বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর: 'ডার্ক হর্স' মোস্তাকুর রহমান কি পারবেন সফল হতে?
বুধবার দুপুরে খবর আসে—বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে, নতুন গভর্নর হচ্ছেন মো. মোস্তাকুর রহমান নামের একজন। এ তথ্য ছড়িয়ে পড়তেই ঢাকার বিভিন্ন সংবাদকক্ষে তৈরি হয় এক ধরনের বিভ্রান্তি। তথ্যপ্রবাহের এই ব্যস্ত জগতে যেন আচমকাই ঘনিয়ে আসে অনিশ্চয়তার মেঘ।
সাংবাদিকদের মনে তখন ঘুরপাক খাচ্ছিল একটিই প্রশ্ন—কে এই মোস্তাকুর রহমান? শুরুতে গুঞ্জন ওঠে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এক বাংলাদেশি অর্থনীতি অধ্যাপকই নাকি আহসান এইচ মনসুরের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন।
তবে বিষয়টি নিশ্চিত হতে নিউজরুমের সহকর্মীরা গুগলে নামটি লিখে দ্রুত অনুসন্ধান শুরু করেন। কিন্তু কথিত সেই অর্থনীতি অধ্যাপকের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে নতুন গভর্নরকে ঘিরে তৈরি হয় আরও বেশি রহস্য ও অনিশ্চয়তা।
নতুন গভর্নরের নাম ঘোষণার পর একই নামের কারণে বিভ্রান্তি আরও চরম রূপ নেয়। ব্যাংকিং ও বাণিজ্য বিটে কাজ করা সাংবাদিকরা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) পরিচালক মোস্তাকুর রহমানকে পরবর্তী গভর্নর ভেবে তাকে অভিনন্দন জানাতে শুরু করেন। এমনকি বেশ কিছু গণমাধ্যম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই বিএফআইইউ কর্মকর্তার ছবিসহ পোস্ট দিয়ে তাকে নতুন গভর্নর হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়।
অবশেষে বিকেলের দিকে ধোঁয়াশা কেটে যায়। তখন জানা গেল, কোনো অর্থনীতিবিদ বা আমলা নন, বরং পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হেরা সোয়েটার্সের সিইও মো. মোস্তাকুর রহমানই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাল ধরছেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠন হওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় এই রদবদল ঘটল। চরম মেরুকরণ ও বিরোধীদের নানা প্রশ্নের মুখে থাকা সেই নির্বাচনে কোনো 'ডার্ক হর্স'-এর উদয় না ঘটলেও, গভর্নর পদে এই নিয়োগ সবাইকে বড় ধরনের চমক দিয়েছে।
মোস্তাকুর রহমানের এই নিয়োগ কেবল একটি চমকপ্রদ উত্থান নয়; বরং এটি ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন নাগরিকদের সমানভাবে বিস্মিত করেছে।
দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ব্যবসায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হলেন। ১৯৭২ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে সব সময় অর্থনীতিবিদ, আমলা অথবা পেশাদার ব্যাংকাররাই আসীন ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নরদের একজন, অর্থনীতিবিদ ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ফখরুদ্দীন আহমদ ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
তার উত্তরসূরি সালেহউদ্দিন আহমেদ সদ্য বিদায়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ছিলেন। ওই অন্তর্বর্তী সরকারই ২০২৪ সালের আগস্টে ব্যাংক খাত সংস্কারের কঠিন দায়িত্ব দিয়ে আইএমএফের সাবেক অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুরকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়।
৭২ বছর বয়সী মনসুরকে এ পদে বসাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আইন সংশোধন করে গভর্নরের বয়সসীমা ৬৭ থেকে বাড়িয়ে ৭২ বছর করে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর যখন দেশের আর্থিক খাত কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, তখনই ড. মনসুর দায়িত্ব নেন। তার পূর্বসূরি আব্দুর রউফ তালুকদার সরকার পরিবর্তনের পরপরই আড়ালে চলে যান।
আহসান মনসুর ব্যাংক খাতের গভীর সংকট চিহ্নিত করা এবং দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার পরিচয় দেন। বুধবার দুপুরে বিদায় নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ব্যাংক খাতে আংশিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন এবং দীর্ঘমেয়াদি কয়েকটি সংস্কার কার্যক্রমের সূচনা করেন।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিএনপি ক্ষমতায় এলে তার দায়িত্বে থাকা নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হয়।
শেষ পর্যন্ত তার বিদায় হয় আকস্মিকভাবে। আব্দুর রউফ তালুকদার ছাড়া অতীতে আর কোনো গভর্নরকে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে দায়িত্ব ছাড়তে হয়নি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল তার বিদায়ের দৃশ্য। বুধবার বিকেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একদল কর্মকর্তা তার কিছু সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভে নামেন এবং তাকে অফিস ভবন ত্যাগ করতে বাধ্য করেন। গাড়িতে ওঠার সময় মনসুর সাংবাদিকদের বলেন, 'আমি পদত্যাগ করিনি, আমাকে সরিয়েও দেওয়া হয়নি। গণমাধ্যমে খবর দেখে আমি বাড়ি চলে যাচ্ছি।'
এই ঘটনাকে অনেকেই নতুন সরকারের 'মব'-এর বিরুদ্ধে ঘোষিত কঠোর অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখছেন, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে প্রথমবার একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি আইনি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। তাদের মতে, ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক পদে একজন ব্যবসায়ীর নিয়োগ সরাসরি 'কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট' (স্বার্থের সংঘাত) নীতির পরিপন্থী।
'দীর্ঘজীবী হোক এফআইডি!'
