দেশে বছরে গড়ে ২৭ হাজার অগ্নিকাণ্ড ঘটে, পুড়ে যায় ৬০০ কোটি টাকার সম্পদ; সবচেয়ে বেশি আগুন ঢাকায়
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের গত তিন বছরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২৭ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় পুড়ে যায় ৬০০ কোটির টাকারও বেশি মূল্যের সম্পদ।
অগ্নিকাণ্ডের সবচেয়ে বড় ধাক্কা বহন করে রাজধানী ও আশপাশের এলাকা। একক বিভাগ হিসেবে সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটে ঢাকা বিভাগেই। আর মাসভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি আগুন লাগে মার্চে।
সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে। এ কারণে প্রতি বছর গড়ে ৯ হাজারের বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৫৬৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকার সম্পদ পুড়ে যায়। ২০২৪ সালে ২৬ হাজার ৬৫৯টি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি হয় ৪৪৬ কোটি ২৮ লাখ টাকার সম্পদের। আর ২০২৩ সালে ২৭ হাজার ৬২৪টি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের মূল্য ছিল ৭৯২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
দেশের উচ্চ অগ্নি-ঝুঁকি তুলে ধরে এ পরিসংখ্যান। তবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, জোরালো প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ টিবিএসকে বলেন, অগ্নিকাণ্ডের পর আগুন নেভানোর চেয়ে আগুন প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
'কারণ একটি অগ্নিকাণ্ডে শুধু সম্পদের ক্ষতি হয় না, মানুষের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে সামান্য সতর্কতা ও যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব,' বলেন তিনি।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক আরও বলেনন, সংস্থাটির সক্ষমতা যত বাড়বে, তত বেশি মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় কাজ করতে পারবে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান টিবিএসকে বলেন, অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, কারখানা, হাসপাতাল, বিপণিবিতান ও রাসায়নিক গুদাম পরিদর্শন, অগ্নিঝুঁকি নিরূপণ, প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ফায়ার সার্ভিস গত তিন বছরে ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের সম্পদ রক্ষা করেছে। সংস্থাটি ২০২৫ সালে প্রায় ৩ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা ও ২০২৩ সালে ১ হাজার ৮০৮ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা করেছে।
ঢাকায় সবচেয়ে বেশি আগুন
সবচেয়ে বেশি আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। ২০২৫ সালে ঢাকা বিভাগে ৭ হাজার ১৭৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে রংপুর বিভাগে। এরপর রয়েছে রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগ। সবচেয়ে কম অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে সিলেট বিভাগে।
ঘনবসতি ও অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর কারণে ঢাকায় আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের বাড়তি চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়।
গত ১২ অক্টোবর পুরান ঢাকার চকবাজারে একটি মার্কেটে আগুন লাগার পর তা পুরোপুরি নেভাতে প্রায় ৩৭ ঘণ্টা সময় লাগে। ঘটনাস্থলে রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি, সরু গলি, পানির অপর্যাপ্ততা ও বায়ু চলাচলের সীমাবদ্ধতার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও নির্বাপণের কাজে বেগ পেতে হয় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের।
এরপর ১৪ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে টঙ্গীতে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি ওষুধ কারখানায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিটের চেষ্টায় প্রায় চার ঘণ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন নেভানোর কাজে সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরাও যোগ দেন। তবে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ হয় রাত সাড়ে ১০টার দিকে।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার বলেন, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিকাণ্ড ঘটলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সরু রাস্তা, যানজট ও ভবনের অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এ কারণে ভবন নির্মাণের সময় থেকেই অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও জরুরি বহির্গমনপথ সচল রাখা জরুরি বলে জানান তিনি।
বৈদ্যুতিক গোলযোগে বেশি আগুন
২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আগুনের ঘটনা ঘটেছে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে। এ কারণে প্রতি বছর গড়ে ৯ হাজারের বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
২০২৫ সালে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে ৯ হাজার ৩৯২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যা ওই বছরের মোট ঘটনার ৩৪.৭১ শতাংশ। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৬৯টি বা মোট ঘটনার ৩৪ শতাংশ। ২০২৩ সালে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে ৯ হাজার ৮১৩টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে, যা ওই বছরের মোট ঘটনার ৩৫.৫২ শতাংশ।
ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান বলেন, অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কারণ বৈদ্যুতিক গোলযোগ ও নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহার।
তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ভবনের বৈদ্যুতিক তার, সার্কিট ও অন্যান্য সরঞ্জাম যথাযথ মান বজায় রেখে স্থাপন করা হয় না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। এসব বিষয়ে ভবনমালিক ও ব্যবহারকারীদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মার্চে সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ড
গত তিন বছরের সম্মিলিত হিসাবে সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে মার্চ মাসে। মাসভিত্তিক হিসাবে এর পরের অবস্থানেই রয়েছে এপ্রিল। ২০২৫ সালে মার্চে ৩ হাজার ৫২২টি, ২০২৪ সালের মারছে ৩ হাজার ৪২১টি ও ২০২৩ সালের মারছে ৩ হাজার ৩৩৪টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের স্টেশন অফিসার তালহা বিন জসিম বলেন, শুষ্ক মৌসুমে অসতর্কতা, বৈদ্যুতিক ত্রুটি ও আগুনের অন্যান্য উৎসের কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই মার্চসহ শুষ্ক মৌসুমে বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। আগুন প্রতিরোধে সচেতনতার পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর রাখাও জরুরি বলে জানান তিনি।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক পরিচালক মাহমুদুল হাসান বলেন, তদারকি ও আইন প্রয়োগের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো অসচেতনতা, বিধিবিধান প্রতিপালনে অনীহা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতা।
তিনি আরও জানান, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মোবাইল কোর্টসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালে ১৯২টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে ১৭৯টি প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা জরিমানা এবং উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মো. জিল্লুর রহমান টিবিএসকে বলেন, 'ভবন নির্মাণের সময় যদি অগ্নি-নিরাপত্তা নীতিমালা, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হতো, তবে ৯০-৯৫ শতাংশ ভবনের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা যেত।'
তিনি বলেন, ভবনের ভেতরে আগুন শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলে দ্রুত আগুন শনাক্ত করা যায়। অন্যান্য দেশে এসব ব্যবস্থা কঠোরভাবে মানা হলেও বাংলাদেশের মানুষ এসব নিয়ম মানতে অনাগ্রহী।
জিল্লুর রহমান আরও বলেন, 'ভবনের মাটির নিচের সংযোগ থেকে শুরু করে প্রতিটি অংশের বৈদ্যুতিক তার ও হিটিং সিস্টেমের ক্ষেত্রে বিশেষ যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে ভবন থেকে মানুষকে নিরাপদে সরানো কঠিন হয়ে পড়ে।'
