সেন্ট লুসিয়ায় বেনজীরের অবস্থানের আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ সেন্ট লুসিয়ায় গেছেন কি না, সে বিষয়ে সরকারের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই বলে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, "এ বিষয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে তার অবস্থান নিশ্চিত করেনি। তাই শুধু গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তার অবস্থান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন হবে না।"
বেনজীর আহমেদের অবস্থান সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) বাইরে অন্য কোনো দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হলেও সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, চুক্তি বা পারস্পরিকতার নীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় তাকে গ্রেপ্তার, প্রত্যর্পণ বা অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
ইউএই থেকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া চলছে
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার কোনো বিলম্ব করেনি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। তাই দেশটির অভ্যন্তরীণ আইন এবং পারস্পরিকতার (রেসিপ্রসিটি) নীতির ভিত্তিতে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।"
তিনি জানান, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ রয়েছে। গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিবি ঢাকাকে বেনজীরের গ্রেপ্তারের তথ্য জানায়।
গ্রেপ্তারের চার দিনের মধ্যে, ১৬ জুন, কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানো হয়। একই দিনে অনুরোধের একটি অনুলিপি এনসিবি আবুধাবিতেও পাঠানো হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইউএইর আইনে গ্রেপ্তারের পর ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ করার বিধান রয়েছে। তবে সরকার ওই সময়সীমার জন্য অপেক্ষা করেনি।
প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি বলেন, "গত ৮ জুলাই ইউএইর বিচার মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত তথ্য ও নথি চায়। এর মধ্যে পারস্পরিকতার নিশ্চয়তা, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, মামলার আইনি সীমাবদ্ধতা-সংক্রান্ত তথ্য এবং সত্যায়িত গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ বিভিন্ন নথি ছিল। এসবের অতিরিক্ত সহায়ক নথি ৪ আগস্ট কূটনৈতিক চ্যানেলে পাঠানো হয়।"
এরপর ২২ আগস্ট ইউএইর কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ আরও কিছু নির্দিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা, মামলা পরিচালনার সময়সীমা এবং সাজা কার্যকরের মেয়াদ শেষ হওয়া-সংক্রান্ত আইনের পূর্ণাঙ্গ পাঠ চেয়েছে। এসব তথ্য দেওয়ার সময়সীমা ২২ সেপ্টেম্বর।
মন্ত্রী জানান, আইন ও বিচার বিভাগের মতামত ১ সেপ্টেম্বর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মতামত ২ সেপ্টেম্বর পাওয়া গেছে। এখন সমন্বিত জবাব প্রস্তুতের পাশাপাশি তা সত্যায়ন ও আরবি ভাষায় অনুবাদের কাজ চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এসব নথি ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় আইনজীবী নিয়োগ
বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় আইনি সহায়তার জন্য আইনজীবী নিয়োগের কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, গত ৩০ জুলাই আবুধাবিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে হ্যামদান আল কবির অ্যাডভোকেটস অ্যান্ড লিগ্যাল কনসালটেন্সিকে প্রত্যর্পণ ও সংশ্লিষ্ট আইনি সহায়তার জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বেনজীরকে ফেরানোর অগ্রগতি জানতে চায় সংসদ
এর আগে কার্যপ্রণালি-বিধির ১৪৭(১) বিধির অধীনে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সাধারণ প্রস্তাবের নোটিশ উত্থাপন করেন ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম।
নোটিশে তিনি বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ, অর্থপাচার ও দুর্নীতির একাধিক মামলায় অভিযুক্ত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ইন্টারপোলের রেড নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পরও জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এবং পরে তার সেন্ট লুসিয়ায় যাওয়ার খবর এসেছে।
তিনি এ ঘটনাকে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া পরিচালনায় সরকারের গুরুতর ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করে বিষয়টি সংসদে আলোচনার জন্য তোলেন।
নোটিশে প্রত্যর্পণ অনুরোধসহ সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, নথিপত্রে কোনো আইনি বা পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল কি না, ছয়টি দেশের পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগের তদন্তের অগ্রগতি এবং বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনা ও তার দেশে-বিদেশে থাকা অবৈধ সম্পদ জব্দে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে সংসদে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এদিকে ছয়টি দেশের পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বেনজীরের বিরুদ্ধে দুদকের পৃথক মামলা রয়েছে। এসব মামলায় ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও আসামি। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, বেনজিরের সেন্ট লুসিয়ায় যাওয়ার ব্যাপারে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বিদেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারে সহায়তা চেয়েছে সরকার
বিদেশে থাকা বেনজীর ও তার পরিবারের সম্পদের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএ) পাঠানো হয়েছে। তথ্য ও প্রমাণ পাওয়ার পর আইন, আদালতের আদেশ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাঠামো অনুযায়ী সম্পদ অবরুদ্ধ, জব্দ, বাজেয়াপ্ত বা দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেনজীরের জামিন প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, "জামিন পাওয়া মানেই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাওয়া নয়। প্রত্যর্পণ একটি আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়া এবং এর বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করতে সময় প্রয়োজন। তাই জামিনের ঘটনাকে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা বা ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।"
মীর আহমাদ বিন কাসেমের উত্থাপিত প্রস্তাবের ওপর সরকারি ও বিরোধী দলের মোট ১০ জন সংসদ সদস্য বক্তব্য দেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা আলোচনা শেষে প্রস্তাবটি ভোটে দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
আলোচনা শেষে স্পিকার বলেন, সংসদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে—বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা অতি শিগগিরই সংসদকে জানাতে হবে।
পরে প্রস্তাবটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।
