হাউসফুল সিনেমা হল, দর্শকের মুখে শিস: বলিউডের জৌলুস ফেরালো যে স্পাই থ্রিলার সিক্যুয়েল
ভারতের জনাকীর্ণ সিনেমা হলগুলোতে যেন এবার এক বিশেষ ধরনের বিদ্যুৎ খেলে গেছে। নায়কের স্লো-মোশন এন্ট্রিতে শিস দেওয়া, বজ্রপাতের মতো মুহুর মুহু করতালি বা কোনো বড় টুইস্টের আগে দর্শকদের সম্মিলিত নীরবতা সবই ছিল এবারের হলগুলোতে।
কিছুদিন আগেও মনে হয়েছিল সিনেমা হলগুলোর এ বিদ্যুৎ ধীরে ধীরে ম্লান হতে শুরু করেছে। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর কারণে মানুষ হলে ভিড় করা কমিয়ে দিয়েছিল এবং বড় বাজেটের সিনেমাগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছিল। এমনকি বড় রিলিজগুলোও দর্শকদের মধ্যে তেমন আবেগ তৈরি করতে পারছিল না।
আর তারপর, ডিসেম্বরে এল 'ধুরন্ধর'।
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ, এই স্পাই থ্রিলারটি কেবল বক্স অফিসের শীর্ষে ওঠেনি—এটি যেন বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫৫ মিলিয়ন ডলার (১১৬.৩৪ মিলিয়ন পাউন্ড) আয় করে এটি হিন্দি সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম বড় হিটে পরিণত হয়েছে।
এই জোয়ার থিয়েটারগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ভারতের বৃহত্তম মাল্টিপ্লেক্স অপারেটর পিভিআর ইনক্স জানায়, ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে তাদের দর্শক সংখ্যা বছরে প্রায় ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মূল কারিগর ছিল 'ধুরন্ধর', যার রেকর্ড সাফল্য গত বছর চেইনটির সামগ্রিক বক্স অফিস সংগ্রহ ১৩ শতাংশ বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।
সেই মেজাজ আরও তীব্র হয়েছে এর সিক্যুয়েল 'ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ' মুক্তির মাধ্যমে, যা গত সপ্তাহে অভাবনীয় চাহিদার সাথে যাত্রা শুরু করেছে। পাঁচ ভাষায় মুক্তি পাওয়া সিনেমাটির অগ্রিম ১৫ লাখেরও বেশি টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে—যা খুব কম সিনেমার ক্ষেত্রেই দেখা যায়।
প্রায় চার ঘণ্টার এই সিক্যুয়েলটি প্রথমটির চেয়ে আরও বড়, আরও উচ্চশব্দ সম্পন্ন এবং আরও জাঁকজমকপূর্ণ। দর্শকরা থিয়েটারে ভিড় জমাচ্ছেন। ভারতজুড়ে সিনেমা হলগুলোতে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা ৩৬টি পর্যন্ত শো চালানো হচ্ছে, যা ভোর থেকে শুরু হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে।
চলচ্চিত্র বাণিজ্য বিশ্লেষক তরণ আদর্শ বলেন, 'এই সিক্যুয়েলটি ইতিহাস তৈরি করছে। এটি আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিচ্ছে এবং বক্স অফিসকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে। এটি একটি সত্যিকারের গেম চেঞ্জার।'
প্রথম 'ধুরন্ধর' ছিল ৩ ঘণ্টা ৩৪ মিনিটের একটি টানটান সিনেমা, যেখানে গোয়েন্দাগিরি, গ্যাং ওয়ার এবং দেশপ্রেমের এক সংমিশ্রণ ছিল। অভিনেতা রণবীর সিংয়ের দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা চরিত্রের করাচি মিশনের ওপর ভিত্তি করে পরিচালক আদিত্য ধর সিনেমাটি নির্মাণ করেন। ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা নিয়ে নির্মিত এই ছবিটি যেমন গতির জন্য প্রশংসা পেয়েছে, তেমনি এর রাজনীতি নিয়ে বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে।
'ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ' সেই ক্লিফহ্যাঙ্গার থেকেই শুরু হয়, যেখানে করাচির অপরাধ ও রাজনৈতিক জগতের ভেতরে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি গোয়েন্দা অভিযান আরও গভীরভাবে দেখানো হয়েছে।
প্রথম সিনেমার সাথে একসাথেই শুটিং করা এবং মাত্র তিন মাস পরে মুক্তি পাওয়া এই চার ঘণ্টার সিক্যুয়েলে রণবীর সিংয়ের সঙ্গে আরও যোগ দিয়েছেন আর মাধবন, অর্জুন রামপাল, সঞ্জয় দত্ত এবং সারা অর্জুন।
চমৎকার নির্মাণশৈলীর এই সিনেমাটি দ্রুতগতির অ্যাকশন, সহিংসতা এবং শক্তিশালী সংগীতের সমন্বয়। এর ব্যাপ্তি ও নির্মাণশৈলী প্রশংসা পেলেও এর রাজনৈতিক ও আদর্শিক দিক অনেক দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলেছে।
ছবিটি দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তব ঘটনাগুলোর থেকেও অনুপ্রাণিত—যেমন পাকিস্তানের 'অপারেশন লিয়ারি' এবং ভারতের নোটবন্দি—যা গল্পের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল উচ্ছ্বসিত।
হল থেকে বেরিয়ে দর্শকরা বলছেন, এটি 'পয়সা উসুল'—অর্থাৎ টাকার পুরো মূল্য পাওয়া গেছে। দীর্ঘ সময়ও তাদের বিরক্ত করছে না, বরং অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠেছে।
বিশিষ্ট অভিনেতারাও এই উন্মাদনায় ঘি ঢেলেছেন। আল্লু অর্জুন একে 'সোয়াগসহ দেশপ্রেম' বলে অভিহিত করেছেন, প্রীতি জিনতা একে 'মাইন্ড-ব্লোয়িং' বলেছেন এবং অনুপম খের একে বর্ণনা করেছেন 'অসাধারণ' হিসেবে—'এমন একটি সিনেমা যা আপনাকে আপনার দেশ নিয়ে গভীরভাবে গর্বিত বোধ করাবে।'
সমালোচকরা অবশ্য সিনেমাটির নির্মাণশৈলীকে স্বীকার করলেও এর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
একজন সমালোচক বলেন, সিনেমাটি 'শব্দ আর বিষাক্ত আবেগ'-এর ওপর বেশি নির্ভর করেছে, গল্পের গভীরতা কমিয়েছে। আরেকজন বলেন, এটি জটিল ভূরাজনীতিকে খুব সহজ করে 'সাদা-কালো দেশপ্রেমে' রূপ দিয়েছে।
আরেকজনের মতে, ছবিটি 'রাগে ভরপুর, কিন্তু সেই রাগ কীভাবে ব্যবহার করবে তা জানে না'। কেউ কেউ বলছেন, প্রথম ছবির তুলনায় এটি কম উপভোগ্য।
রেডিটেও মতামত বিভক্ত—কেউ প্রশংসা করছেন, কেউ সন্দিহান, কেউ আবার 'হাইপ' নিয়ে ক্লান্ত। অনেকে বলছেন, বেশি প্রত্যাশা না রাখাই ভালো।
একটি জনপ্রিয় পোস্টে বলা হয়েছে, 'শেষ হিসেবে ঠিক আছে, কিন্তু প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।' সেখানে 'দ্রুতগতির গল্প', অতিরিক্ত দীর্ঘ অ্যাকশন দৃশ্য এবং 'বেমানান' সংগীতের কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে একজন লিখেছেন, 'ভালো লেগেছে—বারবার দেখব না, তবে একবার দেখার মতো।' গল্প দুর্বল হলেও অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে।
