপায় নেই, সেটি কোনো ট্যাকটিকস-বোদ্ধা 'ডাই-হার্ড' ফুটবল ফ্যানের চিৎকার, নাকি চার বছর পর আবার ফুটবলের প্রেমে পড়া এক মৌসুমি সমর্থকের!