যন্ত্রপাতি-জনবল সংকটে চালু হয়নি সিলেটের ৯০ কোটি টাকায় নির্মিত ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ চিকিৎসাকেন্দ্র
যন্ত্রপাতি ও লোকবল সংকটে চালু হচ্ছে না সিলেটে ১০০ শয্যার বিভাগীয় ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ চিকিৎসাকেন্দ্র। প্রায় ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের কাজ প্রায় দুই বছর আগে সম্পন্ন হলেও এই চিকিৎসাকেন্দ্রটি এখনও চালু করা যায়নি।
এতে সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন সিলেট অঞ্চলের রোগীরা। বিশেষত দরিদ্র ক্যান্সার, হৃদরোগ ও কিডনি রোগীদের সবচেয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালে এসব রোগের চিকিৎসা ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না তাদের। অথচ ওসমানী হাসপাতালে বর্তমান হৃদরোগ, কিডনি ও ক্যান্সার ইউনিটগুলোতে রোগীর চাপে একেবারে বেসামাল অবস্থা।
জানা যায়, 'আটটি বিভাগীয় শহরে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন' প্রকল্পের আওতায় ২০১৯ সালের অক্টোবরে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধীনে এই চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণেই ১৭ তলা ভিত্তির ওপর ১৫ তলা বিশিষ্ট ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের মূল বাজেট নির্ধারণ করা হয় ৮৯ কোটি ৫৬ লাখ ৯৮ হাজার ৪০৬ টাকা। ২০২১ সালের ১৮ আগস্ট চুক্তির পর ২৪ মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে ভবনের ভৌত কাঠামো ও ফিনিশিংয়ের কাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। ভবনটিতে দুটি বেজমেন্টসহ সিভিল, স্যানিটারি ও অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক কাজও সম্পন্ন হয়েছে। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জনবল অনুমোদন না হওয়া ও যন্ত্রপাতি আমদানি ঘিরে সংকটের কারণে এই চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র এখনও চালু করা যায়নি।
তবে গত ৪ সেপ্টেম্বর সিলেটে ওসমানী হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, আগামী ছয় মাসের মধ্যে সিলেটে বিশেষায়িত এই ক্যান্সার, হৃদরোগ ও কিডনি ইউনিট চালু হবে।
আর সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সিলেটে স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে বর্তমানে তিনটি প্রধান প্রকল্প নিয়ে পুরোদমে কাজ চলছে। ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের বাকি কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বিশেষায়িত এই চিকিৎসাকেন্দ্রে জটিল ক্যান্সার রোগীদের জন্য রেডিওথেরাপি, ব্র্যাকিথেরাপি, ডে-কেয়ার কেমোথেরাপি ওয়ার্ড এবং পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথক আধুনিক ওয়ার্ড থাকার কথা। পাশাপাশি সার্জিক্যাল ব্লক, নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, নেফ্রোলজি ইউনিট, সর্বাধুনিক ডায়ালাইসিস সেন্টার এবং ডে-কেয়ার কার্ডিয়াক সেন্টারের সুযোগ-সুবিধা পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অবকাঠামো দাঁড়িয়ে গেলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার সমন্বয়হীনতায় হাসপাতালটি আটকে আছে। জানা গেছে, হাসপাতাল পরিচালনার জন্য জনবল কাঠামো এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। ফলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ক্যান্সার চিকিৎসার প্রধান হাতিয়ার লিনিয়ার অ্যাকসিলারেটর ও ব্র্যাকিথেরাপি মেশিনসহ ডায়ালাইসিস সরঞ্জাম কেনার প্রক্রিয়া থমকে রয়েছে।
এ ব্যাপারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম জামাল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার মনসুর রহমান বলেন, নির্মাণ কাজ শেষে প্রায় দেড় বছর ধরে ভবনটি হস্তান্তরের জন্য অপেক্ষায় রয়েছি। এখন ভবনটি বুঝিয়ে দিতে পারলেই আমাদের কাজ শেষ।
প্রকল্প তদারকের দায়িত্বে সিলেট গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, ভবন নির্মাণ-সংক্রান্ত কাজ শেষ। আমাদের কেবল লিফট ও আনুষঙ্গিক কিছু কাজ বাকি রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক ডা. তৌফিক হাসান ফিরোজ জানান, ডলারের দর বৃদ্ধি ও সরঞ্জামের চাহিদায় পরিবর্তন আসায় যন্ত্রপাতি কেনায় কিছুটা দেরি হচ্ছে। মূল খরচের হিসাব যখন করা হয়েছিল, তখন ডলারের দাম ছিল প্রায় ১০৯ টাকা। কিন্তু পরে সরকারি রেট বেড়ে ১২৩ টাকা হওয়ায় কেনাকাটার খরচ বেড়ে গেছে। নতুন প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদিত হলেই যন্ত্রপাতি কেনার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
এ ব্যাপারে ওসমানী হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ) ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী নির্দেশের পর বিশেষায়িত এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ পুরো হাসপাতালের জনবল ও যন্ত্রপাতির চাহিদা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
