ডাক্তার-স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলায় বাড়ছে আস্থার সংকট, ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা
রোগীর মৃত্যু ও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় বাংলাদেশে চিকিৎসক-রোগীর পারস্পরিক আস্থা কমছে। একই সঙ্গে সহিংসতার আশঙ্কায় চিকিৎসকেরা, বিশেষ করে জনবলসংকটে থাকা জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের চিকিৎসা দিতে ক্রমেই অনীহা বোধ করছেন তারা। ফলে রোগীদের বড় হাসপাতালে পাঠানোর প্রবণতা বাড়ছে, যার কারণে গুরুতর রোগীদের জরুরি চিকিৎসা পেতে দেরি হচ্ছে।
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৬ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে চিকিৎসকদের ওপর হামলা, সহিংসতা ও হাসপাতালে ভাঙচুরের ৮০টির বেশি ঘটনা ঘটেছে।
১২ অক্টোবর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ রোগী মাহফুজ রহমানের মৃত্যুর পর তার স্বজনেরা চিকিৎসকদের কক্ষ, কাচের জানালা এবং হাসপাতালের একমাত্র ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম (ইসিজি) যন্ত্র ভাঙচুর করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসকদের আরও অভিযোগ, এ সময় রোগীর স্বজনেরা চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীদের গালিগালাজ করার পাশাপাশি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন।
একই রাতে বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে শিরায় ক্যানুলা প্রবেশ করাতে এক ওয়ার্ড বয়ের ব্যর্থতাকে কেন্দ্র করে এক নারী চিকিৎসক বিএনপির এক নেতা ও তার সহযোগীদের হাতে হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ওই রাতে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে একমাত্র দায়িত্বে থাকা সহকারী রেজিস্ট্রার চিকিৎসক সাকিয়া হক জানান, আবু হানিফ হানু রাত ১২টার দিকে পেটব্যথা নিয়ে হাসপাতালে আসেন। ইসিজিতে হৃদরোগের কোনো লক্ষণ না পাওয়ায় গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা সন্দেহ করে তাকে একটি ইনজেকশন দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। জরুরি বিভাগে কোনো নার্স না থাকায় এক ওয়ার্ড বয় তার শিরায় ক্যানুলা প্রবেশ করানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু দুইবারই ব্যর্থ হন। এরপর শিশু বিভাগ থেকে অভিজ্ঞ নার্সদের ডেকে আনতে যান হাসপাতালের কর্মীরা।
ফেসবুক লাইভে সাকিয়া বলেন, 'এদিকে আট থেকে ১০ জন আমার কক্ষে ঢুকে আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করেন। তাদের একমাত্র অভিযোগ ছিল, আমাদের ওয়ার্ড বয় ক্যানুলা প্রবেশ করাতে পারেননি।' তিনি আরও জানান, ওইদিন ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রায় ৪৫০ জন রোগী ভর্তি ছিলেন।
ড্যাবের মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বড় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও হামলার ঘটনা বাড়ছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং প্রস্তাবিত সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জরুরি ও সার্জারি বিভাগে সহিংসতার ঝুঁকি বেশি
২০২৪ সালের মার্চে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী বিএমজে ওপেনে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের একটি সরকারি তৃতীয় স্তরের হাসপাতালে জরিপে অংশ নেওয়া ৪৪১ জন চিকিৎসকের মধ্যে ৬৭.৩ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮৪.৫ শতাংশ মানসিক নির্যাতন, ১৩.৫ শতাংশ শারীরিক নির্যাতন এবং ২ শতাংশ যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। এসব ঘটনার ৬৬ শতাংশের জন্য দায়ী ছিলেন রোগীদের স্বজনেরা।
গবেষণায় দেখা গেছে, সার্জারি ও সংশ্লিষ্ট বিভাগে কর্মরত চিকিৎসকদের সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় ৫.৭ গুণ বেশি। পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করা চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি ২.৬ গুণ। ড্যাবের তথ্যেও দেখা যায়, জরুরি বিভাগে সহিংসতার ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটে।
কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের ওপর সহিংসতা নিয়ে গবেষণা করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. নাজিরুম মুবিন। তিনি জানিয়েছেন, চিকিৎসকদের ওপর সহিংসতার এই প্রবণতা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উদ্বেগজনক অবনতির চিত্র তুলে ধরছে।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'এর পরিণতি শুধু চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; রোগীরা যে চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন, তার ওপরও সরাসরি প্রভাব পড়ছে।'
তিনি বলেন, সহিংসতার ভয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে 'ডিফেন্সিভ মেডিসিন' বা আত্মরক্ষামূলক চিকিৎসাচর্চার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের চিকিৎসা দিতে তারা অনীহা বোধ করছেন। একই সঙ্গে প্রান্তিক এলাকার হাসপাতালগুলো থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের হাসপাতালে রোগী পাঠানোর প্রবণতা বাড়ছে। এতে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