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার আগে এবং পরে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যাংকিং খাতের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) বিলুপ্ত করার কথা বলেছিলেন।
গত বছরের ২৭ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এফআইডি গঠন করা হয়েছিল মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্দেশ্যে। প্রথম আলোতে প্রকাশিত তার ভাষ্য অনুযায়ী, পছন্দের ব্যক্তিদের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া এবং পরিচালনা পর্ষদে বসিয়ে লুটপাটের সুযোগ তৈরি করাই ছিল এর লক্ষ্য।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বিএনপি তাদের আগের শাসনামলে এই বিভাগটি বিলুপ্ত করেছিল। তবে শেখ হাসিনা পরবর্তীতে এটি পুনরায় চালু করেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, বিএনপি আবার ক্ষমতায় এলে বিভাগটি পুনরায় বিলুপ্ত করা হবে।
আমীর খসরু তখন জোর দিয়ে বলেন, আর্থিক খাতে সংস্কার ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংককে শুধু স্বায়ত্তশাসন দিলেই হবে না, বরং পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই এফআইডিই বুধবার বিকেলে নতুন গভর্নরের নিয়োগসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করল, যার মাধ্যমে আহসান মনসুরের মেয়াদের আকস্মিক অবসান ঘটে।
এতে মনে হচ্ছে, অর্থমন্ত্রী অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং আর্থিক খাতকে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যে এক 'ডার্ক হর্স'-এর ওপর বাজি ধরেছেন। অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুযায়ী, 'ডার্ক হর্স' বা 'কালো ঘোড়া' বলতে এমন একজন প্রতিযোগী বা প্রার্থীকে বোঝায়, যার সম্পর্কে মানুষের ধারণা কম, কিন্তু তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে সফল হন।
খেলাধুলা হোক কিংবা রাজনীতি—একজন 'ডার্ক হর্স' তখনই সফল হতে পারেন, যখন খেলার নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর থাকে।
তবে এ ক্ষেত্রে 'সাফল্য' বলতে কী বোঝানো হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। সাফল্য যদি হয় কেবল ব্যবসায়ী মহলকে সন্তুষ্ট করতে সুদের হার কমিয়ে আনা, তাহলে নতুন গভর্নর হয়তো সফল হবেন। কিন্তু সাফল্য যদি হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা এবং সাধারণ মানুষের প্রধান সংকট মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা, তবে তার ব্যবসায়ী পরিচয়ই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
শেষ বৈঠক
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে নতুন অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন আহসান এইচ মনসুর। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান, গত কয়েক মাসে নেওয়া বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি মন্ত্রীকে অবহিত করেছেন।
মনসুর অর্থমন্ত্রীর বরাত দিয়ে বলেন, নতুন সরকার ব্যাংকিং খাতের চলমান সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। এমনকি অপসারণের আগের দিন, অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারিও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে তার আরেকটি বৈঠক হয়েছিল।
বুধবার অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, সরকারের অগ্রাধিকার ও নীতিগত লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এ প্রশাসনিক রদবদল করা হয়েছে। ইউএনবির প্রতিবেদন অনুযায়ী সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকে নয়, আরও অনেক জায়গাতেই পরিবর্তন আনা হয়েছে।'
তবে একটি বড় প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে: কেন আহসান মনসুরকে এভাবে হঠাৎ ও অসম্মানজনকভাবে বিদায় দেওয়া হলো?
