২৪৬ অবসায়ন মামলায় আটকে আছে ১৮ হাজার কোটি টাকা, কোনোটি ঝুলছে এক দশক ধরে
হাইকোর্টে বিচারাধীন বিভিন্ন কোম্পানির ২৪৬টি অবসায়ন মামলায় আটকে আছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকার পাওনা। আর পাওনা আদায়ের শেষ ভরসা হিসেবে, এসব কোম্পানি অবসায়নের দাবিতে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হচ্ছেন পাওনাদাররা।
নিষ্পত্তির তুলনায় নতুন মামলা দায়েরের হার বেশি হওয়ায় এই জট দিন দিন আরও বাড়ছে। আদালত সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত পাওনাদারেরা প্রায় ৪,৫০০ কোটি টাকার পাওনা আদায়ে ৭৪টি নতুন অবসায়ন মামলা দায়ের করেছেন। অন্যদিকে এ সময়ে মাত্র ৪০০ কোটি টাকা মূল্যমানের ১৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
এসব মামলায় বিনিয়োগকারী, গ্রাহক, সরবরাহকারী, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ নানা স্তরের পাওনাদার জড়িত রয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে বুকিংয়ের টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট বা প্লটের জন্য গ্রাহকদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আবার সংকটে থাকা কোম্পানিগুলোর পাওনাদারেরা বকেয়া টাকা উদ্ধার করতে চরম হিমশিম খাচ্ছেন।
পুরোনো মামলার পাহাড়
বিচারাধীন ২৪৬টি মামলার মধ্যে ৫৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল ২০২৫ সালে, যেগুলোর সাথে জড়িত পাওনার পরিমাণ প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে দায়ের করা ৩৭টি মামলায় পাওনা প্রায় ১,৮০০ কোটি টাকা এবং ২০২৩ সালে দায়ের করা ৪৯টি মামলায় পাওনা প্রায় ২,১০০ কোটি টাকা। বাকি মামলাগুলো ৫ থেকে ১০ বছর আগে দায়ের করা, যার সাথে জড়িত প্রায় ৭,১০০ কোটি টাকা।
তবে অবসায়ন সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির হার একেবারেই কম। হাইকোর্টে এবছর নিষ্পত্তি হয়েছে ১৩টি মামলা, যার সাথে জড়িত ছিল প্রায় ৪০০ কোটি টাকার পাওনা। ২০২৫ সালে নিষ্পত্তি হয়েছে ১৮টি, যার সাথে জড়িত প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা।
ডোম-ইনোর দীর্ঘসূত্রতায় দুর্ভোগের চিত্র
আদালতের মাধ্যমে পাওনা উদ্ধারে দীর্ঘসূত্রতার একটি বড় উদাহরণ আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডোম-ইনো ও এর ৪টি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের জন্য সম্প্রতি অস্থায়ী লিকুইডেটর (অবসায়ক) নিয়োগের বিষয়টি।
১৫ থেকে ২০ বছর অপেক্ষা করেও প্লট মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতাদের—ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দিয়ে তাদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে। এই প্রেক্ষাপটে, কোম্পানি অবসায়ন করে টাকা পেতে প্রতারিত প্রায় ২০০ গ্রাহকের আবেদনের শুনানি শেষে গত আগস্ট মাসে এই আদেশ দেন হাইকোর্টের কোম্পানি সংক্রান্ত একটি বেঞ্চ।
গ্রাহকদের আইনজীবী মোহাম্মদ জামিল খান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, ডোম-ইনো বিগত ১৫ থেকে ২০ বছরে প্রায় ৫৬টি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল, যেখানে হাজার হাজার গ্রাহক যুক্ত ছিলেন। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই পরবর্তীতে পরিত্যক্ত হয় এবং যেসব ভূমির মালিক ডোম-ইনোকে জমি দিয়েছিলেন– তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
আদেশে আদালত বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য প্লট ও ফ্ল্যাট মালিকরা চাইলে তাদের পাওনার দাবি নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবেন। আইনজীবীর মতে, বর্তমানে আরও প্রায় ৪০০ জন গ্রাহক ও জমির মালিক এই মামলায় পক্ষভুক্ত হওয়ার আবেদন করছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখিত এক ভুক্তভোগী জানান, এপর্যন্ত মামলায় বাদীদের পাওনা দাবি প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। ভুক্তভোগী সবাই বাদী হলে, এটি মোট হবে প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকার পাওনা।
হাইকোর্ট একজন চার্টার্ড একান্টটেন্ট ও সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবীকে লিকুইডেটর (অবসায়ক) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। আগামী মাসে হাইকোর্টের অবকাশ শেষ হলে ফলোআপ শুনানি হবে।
কোম্পানির সম্পদ থেকে পাওনা পরিশোধের বিধান
১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো কোম্পানির অবসান ঘটানো কেবল ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো কোম্পানির সম্পদ শনাক্ত ও প্রয়োজনভেদে তা বিক্রি করা, পাওনাদারদের দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা এবং আইনগত অগ্রাধিকার অনুযায়ী প্রাপ্ত অর্থ বন্টন করে– শেষ পর্যন্ত কোম্পানিটির বিলুপ্তি ঘটানো।
কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ ইমরান আহমেদ ভূঁইয়া টিবিএসকে জানান, কোনো কোম্পানি থেকে টাকা উদ্ধার করতে ব্যর্থ হলে পাওনাদার বা বিনিয়োগকারী হাইকোর্টের কোম্পানি বেঞ্চে সেটি অবসায়নের আবেদন করতে পারেন। একবার অবসায়নের আদেশ হলে– কোম্পানির সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, নথিপত্র ও দায়ের নিয়ন্ত্রণ চলে যায়—অফিসিয়াল লিকুইডেটর বা আদালত নিযুক্ত অবসায়কদের হাতে।
এরপর পাওনাদারদের দাবির সপক্ষে প্রমাণ জমা দিতে হয়। কোম্পানি আইনের ৩২৪ ধারা অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের বিদ্যমান, ভবিষ্যৎ বা নির্দিষ্ট দাবি আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। সর্বশেষ কোম্পানির হাতে যত টাকা পাওয়া যায়, আইন নির্ধারিত অগ্রাধিকারের ক্রমে তা বিতরণ করা হয়।
ই-কমার্স খাতের নিষ্পত্তিশূন্য মামলা
সমস্যাগ্রস্ত বেশ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন সংক্রান্ত আবেদনগুলোও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে।
ই-ভ্যালির ক্ষেত্রে ২০২১ সালে গ্রাহক ও মার্চেন্টরা প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যে ১১টি পৃথক অবসায়ন মামলা করেন, যা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
অন্যদিকে ই-অরেঞ্জ, কিউকম, ধামাকা শপিং এবং আলেশা মার্টের বিরুদ্ধে—গ্রাহক ও মার্চেন্টদের ৫৮ হাজার ৭২০টি অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগে দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩,৮৬৯ কোটি টাকা।
হাইকোর্টের আদেশে বিভিন্ন পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে থাকা প্রায় ৫৩১ কোটি টাকার মধ্যে ৪৭২ কোটি টাকা ইতোমধ্যে ফেরত দেওয়া হয়েছে গ্রাহকদের কাছে। তবে এসব কোম্পানি অবসায়ননের আবেদন এখনো চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।
আপসে নিষ্পত্তি হওয়া কিছু মামলা
অবসায়নের আবেদন করা হলেই যে সব কোম্পানি বন্ধ হয়ে যায়, তা নয়।
শ্রমিকদের প্রায় ৪৩৭ কোটি টাকার পাওনা সংক্রান্ত দাবির মুখে ২০২১ সালে গ্রামীণ টেলিকম অবসায়নের একটি আবেদন করা হয়েছিল, যা ২০২৩ সালে উভয় পক্ষের সমঝোতার পর খারিজ করে দেন আদালত। উভয় পক্ষের সমঝোতায় বিরোধ মিটিয়ে ফেলার কথা জানানোর পর ২০২৩ সালের ২৩ মে হাইকোর্ট মামলাটি খারিজ করেন।
অন্য একটি মামলায়, হোমল্যান্ড ফুটওয়্যার লিমিটেড-এর বিরুদ্ধে ৪৫.০৭ লাখ টাকার বকেয়া বিনিয়োগের কারণে, ২০০২ সালে হাইকোর্ট অবসায়নের আদেশ দিয়েছিলেন। পরে আপিল ও ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন চুক্তির পর—আদালত অবসায়ন প্রক্রিয়া স্থগিত করেন। শেষ পর্যন্ত আবেদনকারী আমির হোসেন কোম্পানির ৫১ শতাংশের বেশি শেয়ার কিনে পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ নেন।
অভ্যন্তরীণ বিরোধের উদাহরণ: নাসির ফ্লোট গ্লাস
নাসির গ্লাসের পাওনা প্রায় ১৯৭.১৩ কোটি টাকা পরিশোধ না করায়—২০২৪ সালের অক্টোবরে নাসির ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ-এর বিরুদ্ধে অবসায়নের আবেদন করা হয়।
বর্তমানে নাসির গ্লাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নাসির গ্রুপে'র প্রতিষ্ঠাতা মরহুম নাসির উদ্দিন বিশ্বাসের মেয়ে নাসিমা বিশ্বাস, আর তার ভাই নাসিম বিশ্বাস আছেন নাসির ফ্লোট গ্লাসের প্রধানের দায়িত্বে।
আবেদনকারীর পক্ষের সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম টিবিএসকে বলেন, নাসির ফ্লোট গ্লাস প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য নাসির গ্লাসের কাছ থেকে বেশকিছু টাকা নেওয়ায় এই দেনার সৃষ্টি হয়েছিল।এই পাওনার বিষয় দুটি কোম্পানির ব্যাংক লেনদেন ও অডিট রিপোর্টেও উল্লেখ আছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলাটি শুনানির জন্য গৃহীত হলেও এখনো উল্লেখ করার মতো কোনো অগ্রগতি হয়নি।
বিকল্প উপায়ের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
কোম্পানি ও কর্পোরেট আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, অবসায়নের আবেদন করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবসায়নের আদেশ হয়ে যায় না। আবেদন করার পর সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও পক্ষগুলোকে জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় এবং চূড়ান্ত আদেশের আগেই অনেক মামলা আপসে নিষ্পত্তি হয়ে যায়।
কোম্পানি অবসায়ন মামলা কমাতে শুধু হাইকোর্টে মামলার জট কমানো নয়, মামলা হওয়ার আগেই বিরোধ মেটানো এবং অচল কোম্পানিকে দ্রুত আইনি কাঠামো থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থাপনা জরুরি বলে মনে করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক।
তিনি অবসায়নের মামলা করার আগে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর), কার্যকর দেউলিয়াত্ত আইন প্রয়োগ, সম্ভাবনাময় কোম্পানির পুনর্গঠন সুযোগ এবং অকার্যকর কোম্পানিগুলোর জন্য যৌথ মূলধন কোম্পানী ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় তালিকাচ্যুতির (স্ট্রাইক-অফ) ব্যবস্থা চালুর তাগিদ দেন।