সবচেয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে রাজনীতি নিয়ে।
বেশ কয়েকজন ব্যবহারকারী দাবি করেছেন যে সিক্যুয়েলটি প্রথমটির চেয়ে অনেক বেশি স্থূল এবং এর বার্তা সরাসরি 'প্রোপাগান্ডা'। ভারতের ২০১৬ সালের বিতর্কিত নোটবন্দীকরণের একটি দৃশ্য সমালোচনা কুড়িয়েছে। কিছু দর্শক একে সরকারের সেই নীতির সমর্থন হিসেবে দেখছেন—যাকে সিনেমায় জাল কারেন্সি রোধে একটি 'মাস্টারস্ট্রোক' হিসেবে দেখানো হয়েছে।
তবুও, সংশয়বাদীরাও এর বিশালত্বের কাছে হার মেনেছেন: রণবীর সিং ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছেন এবং শাশ্বত সচদেবের আবহসঙ্গীত প্রশংসিত হচ্ছে—এক সমালোচক তাঁর স্টাইলকে প্রথাগত বলিউড কম্পোজারের চেয়ে হিপ-হপ প্রডিউসারের সাথে তুলনা করেছেন।
সব মিলিয়ে, 'ধুরন্ধর' নিয়ে এই উন্মাদনা কেবল একটি ব্লকবাস্টারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বিনোদন, রাজনীতি এবং জনমতের মিলনের একটি সাংস্কৃতিক বিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
এই প্রভাব পৌঁছেছে অত্যন্ত অভিজাত মহলেও। জানুয়ারি মাসে টাইমস অফ ইন্ডিয়া পত্রিকায় সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাও সিনেমাটির প্রভাব সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন, 'ধুরন্ধর-এর সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় পাকিস্তান সম্পর্কে কী বলা হয়েছে তা নয়, বরং এটি ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিফলন সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দেয় তা। সমালোচকদের প্রতি বৈরিতা এবং ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা জাতীয় নিরাপত্তার নামে সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে।' তিনি আরও যোগ করেন, 'সিনেমা দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয় না, কিন্তু সমাজ যখন অন্ধকারে বসে যুদ্ধকে সমর্থন করতে শেখে তখন যুদ্ধ জায়েজ করা সহজ হয়ে যায়।'
তবুও সিনেমার ব্যাপ্তি সম্পাদকীয় পাতার বাইরেও অনেক অপ্রত্যাশিত জায়গায় পৌঁছেছে।
ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব লন্ডন হাইড পার্কে দৌড়ানোর সময় এই সিনেমার কথা উল্লেখ করে আলোচনায় আসেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে কথোপকথনে তিনি বলেন, ভারতে যাওয়ার আগে তার ছেলে তাকে সিনেমাটি দেখতে বলেছিল।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁও তার ভারত সফরের শেষে এই সিনেমার গান ব্যবহার করে একটি ভিডিও শেয়ার করেন।
তারণ আদর্শ বলেন, এই উন্মাদনা তাকে ১৯৭৫ সালের বিখ্যাত সিনেমা 'শোলে'-র কথা মনে করিয়ে দেয়।
'শোলে' একটানা পাঁচ বছর মুম্বাইয়ের একটি হলে চলেছিল এবং একটি সাংস্কৃতিক আইকনে পরিণত হয়েছিল।
তার মতে, 'ধুরন্ধর' সেই ঐতিহ্যকেই ফিরিয়ে এনেছে—বড় পর্দার সিনেমার যুগকে আবার জীবিত করেছে।
তিনি বলেন, 'মানুষ আবার সিনেমা হলে ফিরছে, টিকিট কিনছে, হাউসফুল বোর্ড ফিরছে। এটি বড় বাজেটের বলিউড সিনেমার পুনর্জন্ম। এটি ব্যবসার ধরন বদলে দিচ্ছে।'
