‘রিল থেকে রিয়েল’ সংলাপ: তরুণদের কাছে টানতে তারেক রহমানের নতুন রাজনৈতিক কৌশল
রাজধানীর গুলশানের বিচারপতি শাহাবুদ্দিন পার্ককে আজ আর দশটা সাধারণ রাজনৈতিক সমাবেশের স্থল বলে মনে হচ্ছিল না। পার্কের পাশ দিয়ে আপনমনে হেঁটে যাচ্ছিল শিশুরা, প্রাতঃভ্রমণকারীরা কৌতূহলী চোখে খানিকটা গতি কমিয়ে দেখছিলেন কী হচ্ছে। আর সাধারণ পথচারীরা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন এক অভূতপূর্ব দৃশ্য—এরই মাঝে একদল তরুণের সঙ্গে গোল হয়ে বসে কথা বলছেন এমন একজন মানুষ, যাকে দীর্ঘদিন ধরে রাজপথের সাধারণ রাজনীতি থেকে দূরে দেখা যেত।
কোনো ব্যারিকেড নেই, নেই কোনো সুউচ্চ মঞ্চ। কোনো প্রটোকল ছাড়াই সাধারণ মানুষের কাতারে বসে তরুণদের কথা শুনছেন তিনি। ২৪ জানুয়ারি দুপুর ২টার দিকে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মুখোমুখি হলেন কোনো রুদ্ধদ্বার কক্ষে নয়, বরং খোলা আকাশের নিচে এবং তাদের সমান্তরাল আসনে বসে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) তরুণদের জন্য খুব একটা জায়গা নেই। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এই সংশয় আরও বাড়ে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আধুনিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্মের ভাষা প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলো বুঝতে পারছে কি না। তবে গত কয়েক সপ্তাহে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।
তার নির্বাচনি প্রচারণার শুরুটা কোনো বিশাল জনসভা বা অগ্নিঝরা বক্তৃতা দিয়ে নয়, বরং শুরু হয়েছে সংলাপের মাধ্যমে। সিলেটে 'দ্য প্ল্যান: ইয়ুথ পলিসি ডায়ালগ উইথ তারেক রহমান'-এর মাধ্যমে তিনি এই যাত্রা শুরু করেন। সেখানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সুশাসন নিয়ে সরাসরি তরুণদের প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। স্লোগান নয়, বরং সেখানে গুরুত্ব পায় ভবিষ্যৎ নীতি ও তরুণদের কথা শোনা। এরই ধারাবাহিকতায় আজ গুলশানে তিনি 'আমার ভাবনায় বাংলাদেশ' নামক রিল মেকিং প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
গত বছরের ১৬-২৫ ডিসেম্বরে আয়োজিত এই রিল প্রতিযোগিতাটি ছিল রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার এক নতুন পরীক্ষা। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের ভাবনার কথা জানিয়ে এক মিনিট দৈর্ঘ্যের ভিডিও আহ্বান করা হয়েছিল সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে। ফ্যামিলি কার্ড, ফারমার্স কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, পরিবেশ রক্ষা, খেলাধুলা, প্রবাসী কল্যাণ, নারীর ক্ষমতায়ন এবং দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের ভিশনসহ মোট ১১টি থিম নির্ধারণ করা হয়েছিল। সারা দেশ থেকে ২,২০০-এর বেশি অংশগ্রহণকারী এতে অংশ নেন। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের ডিজিটাল কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত বিরল।
প্রতিযোগিতার মূল্যায়নে ৩০ শতাংশ ছিল জনমত (পাবলিক ভোটিং) এবং ৭০ শতাংশ ছিল জুরিবোর্ডের নম্বর। এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সেরা ১০ জন বিজয়ীকে কোনো নিছক চেক বা সার্টিফিকেট নয়, বরং দেওয়া হয় সরাসরি বিএনপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে বসে আলোচনার সুযোগ।
বিচারপতি শাহাবুদ্দিন পার্কে এই আলোচনা ছিল কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই। পার্কটি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল, যা প্রমাণ করে এটি কোনো সাজানো রাজনৈতিক অনুষ্ঠান নয় বরং একটি প্রকৃত মতবিনিময়। বিজয়ীরা একে একে তাদের প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। ফ্যামিলি কার্ড বা ফারমার্স কার্ড কীভাবে আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে তারা সরাসরি তারেক রহমানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন এবং উন্নয়নের পরামর্শ দেন। তারেক রহমান গভীর মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শোনেন এবং মাঝে মাঝে পাল্টা প্রশ্ন করে আলোচনাকে প্রাণবন্ত করে তোলেন।
