বাংলাদেশের হোটেল ও পর্যটন খাতে নজর সিঙ্গাপুরের ‘অ্যাসকট’-এর
সিঙ্গাপুরভিত্তিক বৈশ্বিক হসপিটালিটি প্রতিষ্ঠান দ্য অ্যাসকট লিমিটেড বাংলাদেশের বাজারকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছে। দেশের স্থানীয় সম্পত্তির মালিকদের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক হোটেল ও সার্ভিসড রেসিডেন্স ব্র্যান্ড নিয়ে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরুর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।
অ্যাসকটের এক মুখপাত্র দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে ই-মেইলে বলেন, 'দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের সম্প্রসারণ কৌশলের অংশ হিসেবে আমরা বাংলাদেশের বাজারের দিকে ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখছি। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মতো গন্তব্যে ব্যবসায়িক ও পর্যটন—দুই ধরনের চাহিদার সমন্বয় থাকায় বাংলাদেশ অ্যাসকটের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বাজার।'
সিঙ্গাপুরে সরাসরি কথোপকথনের পর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে পাঠানো ই-মেইলে ওই মুখপাত্র এসব কথা বলেন।
তবে এ পর্যায়ে বাংলাদেশে কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়ার মতো নিশ্চিত পরিকল্পনা নেই প্রতিষ্ঠানটির। তারা বলেছে, 'এ মুহূর্তে নিশ্চিত কোনো পরিকল্পনা জানানোর মতো অবস্থায় না থাকলেও, একই ধরনের ভাবনা ও লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা স্থানীয় সম্পত্তির মালিকদের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে নিজেদের ব্র্যান্ড ও ধারণা বাংলাদেশে নিয়ে আসার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে তারা আগ্রহী।'
অ্যাসকট বলছে, এই বাজার তাদের ব্যবসায়িক মডেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটির ফ্লেক্স-হাইব্রিড মডেলে স্বল্পমেয়াদি ব্যবসায়িক ও অবকাশযাপন ভ্রমণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি থাকা এবং স্থানান্তরজনিত আবাসনের চাহিদাও পূরণ করা হয়।
প্রচলতি প্রপার্টি বা আবাসন খাতের বড় ধরনের পুঁজি বিনিয়োগের পরিবর্তে অ্যাসকট মূলত পরিচালনা এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি অংশীদারত্বের (অ্যাসেট-লাইট এক্সপানশন স্ট্র্যাটেজি) মাধ্যমে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করে থাকে। এর ফলে স্থানীয় প্রপার্টি মালিক ও বিনিয়োগকারীরা অ্যাসকটের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের অধীনে নিজেদের আবাসন গড়ে তুলতে বা রূপান্তর করতে পারেন এবং এর জন্য অ্যাসকটের বড় কোনো নিজস্ব পুঁজি বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় না। এই মডেলের আওতায় অ্যাসকট তার আন্তর্জাতিক আতিথেয়তা দক্ষতা, পরিচালন ব্যবস্থা এবং বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড নিয়ে আসে, যার ফলে স্থানীয় মালিকেরা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা ও ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের সুবিধা পেয়ে থাকেন।
সার্ভিস রেসিডেন্স, হোটেল, রিসোর্ট এবং সোশ্যাল-লিভিং প্রপার্টির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় গ্রাহকদের শূন্যতা পূরণ করতে সক্ষম। উচ্চ-মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে বিলাসবহুল ক্যাটাগরি পর্যন্ত অ্যাসকটের একটি বৈচিত্র্যময় ব্র্যান্ড পোর্টফোলিও রয়েছে। এর মধ্যে অ্যাসকট, সিটাডাইনস, লাইফ, ওকউড প্রিমিয়ার, ওকউড, সমারসেট, দ্য ক্রেস্ট কালেকশন, দ্য আনলিমিটেড কালেকশন, অ্যাডুর অ্যাপার্টমেন্ট, অ্যাডুর সুইটস, ফক্স, হ্যারিস, পপ!, প্রেফারেন্স, কোয়েস্ট, ভার্তু এবং ইয়েলো অন্যতম। দ্য অ্যাসকট লিমিটেড মূলত ক্যাপিট্যাল্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের একটি সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
বর্তমানে বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশের ২৩০টির বেশি শহরে এই কোম্পানির ১,০০০টিরও বেশি প্রপার্টি বা হোটেল রয়েছে, যা এশিয়া প্যাসিফিক, মধ্য এশিয়া, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিস্তৃত। দক্ষিণ এশিয়ায় মূলত ভারতেই অ্যাসকটের ২৭টি প্রপার্টি রয়েছে।
ঢাকার গুলশান এলাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলের মহাব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে বলেন, 'অ্যাসকটের মতো বৈস্ময়িক চেইনগুলোর ব্যবসায়িক মডেল বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বৈশ্বিক এই চেইনগুলোর সাথে অংশীদারত্ব করতে আগ্রহী।' বাংলাদেশ সরকারের প্রথম পর্যটন মহাপরিকল্পনায় ২০৪১ সালের মধ্যে ৫৫.৭ লাখ বিদেশী পর্যটককে আকর্ষণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ৬ লাখেরও বেশি বিদেশি পাসপোর্টধারী পর্যটক আসছেন।
সম্প্রতি এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের একটি দল সিঙ্গাপুরে অ্যাসকটের কয়েকটি সম্পত্তি পরিদর্শন করে। সেখানে হোটেল পরিচালনায় প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ কীভাবে যুক্ত করা হচ্ছে, তা তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটি।
অ্যাসকটের প্রধান আর্থিক ও টেকসই উন্নয়ন কর্মকর্তা সিউ কিম বেহ বলেন, বিভিন্ন সম্পত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে টেকসই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত কুলিং সিস্টেম অপ্টিমাইজেশান এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সহজ যাতায়াত নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে অতিথিদের পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রায় উৎসাহিত করার মতো বিষয়গুলো আমরা বাস্তবায়ন করছি।'
সিঙ্গাপুরের লাইফ ফুনান প্রপার্টিতে ছাদের খামারে উৎপাদিত উপাদান ব্যবহার করে 'ফার্ম-টু-টেবিল' চা পরিবেশনের মতো উদ্যোগও দেখানো হয় সাংবাদিকদের।
২০২২ সালে অ্যাসকট তাদের বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি অ্যাসকট কেয়ারস চালু করে। গ্লোবাল সাসটেইনেবল ট্যুরিজম কাউন্সিলের (জিএসটিসি) মানদণ্ড অনুসরণ করে তৈরি এই কাঠামোর মাধ্যমে পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা ২০৫০ সালের মধ্যে স্কোপ ১ ও স্কোপ ২ কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
