জীবন দেব, তবু চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ও সিসিটি বিদেশি অপারেটরদের দেব না: শ্রমিকদের হুঁশিয়ারি
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বন্দর শ্রমিক নেতারা। বন্দর সুরক্ষায় প্রয়োজনে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত আছেন বলে জানিয়েছেন তারা।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বন্দর কলোনি এলাকায় আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে চট্টগ্রাম বন্দর বিএনপি সমর্থিত শ্রমিক দলের নেতা নুরুল আজিম বলেন, 'জীবনের বিনিময়ে হলেও এনসিটি অন্য কারও হাতে হস্তান্তর করতে দেওয়া হবে না।'
দুবাইভিত্তিক 'ডিপি ওয়ার্ল্ড'-কে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত এবং সিসিটি ও জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) অন্য অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার পদক্ষেপের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ যৌথভাবে এই সমাবেশের আয়োজন করে।
বন্দর সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারকে বন্দর শ্রমিক ও অংশীদারদের সাথে আলোচনা করার আহ্বান জানান নুরুল আজিম।
তিনি জানান, শ্রমিকরা সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নন, বরং বন্দরের স্বার্থপরিপন্থী একটি ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বন্দর সংক্রান্ত যেকোনো পদক্ষেপ বাস্তবায়নের আগে সরকার যেন শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সাথে আলোচনায় বসে, সেই আহ্বান জানান তিনি।
আজিম বলেন, 'আমরা সরকারের বাইরে নই। কেবল সিদ্ধান্তটি ভুল মনে হওয়ায় আমরা এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি।'
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন লিজ ও কনসেশন প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করে শ্রমিক ও অন্যান্য অংশীদারদের সাথে আলোচনা শুরু করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, 'প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমাদের আস্থা রয়েছে। আমরা তাকে তথ্য সংগ্রহ করে খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি—বিশ্বের কোথাও এমন কোনো বন্দর আছে কি না, যা সম্পূর্ণ বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বা এভাবে বেসরকারীকরণ করে পরিচালনা করা হচ্ছে।'
খোকন বলেন, 'চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের সমুদ্রপথের ৯০ শতাংশের বেশি বাণিজ্য পরিচালনা করে এবং দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর হিসেবে এর কোনো বিকল্প নেই।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো অংশ বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করি না এবং হতেও দেব না।'
আত্মঘাতী পথ থেকে সরে এসে প্রস্তাবিত চুক্তিগুলোর বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আগে শ্রমিকদের সাথে আলোচনায় বসতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বলেন, 'সরকার কেন এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দিতে চায় তা ব্যাখ্যা করলে, আমরাও ব্যাখ্যা করব কেন টার্মিনালটি বাংলাদেশি ব্যবস্থাপনায় রাখা উচিত। আশা করি সরকার আমাদের যুক্তি বিবেচনা করবে।'
সরকার সাড়া না দিলে আন্দোলন আরও জোরদার করার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
খোকন জানান, আয়োজকরা আলোচনা শুরুর জন্য সরকারকে পাঁচ দিনের সময় দিচ্ছেন। কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী ৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হবে জানিয়ে বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীদের এই মিছিলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এছাড়া আগামী ৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম কাস্টমসের বিপরীতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারে 'বন্দর রক্ষা কমিটি' ঘোষিত অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিতে বন্দর শ্রমিক ও কর্মচারীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এছাড়া, রোববার (৪ অক্টোবর) চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সর্বদলীয় শ্রমিক-কর্মচারী প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত মানববন্ধনেও বন্দর শ্রমিকরা যোগ দেবেন বলে জানান তিনি।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অপর সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, 'বিষয়টি কেবল বন্দর শ্রমিকদের সমস্যা নয়, পুরো অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।'
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বাস্তবায়নের আগেই বন্দর শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানান।
হুমায়ুন বলেন, 'চট্টগ্রাম বন্দর সংক্রান্ত যেকোনো ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল শুধু শ্রমিক-কর্মচারীদেরই দিতে হবে না, বাংলাদেশের পুরো জনগণকেই এর পরিণতি ভোগ করতে হবে।'
সমাবেশে উপস্থিত অন্য বক্তারা আগামীদিনের কর্মসূচিগুলোতে বন্দর শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান এবং প্রস্তাবিত লিজ ও কনসেশন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, ১৫ বছরের কনসেশন চুক্তির অধীনে এনসিটি পরিচালনার জন্য একজন আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বন্দর শ্রমিক, কর্মচারী এবং স্থানীয় অংশীদারদের একটি অংশ বিরোধিতা শুরু করেছে, যারা টার্মিনালটি বাংলাদেশি ব্যবস্থাপনায় রাখার দাবি জানিয়ে আসছে।
