‘গ্যারান্টি দিতে পারি, স্থানীয় নির্বাচনে পুলিশকে কোনো বেআইনি নির্দেশনা দেবে না ইসি’: প্রধান নির্বাচন কমিশনার
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনও সুষ্ঠু, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্যভাবে আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
তিনি বলেছেন, 'আমাদের অঙ্গীকারে কোনো ঘাটতি নেই। নির্বাচন কমিশন থেকে নির্বাচনের সময় পুলিশকে কোনো বেআইনি নির্দেশনা দেওয়া হবে না—আমি গ্যারান্টি দিতে পারি। তারাও (পুলিশ) ওয়াদা করেছেন যে, তারা একটি সুন্দর, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করার জন্য কাজ করবেন।'
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স অডিটোরিয়ামে 'নির্বাচনি দায়িত্ব পেশাদারিত্বের সঙ্গে সম্পাদনের লক্ষ্যে পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ' শীর্ষক আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
সিইসি বলেন, 'আমরা অতি শীঘ্রই স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে যাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে আমাদের মূলত পুলিশের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দায়িত্বে যারা নিয়োজিত হবেন, অথচ আগে নির্বাচনকেন্দ্রিক কার্যক্রমের বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেননি, তাদের যথাশীঘ্র প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার জন্য আমি আইজিপিকে অনুরোধ করেছিলাম। আইজিপি প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যেই এই কার্যক্রম শুরু করেছেন। আজ সেটার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিল।'
তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশনের অঙ্গীকার হচ্ছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা। জাতীয় নির্বাচন যেভাবে করা হয়েছে, একই মান বজায় রেখে স্থানীয় সরকার নির্বাচনও করতে চান তারা।
সিইসি বলেন, 'একটি বিশ্বাসযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যাতে আমরা করতে পারি, সে জন্য পুলিশের সহায়তা চেয়েছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরও নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করার বিষয়ে পূর্ণ অঙ্গীকার রয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'সুন্দরভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করা যেমন নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ও আইনি দায়িত্ব, তেমনি আমাদের সহায়তা করা এবং সুন্দর একটি নির্বাচন নিশ্চিত করাও পুলিশের আইনি দায়িত্ব।'
পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে আস্থা
জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা অনেকাংশে পুনরুদ্ধার হয়েছে দাবি করে সিইসি বলেন, 'আমরা জাতীয় নির্বাচনে ফলাফলের মাধ্যমে প্রমাণ করেছি যে, আমরা পারি। নির্বাচন কমিশনের ওপর যে মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, সেটি আমরা অনেকাংশে পুনরুদ্ধার করতে পেরেছি।'
তিনি বলেন, সিভিল সার্ভিস, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর মানুষের যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, সেটিও অনেকাংশে পুনরুদ্ধার হয়েছে। সরকারি সংস্থা, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনও একই মান ও গুণগত মান বজায় রেখে আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্টরা কাজ করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন সিইসি।
তবে পুলিশ বাহিনীর কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। সিইসি বলেন, পুলিশের গাড়ির সংকট রয়েছে। নির্বাচনের সময় তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। ২৪ জুলাই-আগস্টের সময়ে অনেক গাড়ি পুড়ে গেছে, যার সবগুলোর প্রতিস্থাপন এখনো হয়নি।
তিনি বলেন, 'এই প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ২২ কোটি টাকা খরচ হবে। তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ তহবিল থেকেই এই টাকা খরচ করতে হবে। তাদের জন্য এটি খুবই কষ্টকর। তারা কিছু তহবিল চেয়েছেন।'
পর্যায়ক্রমে বিজিবি ও আনসার সদস্যদেরও প্রশিক্ষণ শুরু হবে জানিয়ে সিইসি বলেন, 'সবাই মিলে আমরা একটি সুন্দর স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে পারব—সেই প্রত্যাশা করছি।'
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদী সিইসি
বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে পুলিশ সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, পরিস্থিতি নতুন নয়।
তিনি বলেন, 'আপনারা তো চব্বিশের আগস্টের পরের পরিস্থিতি দেখেছেন। জাতীয় নির্বাচনে যে অবস্থা ছিল, সেই অবস্থার চেয়ে এখনকার অবস্থা খারাপ না; বরং আরও উন্নতি করেছে। আমার পুলিশের ওপর আস্থা আছে। তারা যদি তাদের অঙ্গীকার পূরণ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকেন, তাহলে তারা পারবেন। আইজিপিও কথা দিয়েছেন যে, তিনি পারবেন।'
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অতীতে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যরাই এবারও দায়িত্ব পালন করবেন—এমন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব কি না জানতে চাইলে সিইসি বলেন, পুলিশের ওপর আইজিপির প্রচণ্ড আস্থা রয়েছে।
তিনি বলেন, 'আমার মনে হয়, তিনি সেটাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাবেন। আমরা যেহেতু নজরদারি করব, তেমন একটা অসুবিধা হবে না। অনেক সময় একই সম্পদ থাকলেও আপনি কীভাবে সম্পদকে ব্যবহার করেন, সেটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথভাবে যদি ব্যবহার করতে পারেন, একই সম্পদের মধ্যে অনেক ভালো ফলাফল আপনি পেতে পারেন।'
সিসি ক্যামেরায় তাৎক্ষণিক নজরদারি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতা কমাতে কী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে সিইসি বলেন, এখনই এ বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা জানানোর সময় হয়নি।
তিনি বলেন, 'আমরা সিসি ক্যামেরা, বডি-অন ক্যামেরা থেকে শুরু করে এগুলোর সব ব্যবস্থা করব। ডিজিটাল নজরদারি, অনলাইন নজরদারি এবং মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি—নির্বাচনের সময় তাৎক্ষণিক নজরদারি আমরা করব, যাতে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারি। সেই কাজ আমরা করছি। সেল কাজ করছে।'
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল কবে ঘোষণা করা হবে জানতে চাইলে সিইসি বলেন, 'শীঘ্রই দেখতে পাবেন। সবকিছু যখন সমাপ্ত হবে, তফসিল ঘোষণার যখন সময় হবে, তখন ঘোষণা হয়ে যাবে।'
দলীয় প্রতীক থাকবে না
সিইসি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো দলীয় প্রতীক থাকবে না।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'যেদিন মনোনয়নপত্র জমা দেবেন, সেদিন আইনে যারা যোগ্য হবেন, তারা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। যারা আইনে বাধার কারণে যোগ্য হবেন না, তারা পারবেন না। আইনে সব বলা আছে। যারা যোগ্য হবেন, তাদের মনোনয়ন বৈধ হবে।'
