গাড়ি কিনতে জমিয়েছিলেন অর্থ, টিভির এক প্রতিবেদনে সিদ্ধান্ত বদলে ৭৭ লাখ কৃষকের পাশে দাঁড়ান নানা পাটেকার
নানা পাটেকারের মৃত্যুতে প্রিয় অভিনেতাকে হারিয়েছেন ভক্তরা। তবে লাখো মানুষের কাছে এই হারানোর অর্থ আরও বড়—তারা হারিয়েছেন আশার এক আলো। নানা পাটেকার শুধু একজন অসাধারণ অভিনেতাই ছিলেন না, হাজারো কৃষক ও তাদের পরিবারের কাছেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন আশার উৎস। গত এক দশকে 'নাম ফাউন্ডেশন'-এর মাধ্যমে নানা ৭৭ লাখের বেশি কৃষক, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ৫১ হাজার পরিবারকে সহায়তা করেছেন এবং বিধবা কল্যাণ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ৫ হাজার বিধবাকে সহযোগিতা করেছেন।
২০১৫ সালের গ্রীষ্মে মহারাষ্ট্রের কৃষিপ্রধান অঞ্চল মারাঠওয়াড়ায় ভয়াবহ ফসলহানি ও কৃষকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটার পর থেকেই এর শুরু। ওই বছর মহারাষ্ট্রে ৩ হাজার ২২৮ জন কৃষক আত্মহত্যা করেন। এর মধ্যে শুধু মারাঠওয়াড়াতেই আত্মহত্যা করেন ১ হাজার ১৩০ জন।
সে সময় নানা একটি বিলাসবহুল গাড়ি কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু এক রাতে টেলিভিশনে তিনি এমন কিছু দেখেন, যা চিরদিনের জন্য তার জীবনের উদ্দেশ্য বদলে দেয়।
'আমি নতুন একটি গাড়ি কেনার উদ্দেশ্যে ১ কোটি ৫০ লাখ রুপি জমিয়েছিলাম। সন্ধ্যায় বসে পানীয় পান করছিলাম এবং টেলিভিশন দেখছিলাম। সেখানে আত্মহত্যা করা এক কৃষকের পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার দেখাচ্ছিল। মৃত ব্যক্তির জন্য শোকের চেয়েও বেশি যে বিষয়টি আমি অনুভব করেছিলাম, তা হলো তাদের ক্ষুধার কষ্ট। তাদের চোখেই বিষয়টি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল,' দ্য লালানটপকে বলেছিলেন অভিনেতা।
এই দৃশ্য ও ওই পরিবারের কষ্ট নানা পাটেকারকে নাড়া দেয়। সে সময় তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনেক বেশি সচ্ছল জীবনযাপন করছিলেন। হঠাৎ তার অভ্যস্ত বিলাসিতাগুলো অর্থহীন মনে হতে থাকে।
তিনি বলেন, 'সেটা আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল এবং ভাবতে বাধ্য করেছিল—আমার এই গাড়ির কী প্রয়োজন? আমি ১ হাজার কৃষককে ১৫ হাজার রুপি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। তবে আমার বন্ধু পরামর্শ দিলেন, চেক বিতরণের আগে স্বামী হারানো নারীদের সঙ্গে দেখা করতে। সেটাই আমার জীবন বদলে দেয়।'
এই অভিজ্ঞতার পর অভিনেতা মকরন্দ আনাসপুরের সঙ্গে মিলে 'নাম ফাউন্ডেশন' প্রতিষ্ঠা করেন নানা পাটেকার। শিগগিরই নানা বুঝতে পারেন, একজন কৃষককে ১৫ হাজার রুপির একটি করে চেক দেওয়া তাদের ও তাদের পরিবারের বড় সমস্যাগুলোর সমাধান করবে না।
কয়েকটি পরিবারকে সহায়তার প্রচেষ্টা শিগগিরই বড় একটি আন্দোলনে পরিণত হয়। দুই মাসের মধ্যেই ফাউন্ডেশনটি ৬০ কোটি রুপি সংগ্রহ করে।
নানা বলেন, 'আর এরা কোনো বড় শিল্পপতি নয়, বরং মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, যারা সাহায্য করেছেন।'
২০১৬ সালে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নানা বলেন, মানুষের সাড়া ছিল অভাবনীয়।
