কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট: ঢাকার ছোট্ট চীন, ভাষার সঙ্গে আছে ড্রাগন নাচ শেখার সুযোগ

ঢাকায় আসার পর নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল ইয়াং হুইয়ের। শব্দ ও বর্জ্য দূষণও ভোগাচ্ছিল তাকে। কারণ, তার শহর কুনমিং জনবহুল নয়, রাস্তা-ঘাট পরিচ্ছন্ন, অপ্রয়োজনে কেউ হর্ন বাজায় না। তাই মনে হচ্ছিল, বেশিদিন হয়তো ঢাকায় টিকতে পারবেন না।
তবে মানুষের সঙ্গে মিশে দেখলেন, তারা অতিথিপরায়ণ; সাহায্য লাগলে ছুটে আসেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ উদ্যমী, পরিবর্তনে বিশ্বাসী এবং চীনা ভাষায় আগ্রহী। এবার তার মনে হলো, কাজের জন্য এটি ভালো জায়গা।
২০২২ সালে কাজের সুবাদে ঢাকায় আসেন ইয়াং হুই। তিন বছর পর এখন ঢাকাকে তিনি নিজের শহর মনে করেন। এখানকার চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, চীনা পণ্যের বাজার আর কিছু চীনা মানুষের উপস্থিতি তাকে দেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। এসব কারণে ঢাকা আর তার কাছে ভিনদেশ নয়; বরং মনে হয়, এ শহরই তার নতুন ঠিকানা।
ঢাকায় প্রতিষ্ঠা ২০১৬ সালে
হুই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের পরিচালক। ২০১৬ সালে ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে ইনস্টিটিউটটি প্রতিষ্ঠা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। হুই নিজেও ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে তার ডক্টরেট, গবেষণার মূল বিষয় ছিল আফ্রিকান স্টাডিজ। গবেষণার প্রয়োজনে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা, ইথিওপিয়া, কেনিয়া ও নাইজেরিয়ায় বহুবার গিয়েছেন।
আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একটি মিল তিনি খুঁজে পেয়েছেন—দুই অঞ্চলই ইউরোপের উপনিবেশ ছিল। ফলে তাদের রাজনৈতিক ও শিক্ষা কাঠামোতে উপনিবেশিক প্রভাব রয়ে গেছে।
কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে কী কী যোগ্যতা প্রয়োজন—এ প্রশ্নে হুই বলেন, "বৈশ্বিক জ্ঞান, প্রশাসনিক দক্ষতা, ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, মানুষের সঙ্গে মেলামেশার যোগ্যতা দরকার। চীনের পররাষ্ট্র নীতির প্রতিও খেয়াল রাখতে হয়।"

চীনারা শিখতে পারেন বাংলা
ব্রিটিশ কাউন্সিল, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ বা গ্যেটে ইনস্টিটিউটের মতোই চীনের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট। ২০০৪ সালে সিউলে যাত্রা শুরুর পর ২০ বছরেরও বেশি সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রায় ৫০০ শাখা ও কিছু ক্লাসরুম মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ২০০।
বাংলাদেশে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়েও একটি ইনস্টিটিউট এবং শান্ত মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ক্লাসরুম আছে। চীনা ভাষা শিক্ষা এর প্রধান কাজ। ছয়টি পর্যায়ের নিয়মিত কোর্স ছাড়াও রয়েছে বিজনেস, কালচারাল ও এভরিডে কোর্সের মতো ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউটে পরিচালক বাদে ১২ জন চীনা শিক্ষক ও একজন বাংলাদেশি শিক্ষক আছেন। বাংলাদেশি শিক্ষকেরা চীনা ভাষা শেখানোর পাশাপাশি চীনের কোম্পানি ও উদ্যোক্তাদের বাংলা ভাষা শেখান।
