প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন: মাহ্দী আমিন
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, সরকারের নীতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় মাহ্দী আমিন বলেন, 'চার দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী সর্বমোট ৩০টি কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর বাইরে অনানুষ্ঠানিকভাবে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।'
তিনি বলেন, 'তিনি [প্রধানমন্ত্রী] বিশ্বের ১১টি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেন, ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন এবং বিশ্বমঞ্চে একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি প্রতিনিধিদলের সদস্যরাও পুরো সফরজুড়ে প্রায় ৫০টি পৃথক বৈঠকে অংশ নেন।'
জলবায়ু সুরক্ষায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল
মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী 'ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড জাস্ট ট্রানজিশন' এবং 'সি লেভেল রাইজ' সংক্রান্ত দুটি উচ্চপর্যায়ের ইভেন্টে নেতৃত্ব দেন।
তিনি বলেন, এসব অনুষ্ঠানে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, পদ্মা ব্যারেজ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং সোলার ও রিসাইকেলেবল এনার্জিতে অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
স্বাস্থ্যসেবায় এক লাখ কর্মী, ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনা
মাহ্দী আমিন বলেন, বাংলাদেশ যৌথভাবে আয়োজিত স্বাস্থ্যসেবা ও মিডওয়াইফারি সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
তিনি বলেন, সেখানে প্রতি বছর স্বাস্থ্যসেবাকর্মী বৃদ্ধি, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ; যার ৮০ শতাংশ নারী এবং দ্রুত ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের সরকারি নীতি তুলে ধরা হয়।
তিনি আরও বলেন, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং প্রত্যেকের কাছে ই-হেলথ কার্ড নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও জাতিসংঘে উপস্থাপন করা হয়।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পাঁচ দফা পরিকল্পনা
মাহ্দী আমিন বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রায় ২০টি দেশের শীর্ষ প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার নেতারা অংশ নেন। সেখানে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।
তিনি বলেন, মিয়ানমার থেকে উদ্ভূত এই সমস্যার সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে চাপ সৃষ্টি করতে হবে এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় অর্থনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে।
ভাষণে '৩ আর' নীতি ও 'সবার আগে বাংলাদেশ'
মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বমঞ্চের ভাষণটি ছিল একটি অনন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পর তাদের সন্তান হিসেবে একই রাষ্ট্রের পক্ষে তিনি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
তিনি বলেন, ভাষণে দীর্ঘ সময় পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতিনিধিত্ব তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, নারী, যুবক ও শিশুদের কল্যাণ এবং দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি পুনর্গঠনে '৩ আর'—রিকভারি, রিস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন—নীতির পূর্ণাঙ্গ দর্শন ব্যাখ্যা করেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, হেলথ কার্ড ও ইউনিভার্সাল কার্ডের রূপরেখা পেশ করার পাশাপাশি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই), রোবোটিক্স ও স্টার্টআপ তহবিলের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ফিলিস্তিনের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত
মাহ্দী আমিন বলেন, জলবায়ু সুরক্ষার দাবির পাশাপাশি শান্তিরক্ষা ও ফিলিস্তিনের প্রতি বাংলাদেশের অটল সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দিতে ওঠার সময় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল কক্ষ থেকে ওয়াকআউট করে।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হিসেবে 'সবার আগে বাংলাদেশ'—অর্থাৎ জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে রচিত রূপরেখা বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
চার দিনে ১১ দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক
চার দিনে বিশ্বের ১১টি দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এসব দেশের মধ্যে ছিল পাকিস্তান, ভুটান, মালদ্বীপ, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, ক্রোয়েশিয়া ও হাইতি।
এসব বৈঠকে সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়ন, মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ভাতৃত্ববোধ জোরদার, জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং হাইতির ক্ষেত্রে শান্তিরক্ষায় সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়।
আট কর্মসূচিতে ডা. জুবাইদা রহমান
প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও জাতিসংঘে আটটি কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং তিনটিতে বক্তব্য দেন। জাতিসংঘ উইমেন লিডার্স প্ল্যাটফর্মে অংশ নিয়ে তিনি বিশ্ব নারী নেতৃত্বের সামনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।
ওয়ার্ল্ড ফার্স্ট স্পাউসেস ডায়ালগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফার্স্ট লেডিদের উপস্থিতিতে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য দর্শনের কথা উপস্থাপন করেন ডা. জুবাইদা রহমান। মিডওয়াইফারি সাইড ইভেন্টেও বক্তব্য দেন তিনি।
