অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মুক্ত দরপত্র নীতির কারণে হাম-রুবেলার টিকার সংকট: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) বারবার দেওয়া সতর্কতা ও চিঠিপত্র উপেক্ষা করে হামের টিকার প্রতিষ্ঠিত সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়। একইসঙ্গে মুক্ত দরপত্র নীতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে দেশে টিকার সংকট তৈরি হয়েছিল বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিমুজ্জামান মোল্যার প্রশ্নের লিখিত জবাবে এসব তথ্য জানান মন্ত্রী। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
লিখিত জবাবে বলা হয়, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের (গ্যাভি) মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত হামের টিকা সরাসরি সংগ্রহ করে আসছিল।
তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি পরিবর্তন করে মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন পদ্ধতি চালুর পর টিকা ক্রয় প্রক্রিয়া ফাইল ও কাগজপত্রসংক্রান্ত প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়।
এর ফলে আন্তর্জাতিক গুদামে টিকা মজুত থাকা সত্ত্বেও ঢাকা থেকে সময়মতো চূড়ান্ত অনুমোদন ও অর্থ ছাড় করা সম্ভব হয়নি। এতে টিকার চালান দেশে পৌঁছাতে দীর্ঘ বিলম্ব হয়।
লিখিত জবাবে আরও বলা হয়, জরুরি জীবনরক্ষাকারী টিকার ক্ষেত্রে মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি উপযুক্ত নয় এবং এতে সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে বলে ইউনিসেফ বাংলাদেশ সতর্ক করেছিল। ইউনিসেফ বাংলাদেশের তৎকালীন প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্সের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে পাঁচ থেকে ছয়টি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়। পাশাপাশি প্রায় ১০টি বৈঠকে সম্ভাব্য বড় ধরনের সংকটের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।
কিন্তু তৎকালীন নীতিনির্ধারকেরা এসব সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেননি বলে লিখিত জবাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
টিকা সংকটের আরেকটি কারণ হিসেবে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে পর্যাপ্ত মনোযোগ না দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম ছয় মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আহতদের জরুরি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। ফলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির জরুরি প্রয়োজনের দিকে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পিছিয়ে যাওয়া একটি পরিপূরক হাম-রুবেলা (এমআর) বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন পরবর্তীতে ২০২৫ সালে সরকারের পক্ষ থেকে বাতিল করা হয়। এর ফলে নিয়মিত টিকাদানের আওতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।
লিখিত জবাব অনুযায়ী, টিকা সংগ্রহে বিলম্ব ও টিকাদানের আওতা কমে যাওয়ার পর দেশের শিশু এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাব মারাত্মক রূপ নেয়।
লিখিত জবাবে টিকা সংকটের পেছনে মূলত টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ায় নীতি পরিবর্তন, মুক্ত দরপত্রে যাওয়ার পর প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ইউনিসেফের সতর্কতা যথাযথভাবে বিবেচনায় না নেওয়া, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে পর্যাপ্ত মনোযোগের ঘাটতি এবং বিশেষ হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন বাতিলের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে, সংসদে দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, গত দুই অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য ৮৩,৩১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবা বজায় রাখতে মোট ৪১,৪০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। পরের অর্থবছর ২০২৫-২৬ সালে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৪১,৯০৮ কোটি টাকা করা হয়।
লিখিত জবাব অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দকৃত অর্থ মূলত পরিচালন ও উন্নয়ন—এই দুই খাতে ব্যয় করা হয়েছে।
পরিচালন খাতে চিকিৎসাকেন্দ্র ও হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, সরকারি হাসপাতালে রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ, চিকিৎসা অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রশাসনিক ব্যয়ে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
উন্নয়ন খাতে নতুন হাসপাতাল ভবন ও বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি সংগ্রহ এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে শিশুদের হাম, রুবেলাসহ বিভিন্ন রোগের টিকা সংগ্রহ ও দেশব্যাপী বিতরণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের জনবলকে দক্ষ করতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও উচ্চতর শিক্ষা কার্যক্রমেও উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
