‘ভালো বাপ, ভালো স্বামী হতে পারিনি, ক্ষমা করিস’
বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে শনিবার মধ্যরাতে দাফন হয়েছে যশোর কারাগারে বন্দি থাকা ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রী গৃহবধূ কানিজ সুবর্ণা ও তার নয় মাস বয়সী শিশুসন্তানের।
কিন্তু এই দাফনের আগে শিশুটির পিতা জুয়েল হাসান সাদ্দামের সাথে তার শেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল যশোর কারাগারের গেইটে, যা নিয়ে তোলপাড় চলছে সারাদেশে। ক্ষোভ, অসন্তোষ আর অমানবিকতার অভিযোগে সয়লাব হয়েছে সামাজিক মাধ্যম।
'মৃত শিশু দেখা করতে গেছে, তার জীবিত পিতার সাথে'- কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের এমন একটি পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পর এই লাইনটি ব্যবহার করে পোস্টার ও ফটোকার্ড বানিয়ে শেয়ার করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বহু মানুষ।
তবে ব্যাপক ক্ষোভ, অসন্তোষের পাশাপাশি কেউ কেউ আবার সামাজিক মাধ্যমে বলেছেন 'আওয়ামী লীগ আমলেও এমন বা এর চেয়ে বেশি অমানবিক ঘটনা ঘটেছে'।
বিবিসি বাংলাকে সাদ্দামের ভাই মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, 'বাচ্চাকে জীবিত অবস্থায় কোলে নিতে পারেননি বলে কারাগারের গেইটেও আমার ভাই তাকে আর কোলে নেয়নি। শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছে-আমি ভালো বাপ হতে পারিনি, বাপ ক্ষমা করিস।'
তিনিসহ মোট নয়জন শনিবার যশোর কারাগারের গেইটে নিহত স্ত্রী ও সন্তানের সাথে সাদ্দামের শেষ সাক্ষাতে উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে পরিবারের সদস্যরা সাদ্দামের প্যারোলের আবেদন নিয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকের কাছে গেলেও সেখান থেকে আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ না করেই তাদের পাঠানো হয় কারা প্রশাসনের কাছে।
বাগেরহাট কারা প্রশাসন থেকেই লাশ নিয়ে তাদের যশোর কারাগারের গেইটে গেলে সাদ্দামের সাথে দেখা করানো যাবে-এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক আব্দুল বাতেন বলছেন, পরিবারের সদস্য তাদের কাছে যাওয়ার পর তারা বুঝিয়ে বলেছিলেন যে আবেদন করতে হবে যশোরে জেল সুপার কিংবা জেলা প্রশাসকের কাছে।
তিনি বলন, 'বাগেরহাটের জেল সুপার যশোর কারাগারের সাথে আলোচনাও করেছে। তারা সে অনুযায়ী সাক্ষাতের জন্য যশোরে গেছে। আমরা সহযোগিতা করেছি।'
অন্যদিকে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান জানান, তারা এ ধরনের কোনো আবেদনই পাননি।
যদিও মানবাধিকার সংগঠকরা বলছেন, পুরো ঘটনায় রাষ্ট্রের একটি 'অমানবিক চেহারার' বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বলে মনে করেন তারা।
তাদের মতে, আবেদনের প্রক্রিয়ার নামে কয়েক ঘণ্টা সময় নষ্ট করে পরিবারকে জেল গেইটে গিয়ে লাশ দেখানোর পরামর্শ দেওয়া এক ধরনের 'নিষ্ঠুরতা'।
বিস্তারিত যা জানা গেছে
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই আত্মগোপনে ছিলেন বাগেরহাট সদর উপজেলার সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম। পরে গত বছর এপ্রিলের শুরুতে গোপালগঞ্জ থেকে তাকে আটক করে পুলিশ।