নাজিরুম মুবিন জানিয়েছেন, চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে আস্থার সম্পর্ক কমে যাওয়ায় অপচিকিৎসা ও অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসাপদ্ধতির জনপ্রিয়তা বাড়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদে এর পরিণতি ভোগ করতে হবে সাধারণ রোগীদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার বাইরের একটি জেলা হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, অবহেলার অভিযোগ এড়াতে চিকিৎসকেরা এখন ক্রমেই রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
ওই চিকিৎসক ১০০ শয্যার একটি জেলা হাসপাতালের তীব্র জনবলসংকটের কথা তুলে ধরেন। সেখানে ৩০০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকলেও চিকিৎসকের ৬৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত ছিলেন মাত্র ৩০ জন। সিনিয়র কনসালট্যান্টের ১০টি পদই শূন্য ছিল।
ওই চিকিৎসক জানিয়েছেন, জনবল ও অবকাঠামোর ঘাটতি রোগীদের অসন্তোষ বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে হাসপাতালের কথিত অনিয়মের ভিডিও ধারণ করে প্রচারের সাম্প্রতিক প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করছে এবং চিকিৎসকদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলছে। কিছু বেসরকারি হাসপাতাল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করতে ইউটিউবারদের ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সহিংসতায় কমছে সহমর্মিতা, জরুরি রোগী সামলাতেও ভয়
ঢাকার একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, গত আগস্টে এক রোগীর মৃত্যুর পর সহিংসতার শিকার হওয়ার পর থেকে তিনি নিজে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি দ্বিধা বোধ করছেন।
আগে ওই চিকিৎসক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের নিজেই প্রাথমিক চিকিৎসা দিতেন। এখন প্রায়ই ইন্টার্ন ও প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকদের দিয়ে এসব কাজ করান। এমনকি কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) এবং লাম্বার পাংচারের মতো জরুরি চিকিৎসাপদ্ধতির কাজও কখনো কখনো অন্যদের ওপর ছেড়ে দেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই চিকিৎসক টিবিএসকে বলেন, 'আগে কোনো রোগীকে বাঁচাতে না পারলে আমার খারাপ লাগত, তার প্রতি সহমর্মিতা অনুভব করতাম। এখন সবার আগে নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হয়। রোগীদের প্রতি আমার সহমর্মিতা ধীরে ধীরে কমে আসছে।'
স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর চাপ কমাতে হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদার, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ও ভিড় ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার আহ্বান জানান ওই চিকিৎসক। একই সঙ্গে জনবল, রোগ নির্ণয়ের সুবিধা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, এমন একটি পরিস্থিতি তৈরির দায় নীতিনির্ধারকদেরও রয়েছে; যেখানে চিকিৎসক ও রোগীরা ক্রমেই পরস্পরের মুখোমুখি অবস্থানে চলে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, চিকিৎসক ছাড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা চলতে পারে না। বিপুলসংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসকদের ভুল হতে পারে। তবে কোনো অভিযোগ উঠলে জনরোষ তৈরি না করে যথাযথ জবাবদিহিতার মধ্য দিয়েই তা নিষ্পত্তি করা উচিত।
হাসপাতালে গিয়ে অভিযোগের ভিডিও ধারণ এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তা প্রচার করলে মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। এতে চিকিৎসকদের কাজের আগ্রহ ও রোগীদের প্রতি সহমর্মিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি বলেন, 'একজন চিকিৎসক যদি নিরাপদ না থাকেন, তাহলে তিনি কীভাবে আপনার স্বাস্থ্যের কথা ভাববেন?'
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি রোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত আইন নিয়ে কাজ চলছে বলে জানান মুহিত। এ আইন প্রণয়নের বিষয়ে আইনজীবী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি এবং রোগীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে।
অভিযোগ নিষ্পত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন
সেন্টার ফর ল অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্সের সম্পাদক আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম টিবিএসকে বলেন, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত ও নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
তিনি বলেন, বিভিন্ন কারণে চিকিৎসায় অবহেলার ঘটনা ঘটতে পারে; কিন্তু রোগী ও তাদের স্বজনেরা প্রায়ই সরাসরি চিকিৎসকদের দায়ী করেন। চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে আস্থার সম্পর্কের আরও অবনতি ঠেকাতে স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
মাহবুবুল বলেন, প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনে রোগীদের অধিকার, অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি এবং অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে একটি পৃথক অধ্যায় রাখা উচিত।
হাসপাতালে ভাঙচুর ও সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিকার চাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে রোগী ও তাদের স্বজনদের ক্ষোভ আরও বেড়ে যেতে পারে।
চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের প্রতিও আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হলে ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়ে রোগীদের আস্থা কমে যায়।