শিক্ষার্থীরা চীনা সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। এখানে মার্শাল আর্ট, ক্যালিগ্রাফি, চা সংস্কৃতি, পেপার কাটিং, হানজি লিখন পদ্ধতি ও চিত্রাঙ্কনের কোর্স হয়। প্রতি বছর চীনা নববর্ষ, লণ্ঠন উৎসব ও ড্রাগন নৌকা উৎসবের আয়োজন করা হয়। এসব উৎসবে পাখা নৃত্য, ড্রাগন নৃত্য, সিংহ নৃত্য ও ঐতিহ্যবাহী নাটক মঞ্চস্থ হয়। শিক্ষার্থীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক 'হানফু' পরার সুযোগ পান।
ভর্তির নিয়ম ও ফি
শিক্ষার্থী বাছাই নিয়ে হুই বলেন, "এখানে কোনো বাছাই প্রক্রিয়া নেই, বয়সভেদেও কোনো বিভাজন নেই। যে কেউ নির্ধারিত ফি দিয়ে ভর্তি হতে পারেন। আমরা কেবল দক্ষতার ভিত্তিতে কে কোন স্তরে পড়লে ভালো হবে, তা পরামর্শ দিই।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কোর্স ফি সাড়ে ৩ হাজার টাকা। আর বাইরের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫ হাজার টাকা।
পুরো কোর্স কাঠামো সাজানো হয়েছে চারটি সেমিস্টারে—এইচএসকে-১ থেকে এইচএসকে-৪ পর্যন্ত। তবে সব কোর্স একসঙ্গে করা বাধ্যতামূলক নয়; শিক্ষার্থী চাইলে যেকোনো লেভেলে ভর্তি হতে পারেন। প্রতিটি কোর্সের মেয়াদ চার মাস, শেষে হয় ফাইনাল পরীক্ষা। উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী পান সার্টিফিকেট।

এইচএসকে-১ থেকে এইচএসকে-৪ পর্যন্ত সম্পন্ন করলে শিক্ষার্থী প্রায় চীনা নাগরিকদের মতোই সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন। বর্তমানে ৬০০ শিক্ষার্থী চীনা ভাষা শিখছেন। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৭ হাজার শিক্ষার্থী এই ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছেন বলে জানা গেল ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশি শিক্ষক নীলু আক্তারের লেখনী থেকে।
চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে
কেন এত মানুষ চীনা ভাষায় আগ্রহী—এ প্রশ্নে হুই বলেন, "চীনে উচ্চশিক্ষা নিতে অনেকেই ভাষাটি শিখছেন। এটি ভবিষ্যতের পৃথিবীর ভাষা। কারণ চীন পরাশক্তি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কও অনেককে ভাষাটি শিখতে উৎসাহিত করছে। পাশাপাশি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ পৃথিবীর ১৫০টি দেশ ও অর্থনৈতিক অঞ্চলকে যুক্ত করছে। ফলে অগণিত চাকরির সুযোগ তৈরি হবে।"
এ সময় হুই পরিচয় করিয়ে দিলেন ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী সাদিয়া খানের সঙ্গে। কিছুদিন আগে তিনি ইনস্টিটিউটের সুপারিশে বৃত্তি নিয়ে চীনের সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষা নিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের ছাত্রী।
উচ্চ মাধ্যমিকে বাণিজ্য বিভাগে পড়লেও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্য শাখায় সুযোগ পাননি সাদিয়া। সুযোগ মেলে চাইনিজ বা জাপানিজ ল্যাঙ্গুয়েজ বিভাগে পড়ার। পরে চাইনিজ ভাষা পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। চতুর্থ বর্ষে ওঠার আগেই তিনি ইনস্টিটিউটের চতুর্থ লেভেল শেষ করে ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন।

ভাষাটি ইন্টারেস্টিং!