এরপর থেকে বেশ কয়েকটি মামলায় কারাগারে আছেন তিনি। যদিও তার রাজনৈতিক সহকর্মীরা কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন যে, সাদ্দাম আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কলকাতা গিয়েছিলেন।
পরে তিনি দেশে ফিরে এসে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় গোপালগঞ্জ থেকে আটক হন এবং তিনি যখন আটক হন তখন তার স্ত্রী ছিল সন্তান সম্ভবা। তার স্ত্রী বাগেরহাটেই শাশুড়ি ও ননদের সাথে একই বাড়িতেই থাকতেন।
শহীদুল ইসলাম বলেন, 'বাচ্চাটা হওয়ার পর তিনি [সাদ্দামের স্ত্রী] পাঁচবার স্বামীকে আনতে গিয়েছিলেন কারাগারের গেইটে। প্রতিবারই বাচ্চাকে তার বাবার কোলে তুলে দেওয়ার আশা নিয়ে যেতেন। কিন্তু প্রতিবারই আবার তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে আবার জেলে নেয়া হয়েছে। এতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলেন।'
শুক্রবার উপজেলা সদরের সাবেকডাঙ্গা গ্রামের বাড়ি থেকে কানিজ সুবর্ণার মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় পাশেই ফ্লোরে ছিল তার ৯ মাস বয়সী শিশুর মরদেহ।
পরে বাগেরহাটের হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর জানাজায় জুয়েল হাসান সাদ্দামকে আনার জন্য প্যারোলের আবেদন দেওয়ার চেষ্টা করা হয় পরিবারের পক্ষ থেকে।
কানিজ সুবর্ণার ভাই শাহ নেওয়াজ আমিন শুভ জানান, পারিবারিকভাবে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাদ্দামের মামা জেলা প্রশাসন বরাবরে আবেদন করলেও তারা সেটি গ্রহণ করেনি।
পরিবারের সদস্যদের বর্ণনা অনুযায়ী, বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদনের পর তাদের পাঠানো হয় জেল সুপারের কাছে। এরপর তিনি পাঠান জেলারের কাছে।
পরিবারের এক সদস্য বলেন, 'জেল অফিস থেকেই বলা হয় লাশ নিয়ে যশোর যান, সেখানে ৫ মিনিট সময় পাবেন। এ নিয়ে কোনো হাউকাউ করবেন না।'
শহীদুল ইসলাম অবশ্য জানান, শনিবার বিকেলে তারা বাগেরহাট থেকে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে করে যশোরে নিয়ে যান এবং সেখান থেকে রাত আটটার দিকে রওনা দিয়ে আবার রাত এগারটায় বাগেরহাটে এসে জানাজার পর দাফন কার্যক্রম শেষ করেন।
'বাচ্চাকে কোলে নেয়নি তার বাবা'
যশোর কারা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বন্দিকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার এখতিয়ার জেলা প্রশাসকের। সেই অনুমতি না থাকায় লাশ নিয়ে কারাফটকে আসার পর মানবিক বিবেচনাতেই তারা জুয়েল হাসান সাদ্দামকে দেখার সুযোগ করে দেন।
দুটি মৃতদেহের সাথে পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য কারাফটকে পৌঁছানোর পর ৫ মিনিট সময় দিয়ে সাদ্দামকে সেখানে আনা হয়। তখন তার হাতে হাতকড়া ছিলো না।
সাদ্দামের ভাই শহীদুল ইসলাম বলেন, 'তিনি বাচ্চাটাকে আর কোলে নেননি। আমাদের বললেন জীবিত থাকতেই তো নিতে পারলাম না। এখন আর নিয়ে কী করবো। এরপর বাচ্চাটার মাথায় বুলিয়ে বললেন, "আমি ভালো বাপ হতে পারিনি, বাপ ক্ষমা করিস।" ভাবীকে বললেন, "ভালো স্বামী হতে পারি নাই, ক্ষমা করিস।" এরপর সেখান থেকে এক টুকরো মাটি তুলে আমাকে দিয়ে বলেন আমার বউ বাচ্চার কবরে দিয়ে দিস। আমরা তাই করেছি।'
এরপর সেখান থেকে আবার বাগেরহাটে আনার পর রাত সাড়ে এগারটা নাগাদ দুজনকে দাফন করা হয় বলে জানান তিনি।
