সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতির সঙ্গে বাকবিতণ্ডা: এজলাস ছাড়লেন প্রধান বিচারপতিসহ অন্য বিচারকরা
তথ্য গোপন করে মামলা পরিচালনার অভিযোগে এক আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করাকে কেন্দ্র করে শুনানিতে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের মধ্যে বাকবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে এজলাস ত্যাগ করেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এ ঘটনা ঘটে।
আদালতে উপস্থিত একাধিক আইনজীবী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, শুনানির এক পর্যায়ে ব্যারিস্টার খোকন প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে বলেন- 'আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর থেকে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।'
এই কথা বলা নিয়ে প্রধান বিচারপতি এবং বার সভাপতি তর্কে জড়িয়ে পড়েন। তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এজলাস ত্যাগ করেন প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিরা।
এ বিষয়ে ব্যারিস্টার খোকন সাংবাদিকদের বলেন, ''এক আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আমি প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে বিনয়ের সঙ্গে বললাম... আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আসলে মামলা শুনানি করা যাচ্ছে না আগের মতো। এ কারণে ল'ইয়ারদের ইনকাম কমে গেছে। একজন জুনিয়র ল'ইয়ারকে ৫ লাখ টাকা কস্ট [খরচা আরোপ] দেওয়াটা... অনেক বেশি হয়ে গেছে। উনাকে মাফ করেন।''
তিনি বলেন, ''তখন প্রধান বিচারপতি বললেন- আমি চিফ জাস্টিস হওয়ার পর থেকে ল'ইয়ারদের ইনকাম কমে গেছে? আমি ওনাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম যে আগে ১১ জন বিচারপতির একটা বেঞ্চ ছিল। এরকম তিনটা বেঞ্চ ছিল। তিনটা বেঞ্চে আমরা শুনতাম মামলা। এখন একটা বেঞ্চ এবং একটা মামলায় স্টে হলে... হয়তো ছিল কি ইনজংশন, শুনানি করার পরেই কিন্তু স্টে গ্রান্ট... জামিন বেরিয়ে যায় বা রিটে বলেন। সেখানে শুনানি করতে পারছে না। ইভেন চেম্বার জাজে স্টে করলে মামলা হেয়ারিং করতে এক বছর পার হয়ে যায়।''
তিনি আরও বলেন, ''আমার নিজের একটা মামলাতে বিচারক বিচার করেছিলেন, আমরা যদি দোষী প্রমাণিত হই তাহলে হাইয়েস্ট তিন মাস সাজা হতে পারে। আপিল ডিভিশন সেটা স্টে করে রাখছে আজকে এক বছর। চারবার আমি চেম্বার জাজকে রিকোয়েস্ট করলাম শুনানি করার জন্য, এই অর্ডারের এগেইন্সটে। শুনানি করতে পারিনি। শুধু আমার না, সব ল'ইয়ারদের একই অবস্থা।''
সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি বলেন, ''আপিল বিভাগে এখানে কোনো মেনশন করা যায় না। মামলাটা উপরে ছিল নিচে নেমে গেল কেন, মেনশন করা যায় না। যেহেতু একটা বেঞ্চ... মানুষ দীর্ঘদিন থেকে ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। মামলা শুনানি করতে পারছে না।''
তিনি বলেন, ''আমি খুব বিনয়ের সঙ্গে বললাম। আমি না, উনিই বললেন... আমি আসার পর তো ল'ইয়ারদের মামলা কমে গেছে, ল'ইয়ারদের ইনকাম কমে গেছে। আমি চিন্তাই করিনি যে প্রধান বিচারপতি এত রিয়্যাক্ট করবেন। রাগ, অভিমানের ঊর্ধ্বে ওনার বিচারকের পদ। আর ল'ইয়ারদের প্রতিনিধি হিসেবে অবশ্যই আমার অবলিগেশন আছে... ওনার কাছে ল'ইয়ারদের পক্ষে আবেদন করার।''
আপিল বিভাগে কী ঘটেছিল, কেন প্রধান বিচারপতি এজলাস ছাড়লেন এ প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ''বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বার প্রেসিডেন্ট মাহবুব উদ্দিন খোকন সাহেব আপিল বিভাগে এসে বললেন যে একজন আইনজীবীকে আপনারা ফাইন করেছেন। তখন চিফ জাস্টিস বলেন, 'দেখেন, আমরা সবকিছু দেখে-শুনে একটা আদেশ দিয়েছি, আমাদের আদেশ আমরা পরিবর্তন করব না।''
তিনি আরও বলেন, ''তখন অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, যিনি একজন জাতীয় সংসদ সদস্য, তিনি বলে ফেললেন যে- 'আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।' বিষয়টা মাননীয় প্রধান বিচারপতি একটু লাইটলি নিয়ে তারপর বললেন, 'আপনি কি এটা মিন করেন?''
ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ''মাহবুব উদ্দিন খোকন সাহেব তখনও অনেকটা সেই একই কথা বলার চেষ্টা করেছেন। তখন মাননীয় প্রধান বিচারপতি বলেছেন যে, আপনি যে কথাটা বলেছেন সেটা অ্যাবসোলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল। যেহেতু আপনি এত বড় একটা কথা বলেছেন, আমি আজকে আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করব না।' এ কথা বলে উনি উঠে গেছেন।"
প্রসঙ্গত, নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ সংক্রান্ত একই ঘটনায় একাধিক রিট মামলা করায় তথ্য গোপন এবং প্রতারণার অভিযোগে রিটকারী মো. নুর আলম এবং তার আইনজীবী সুফিয়া আহমেদকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট দশ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। আপিল বিভাগ এ জরিমানা করেন। ৩০ দিনের মধ্যে জরিমানার টাকা ঢাকা শিশু হাসপাতালে দিতে বলা হয়েছে।
নুর আলম পক্ষে আইনজীবী ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মাহাবুব উদ্দিন খোকন। অপরদিক, নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী অনীক আর হক, সিনিয়র আইনজীবী মো. শিশির মনির এবং আইনজীবী অমিত দাশ গুপ্ত।
