বায়োমেট্রিক থেকে নজরদারি তালিকা যাচাই: সীমান্তে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থা চালুতে মার্কিন প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার উদ্যোগ
বাংলাদেশের অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা (বর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) আধুনিকায়নে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সিকিউরিপোর্টকে (Securiport) যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়োগের লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে।
গত ৪ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী সিকিউরিপোর্টের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনরিক সেগুরাকে চিঠি দিয়ে আগামী ২২ অক্টোবরের মধ্যে বিস্তারিত প্রস্তাব জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) জানান, গত ২ জুলাই সিকিউরিপোর্ট এলএলসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব দেয়। এতে বাংলাদেশের সব আন্তর্জাতিক প্রবেশ ও বহির্গমন পয়েন্টে সমন্বিত অভিবাসন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় উড়োজাহাজ ছাড়ার আগেই যাত্রীদের তথ্য পাবে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। এসব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের তথ্যভান্ডার ও দেশের অভ্যন্তরীণ নজরদারি তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা হবে। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
এরপর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রয়োজন অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে পারবেন। এতে সাধারণ যাত্রীদের অভিবাসনসংক্রান্ত যাচাই ও ছাড়পত্র পাওয়ার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিকল্পনাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী গত ৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় টেলিফোনে টিবিএসকে বলেন, অভিবাসন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে অ্যাডভান্স প্যাসেঞ্জার ইনফরমেশন সিস্টেম (এপিআইএস) যুক্ত করার উদ্যোগ আগের সরকার নিয়েছিল। পুরোনো সেই উদ্যোগ এখন এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, "তবে এটি কবে হবে বা আদৌ হবে কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।"
উন্মুক্ত দরপত্রের পরিবর্তে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, "যেহেতু বিষয়টি খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, সেহেতু এ বিষয়ে আমি এখনই কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না।"
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, সিকিউরিপোর্ট উন্নত সীমান্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরিতে বিশেষায়িত একটি প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের কয়েক ডজন দেশে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ, যাত্রীদের তথ্য যাচাই, তাৎক্ষণিক নিরাপত্তাঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং ই-ভিসাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সেবা দিয়ে থাকে।
সিকিউরিপোর্টের প্রস্তাবিত কাঠামোয় বিদ্যমান কার্যক্রমের সঙ্গে বেশ কিছু আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থা সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- অগ্রিম যাত্রী তথ্যব্যবস্থা (এপিআইএস) ও প্যাসেঞ্জার নেম রেকর্ড (পিএনআর)
- ইলেকট্রনিক ভিসা (ই-ভিসা) ও ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ই-টিএ)
- বায়োমেট্রিক পরিচয় যাচাই ও জাতীয় নজরদারি তালিকা
- ইন্টারপোলের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা
- উন্নত তথ্য যাচাই ও বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামো
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রাথমিক প্রস্তাবে দেশের ভেতরে তথ্য সংরক্ষণ, তথ্য ও ব্যবস্থার ওপর সরকারের পূর্ণ মালিকানা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন সহায়তা এবং প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ হস্তান্তরের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সিকিউরিপোর্টের প্রস্তাব জমা দেওয়ার পর সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়োগের অনুমোদন চেয়ে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে আবেদন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ সেপ্টেম্বর কমিটি এ প্রস্তাব অনুমোদন করে।
এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মঞ্জুর মোর্শেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় গত ৩০ সেপ্টেম্বর।
ওই সভায় মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা উদ্যোগটির প্রতি সমর্থন জানালেও প্রস্তাবের বিভিন্ন দিক কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করার ওপর গুরুত্ব দেন।
প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করবে কমিটি
স্টিয়ারিং কমিটির সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতার বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন দেশের স্বার্থেই প্রয়োজন।
তিনি জানান, ই-ভিসা, ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ই-টিএ) ও তথ্য বিশ্লেষণব্যবস্থা সমন্বিত একটি আধুনিক অভিবাসন ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে তার মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে।
সভায় অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার সিকিউরিপোর্টের কাছ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব আহ্বানের পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, প্রস্তাবটি আর্থিক বিধিবিধান, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত নিয়মকানুন এবং সরকার ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনায় যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন করতে হবে।
পরে স্টিয়ারিং কমিটি সিকিউরিপোর্টের কাছ থেকে বিস্তারিত প্রস্তাব চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রস্তাব যাচাই-বাছাইয়ে তিন কমিটি গঠন
আগামী ২২ অক্টোবর প্রস্তাব জমা দেওয়ার কথা রয়েছে সিকিউরিপোর্টের। ওই প্রস্তাব মূল্যায়নে ইতোমধ্যেই তিনটি বিশেষায়িত কমিটি গঠন করেছে স্টিয়ারিং কমিটি।
১. ডিউ ডিলিজেন্স ও কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি (৯ সদস্য): সিকিউরিপোর্টের আইনগত অবস্থান, আর্থিক সক্ষমতা, কারিগরি দক্ষতা ও অতীত কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা যাচাই করবে এ কমিটি।
২. ফি হার প্রস্তাব কমিটি (৭ সদস্য): আন্তর্জাতিক বিমান টিকিটের সঙ্গে আদায়ের জন্য প্রস্তাবিত অভিবাসন সেবা ফি অন্যান্য দেশের তুলনায় কতটা যৌক্তিক, তা যাচাই করবে এ কমিটি।
৩. আলোচনা ও খসড়া চুক্তি প্রণয়ন কমিটি (৯ সদস্য): এ কমিটি কাজের পরিধি, সেবার মানসংক্রান্ত চুক্তি (এসএলএ), কার্যসম্পাদন মূল্যায়নের প্রধান সূচক (কেপিআই), বাস্তবায়নের সময়সীমা, অর্থ পরিশোধের সময়সূচি এবং ঝুঁকি বণ্টনের বিষয়গুলো নির্ধারণ করবে। পাশাপাশি তথ্যের ওপর রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, সাইবার নিরাপত্তা, মেধাস্বত্ব, সফটওয়্যার লাইসেন্সের ধারাবাহিকতা, জবাবদিহি এবং চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়াসংক্রান্ত বিধানও খসড়া চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করবে এ কমিটি।
তথ্যের মালিকানা ও ব্যয়ের ওপর গুরুত্ব
সিকিউরিপোর্টকে পাঠানো চিঠিতে মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী উল্লেখ করেছেন, চূড়ান্ত প্রস্তাবে পরিচালনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা, আইন ও বিধিবিধান পরিপালন এবং ব্যয় কাঠামোর বিস্তারিত তথ্য থাকতে হবে। পাশাপাশি বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে সিকিউরিপোর্ট ও সরকারের দায়িত্বের সীমা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো চুক্তিতে তথ্যের ওপর সরকারের পূর্ণ মালিকানা, ব্যবস্থার নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দায়িত্ব হস্তান্তরের সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে সরকারি নথিতে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) 'ইমপ্লিমেন্টেশন অব ই-ভিসা, বাংলাদেশ' নামে একটি অননুমোদিত প্রকল্প রয়েছে। তবে প্রকল্পটির জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি।
২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। তবে এ প্রকল্পের সঙ্গে সিকিউরিপোর্টের উদ্যোগের সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