তারেক রহমান তরুণদের সৃজনশীলতার প্রশংসা করেন এবং কীভাবে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে নাগরিক দায়িত্ব পালনে তরুণরা অবদান রাখতে পারে, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন। তিনি বারবার একটি বিষয়ে জোর দেন, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে তরুণদের কেবল প্রতিনিধিত্ব করলেই চলবে না, বরং নেতৃত্ব দিতে হবে। পরিবর্তন কোনো একক নেতা বা দলের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এটি আসবে সেই প্রজন্মের হাত ধরে যারা দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।
অনুষ্ঠানে তার পাশে ছিলেন ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। জাইমাও সম্প্রতি তরুণ প্রজন্মের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় নীতি-নির্ধারণী বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন। এই বাবা-মেয়ের উপস্থিতি রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং নতুন প্রজন্মের চিন্তার মধ্যে এক ধরনের সেতুবন্ধন হিসেবে দেখা দিচ্ছে। আলোচনা শেষে তারা বিজয়ীদের সঙ্গে ছবিও তোলেন।
এর আগে সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির নির্বাচনি পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, 'এই আয়োজন রাষ্ট্র গঠনে জনমতকে অন্তর্ভুক্ত করার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।'
তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দেন যে, ফ্যামিলি কার্ড বা ফারমার্স কার্ডের নাম করে যদি কোনো প্রতারক চক্র টাকা দাবি করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি অঙ্গীকার করেন, যদি বিএনপি জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসে, তবে এই কার্ডগুলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের মাঝে বিতরণ করা হবে।
গুলশানের এই আয়োজনের অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল এর ধরণ। সাধারণত রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যানের সঙ্গে অ-রাজনৈতিক তরুণদের এভাবে খোলামেলা পরিবেশে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আলোচনার সুযোগ খুব একটা দেখা যায় না। এখানে আনুগত্যের কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না, ছিল না কোনো স্ক্রিনিং। অংশগ্রহণকারীরা রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নয়, বরং দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে কথা বলেছেন।
এই নতুন কর্মপন্থা বিএনপির নির্বাচনি কৌশল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দলটি এখন বড় সভার চেয়ে ছোট পরিসরে নীতি-নির্ধারণী আলোচনার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ভোটারদের অভিযোগ ও মতামত শোনার জন্য নির্বাচনি হটলাইন এবং হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর চালুর পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, বিএনপি জনমতকে আর ভয় পাচ্ছে না বরং তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইছে।
তারেক রহমানের এই কার্যক্রমগুলো কেবল প্রতীকী কোনো অঙ্গভঙ্গি নয়। তিনি তার প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে তরুণদের রেখে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে চাইছেন। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সমর্থনের চেয়ে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি; যে ভাষা আজকের প্রজন্মের ভোটাররা সহজেই বুঝতে পারে, তাকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
বিএনপি এবং ব্যক্তিগতভাবে তারেক রহমানের জন্য আজকের এই বার্তাটি অত্যন্ত পরিষ্কার; ভবিষ্যৎ আর কেবল জনসভার জন্য অপেক্ষা করছে না। সেই ভবিষ্যৎ কথা বলছে এক মিনিটের রিলে, পার্কের বেঞ্চে বসে থাকা তরুণের কণ্ঠে; আর সেই কণ্ঠ এখন শোনার এবং বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে।