এর পেছনে কি সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে তার অনড় অবস্থান কাজ করেছে? দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে আসছেন, উচ্চ সুদের হারের কারণে তাদের ব্যবসার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তবে আহসান মনসুরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংক লাগামহীন মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে 'কঠোর মুদ্রানীতি' বজায় রেখেছিল।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত বর্তমান মুদ্রানীতিতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই অবস্থান বহাল রাখে। বাংলাদেশ ব্যাংক তখন জানিয়েছিল, সামনে জাতীয় নির্বাচন, রমজান এবং সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের কারণে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
মুদ্রানীতি ঘোষণার অনুষ্ঠানে আহসান এইচ মনসুর বলেছিলেন, 'সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে অর্থবাজার চাপের মুখে পড়েছে এবং সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।'
এসব ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য 'পলিসি রেট' নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক।
'ম্যাড কিং' ট্রাম্প বনাম জেরোম পাওয়েল
দীর্ঘদিন ধরেই উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত—মুদ্রানীতি পরিচালনার সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা লক্ষ্য নির্ধারণ করবেন, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক চাপ ছাড়াই সেই লক্ষ্য অর্জনে স্বাধীনভাবে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেবে।
যুক্তরাষ্ট্রে অবশ্য একসময় প্রেসিডেন্টদের জন্য ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) এমন নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ তোলা, যেগুলোর সঙ্গে তারা একমত নন, ছিল বেশ সাধারণ ঘটনা।
তবে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সময় থেকে চিত্র বদলে যেতে শুরু করে। ক্লিনটন সিদ্ধান্ত নেন, তিনি ফেডারেল রিজার্ভের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করবেন না। তার আট বছরের শাসনামলে তিনি এ অবস্থানে অনড় ছিলেন। তার উত্তরসূরি জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বারাক ওবামাও তাদের আট বছরের মেয়াদে এই ঐতিহ্য অনুসরণ করেন।
কিন্তু ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর সেই ঐতিহ্যের অবসান ঘটে।
২০১৮ সালে ট্রাম্প নিজেই জেরোম পাওয়েলকে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন। পেশায় আইনজীবী পাওয়েলের সঙ্গে ২০২৫ সালে এসে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সম্পর্ক তীব্র টানাপোড়েনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, যাঁক নিজেই নিয়োগ দিয়েছিলেন, তার সঙ্গেই এখন প্রকাশ্য বিরোধে জড়িয়েছেন ট্রাম্প।
পরিস্থিতির কিছু দিক অনেকটা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানকে ঘিরে তৈরি হওয়া বাস্তবতার সঙ্গে তুলনীয়: ট্রাম্প চেয়েছিলেন, পাওয়েল সুদের হার কমিয়ে দিক—যাতে ক্রেডিট কার্ড, মর্টগেজ ও অন্যান্য ঋণের খরচ কমে এবং অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হয়।
কিন্তু মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়ে পাওয়েল এতে একমত হননি। তিনি সুদের হার অপরিবর্তিত রাখেন। ট্রাম্পের যুক্তি ছিল, মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যে কমে এসেছে; ফলে উচ্চ সুদের হার বজায় রাখা অর্থনীতির জন্য অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
জেরোম 'জে' পাওয়েল বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রভাবশালী একটি পদে আসীন। মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক প্রভাবের কারণে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান হিসেবে বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ পদটি অত্যন্ত স্বায়ত্তশাসিত, এবং ফেডের স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
রিপাবলিকান হিসেবে নিবন্ধিত ফেড চেয়ারম্যানের সঙ্গে বারবার মতবিরোধ সত্ত্বেও ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে পাওয়েলকে অপসারণ করেননি। এ পদের মেয়াদ চার বছর। ২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তাকে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য মনোনয়ন দেন। ফলে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাওয়েলের দায়িত্ব নিশ্চিত হয়।
ট্রাম্প একসময় বলেছিলেন, 'সত্যি বলতে, বাইডেন কেন তাকে পুনরায় নিয়োগ দিয়ে মেয়াদ বাড়াল, তাতে আমি অবাক হয়েছি।'
কিন্তু এখন ট্রাম্প পাওয়েলকে তার নীতিগত এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই তিনি পাওয়েলকে পদত্যাগের আহ্বান জানাচ্ছেন এবং সুদের হার না কমালে বরখাস্তের হুমকিও দিচ্ছেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনের পর নভেম্বরে সাংবাদিকরা পাওয়েলকে প্রশ্ন করেছিলেন—তিনি কি পদত্যাগ করবেন, অথবা ট্রাম্পের তাকে বরখাস্ত করার ক্ষমতা আছে বলে মনে করেন কি না।
জবাবে পাওয়েল বলেন, 'আইনে এর কোনো অনুমতি নেই।'
ফলে ২০২৬ সালের মে মাসে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পাওয়েলকে সরিয়ে দেওয়ার কার্যকর কোনো পথ ট্রাম্পের হাতে নেই। এমনকি চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ হলেও তিনি ২০২৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বোর্ড অব গভর্নরসে থাকতে পারবেন। অর্থাৎ, হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের অবশিষ্ট সময়ের মধ্যে তাকে পুরোপুরি বিদায় করা সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে যা প্রেসিডেন্টের পক্ষে সম্ভব নয়, বাংলাদেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি)-এর জন্য তা যেন নিত্যদিনের ঘটনা—মাত্র দুটি সংক্ষিপ্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে দায়িত্বরত গভর্নরকে সরিয়ে দিয়ে একই সঙ্গে নতুন গভর্নরের নাম ঘোষণা করা।