তিনি বলেন, 'আমরা নাম ফাউন্ডেশনের জন্য একটি অ্যাকাউন্ট খুলেছি এবং এক দিনেই প্রায় ৮০ লাখ রুপি সংগ্রহ হয়েছে। এটা সত্য নয় যে মানুষ ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করতে চায় না। আসলে তারা নিশ্চিত নয় যে তাদের টাকা সঠিক জায়গায় যাচ্ছে কি না। কিন্তু এখন তারা আমাদের ওপর আস্থা রাখে যে আমরা সৎভাবে কাজ করছি।'
নানা শুধু কৃষকদের সহায়তার জন্য অর্থ সংগ্রহই করেননি; তিনি তাদের কণ্ঠস্বর ও অধিকাররক্ষাকারী হিসেবেও সামনে এসেছেন। কৃষকদের আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বারবার কথা বলেছেন।
২০১৬ সালে এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নানা বলেন, 'আমি যখন কৃষকদের দেখি, তখন আমি শুধু তাদের দেখি না, আমি নিজেকে দেখি। আমি বুঝতে পারি কেন তারা এমন চরম পদক্ষেপ নেয়। আমি দেখতে পাই, তারা তাদের পরিবারের জন্য ওষুধ, সন্তানদের জন্য খাবার, গবাদিপশুর জন্য খড় কিনতে পারে না… আমি তাদের হতাশা, এ নিয়ে তাদের লজ্জা দেখতে পাই। আর একজন পুরুষের জন্য এটি একটি ভয়াবহ অনুভূতি। তার মনে হয়, তার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সে অসহায় বোধ করে, আর তখনই তার হাত ফাঁসির দড়ির দিকে চলে যায়।'
তিনি মানুষকে এই সংকট থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেওয়ার আহ্বান জানান এবং কৃষকদের কল্যাণে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন।
সঞ্জয় ঘোডাওয়াত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে নানা বলেন, 'যখন একজন মৃত্যুর বাস্তবতাকে মেনে নেয়, তখন জীবন সুন্দর হয়ে ওঠে। কৃষকের আত্মহত্যা বা অন্য কোনো সংকটের দিকে চোখ ফিরিয়ে নেবেন না। কঠিন সত্যের মুখোমুখি হন। তখনই আপনি প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে বাঁচতে শুরু করবেন।'
অভিনয় চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নানা ফাউন্ডেশনটির সঙ্গে যুক্ত থেকে এর কার্যক্রম চালিয়ে যান। চলতি বছরের মে মাসে নাগপুরে জলক্রান্তি পরিষদের এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, এই কাজ তার নিজের কাছে সুখের ধারণাটিই বদলে দিয়েছে।
তিনি বলেন, 'নাম ফাউন্ডেশন আমাকে যে সুখ দিয়েছে, তা সিনেমা থেকে পাওয়া সব পুরস্কার ও অর্থের চেয়েও বেশি।'
সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কারণেও 'নাম ফাউন্ডেশন' আলোচনায় আসে। ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণরেখার (লাইন অব কন্ট্রোল) কাছাকাছি প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী শিশুদের শিক্ষার সুযোগ উন্নত করার উদ্যোগেও সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে অংশ নেন নানা।
নানা পাটেকারের জন্য অভিনয় তাকে খ্যাতি, পুরস্কার ও পরিচিতি দিয়েছে। কিন্তু সিনেমার বাইরের তার কাজ তাকে দিয়েছে আরও মূল্যবান কিছু—জীবনের একটি উদ্দেশ্য। আর কোটি কোটি মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না। তার মৃত্যু তাই পর্দার পরিচিত একটি মুখ হারানোর চেয়েও বেশি কিছু। এটি এমন একজন মানুষকে হারানো, যিনি নিজের সুযোগ-সুবিধাকে অন্যদের জন্য আশার অবলম্বনে পরিণত করতে বেছে নিয়েছিলেন।