ভাষাটি কতটা কঠিন বা মধুর—এমন প্রশ্নে সাদিয়া বলেন, "আসলে ভাষাটা খুবই ইন্টারেস্টিং। এর ক্যারেক্টারগুলো একেকটি চরিত্রের মতো, লেখায় হয়ে ওঠে চিত্রলিপি। পাঁচটি টোন আছে—যেন গান বা কবিতার তাল-ছন্দ। টোনগুলো কখনো ঢেউয়ের মতো, কখনো রৈখিক, কখনো ঊর্ধ্বমুখী। এগুলো আয়ত্তে এলে ভাষাটি আর কঠিন লাগে না। ভাষার দুটি রূপ—একটি ঐতিহ্যবাহী, অন্যটি সরলীকৃত। ঐতিহ্যবাহী রূপ সাধারণ ব্যবহারে নেই, শুধু গবেষণায় ব্যবহৃত হয়; সরলীকৃত রূপ সবাই ব্যবহার করে।"
চীন তার বেশ ভালো লেগেছে। শুরুতে খাবার নিয়ে ভীতি থাকলেও সেখানে গিয়ে তা কেটে যায়। তিনি বলেন, "খাবার প্রদেশভেদে ভিন্ন। কোথাও লবণ বেশি, কোথাও ঝাল। সিচুয়ান মরিচ সারা চীনে নামকরা, এই মরিচের খাবার আমার ভালো লেগেছে।"
চীনা মানুষের প্রসঙ্গে সাদিয়া বলেন, "তারা কৌতূহলী, বিশেষ করে বয়স্করা। বিদেশি দেখলে এগিয়ে এসে কথা বলে। চীনা ভাষা বলতে পারি শুনে অবাক হয়, বাবা-মা, ভাই-বোনের খবর নেয়। এটা অনেকটা আমাদের দেশের মানুষের মতোই।"
দোভাষী হওয়ার সুযোগ
সাদিয়ার অভিজ্ঞতা, দোভাষী হিসেবে কাজ করলে ভাষা চর্চার সুযোগ বাড়ে, পাশাপাশি আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়। তিনি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্মেলনে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানানোর কাজ করেছেন। পরে একাধিকবার বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি (আইসিসিবি)-তে দোভাষী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন।
কিছুদিন আগে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা সহায়তায় চীন থেকে বিশেষজ্ঞ দল এলে, তাদের দোভাষী হওয়ার প্রস্তাব পান সাদিয়া। কিন্তু পারিবারিক কাজে ব্যস্ত থাকায় প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে পারেননি। মানবিক কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ হারিয়ে কষ্ট পেয়েছেন তিনি।
সাদিয়ার শিক্ষক ঝাও জিয়াং ইয়ানও আলোচনায় অংশ নেন। ইউনান প্রদেশের বাসিন্দা ঝাও ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল 'চীনা ভাষা শেখানোর পদ্ধতি'। ২০২২ সালে তিনি বাংলাদেশে আসেন। এর আগে উগান্ডা এবং থাইল্যান্ডের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটে কাজ করেছেন।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঝাও উচ্ছ্বসিত। তার মতে, তারা মনোযোগ দিয়ে শেখে এবং প্রাণশক্তিতে ভরপুর। তিনি কক্সবাজার ও পুরান ঢাকা ঘুরে দেখেছেন। সুলতান'স ডাইনের বিরিয়ানি তার পছন্দের খাবার।
প্রশ্ন করা হয়েছিল—সুইজারল্যান্ড, আমেরিকা ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি দেশ বেছে নিতে হলে কোনটি বেছে নেবেন? ঝাও উত্তর দেন, "বাংলাদেশকেই বেছে নেব, কারণ এখানে পড়ানোর সুযোগ বেশি আর আমি পড়াতে ভালোবাসি।"
চীনা পণ্য, খাবার বা প্রসাধনী বাংলাদেশে সর্বত্র দেখা যায়—এ বিষয়ে ঝাও বলেন, "ভালো লাগে। আমরা চীনেও বাংলাদেশি পণ্য দেখি, যেমন আম, শাড়ি, হাতে তৈরি কুটিরশিল্প। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো, আশা করি ভবিষ্যতে আরও ভালো হবে।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের ছয় তলায় অল্প জায়গা নিয়ে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট। চীনা লণ্ঠনবাতি, ড্রাগন, সিংহ, বিড়ালের প্রতিকৃতি ও ক্যালিগ্রাফি দিয়ে সাজানো এই স্থান যেন মিনি চীন, যা চোখের জন্যও আরামদায়ক।
ছবি: আসমা সুলতানা প্রভা/দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড