মক্কা জোটের অংশ হওয়া মানে এই নয়, সব সদস্য একসঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে: ফজলে এলাহী আকবর
মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে—এমন জল্পনা ক্রমেই বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ঐতিহাসিক এক পররাষ্ট্রনীতির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে ঢাকা।
ভৌগোলিকভাবে অন্যান্য মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং দীর্ঘদিন ধরে কঠোর জোটনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে আসা বাংলাদেশকে এখন সম্মিলিত প্রতিরক্ষার সম্ভাব্য সুবিধা ও একটি আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য করতে হবে।
জোটটির সমর্থকদের যুক্তি, এতে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সক্ষমতা তৈরি হবে এবং জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার হবে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, এর ফলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হতে পারে এবং দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের দূরবর্তী সংঘাতেও জড়িয়ে পড়তে পারে।
এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং বাংলাদেশের সামনে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে—তা নিয়ে টিবিএসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের মতামত-বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর।
'আমরা মূলত অমুসলিম বেষ্টিত এক মুসলিম দ্বীপ'
আমরা এখনো মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাইনি। তবে এমন একটি প্রস্তাব আমাদের কাছে আসতে পারে—এমন আলোচনা রয়েছে। যদি প্রস্তাবটি আসে এবং আমাদের কী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, তা নিয়ে ভাবতে হয়, তাহলে সবার আগে আমাদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান বুঝতে হবে।
বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকান এবং আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করুন। এই অঞ্চলে বাংলাদেশই একমাত্র মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যার সরাসরি সীমান্তে আর কোনো মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ নেই।
আমরা মূলত অমুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো দ্বারা ঘেরা একটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর 'দ্বীপ'। ফলে আমরা কোনো সংকটে পড়লে দেশের আয়তন, প্রস্থ ও ভৌগোলিক পরিসরের দিক থেকে আমাদের কৌশলগত গভীরতা খুবই সীমিত।
আর আমরা কারও কাছ থেকে সহায়তা পাব—এরও কোনো নিশ্চয়তা নেই। পূর্ব, পশ্চিম কিংবা উত্তর—যেদিক থেকেই হামলা আসুক না কেন, আমাদের এমন কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র নেই, যার সঙ্গে এমন কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে উঠেছে যে তারা আমাদের সহায়তায় এগিয়ে আসবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায়। গত ৫৫ বছরে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে আমরা এমন কোনো নির্ভরযোগ্য কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারিনি।
তাই এ ধরনের প্রস্তাব এলে আমার মনে হয়, এটি এমন একটি জোটের অংশ হওয়ার সুযোগ তৈরি করবে, যা আমাদের সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরক্ষা কাঠামোকে কৌশলগতভাবে আরও স্থিতিস্থাপক করতে সহায়তা করতে পারে। আমি মনে করি, এর পাশাপাশি আমরা অন্যান্য অর্থনৈতিক সুবিধাও পেতে পারি।
আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকান। জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি ওআইসিতে যোগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং ন্যাটোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কেন করেছিলেন? আপনি যখন একাধিক জোটের সদস্য হন, তখন জাতীয় স্বার্থে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে আপনার সুযোগ ও সমর্থনের পরিসর বাড়ে।
এ ধরনের একটি জোট কার্যকরভাবে কাজ করলে তা শুধু বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সহায়তা করবে না, বরং জাতীয় মর্যাদা এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও বাড়াতে পারে। এ কারণেই আমি মনে করি, প্রস্তাব এলে আমাদের তা গ্রহণ করা উচিত। আর প্রস্তাব না এলে আমাদের নিজেদের পক্ষ থেকেই সদস্য হওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার কথা বিবেচনা করা উচিত।
ন্যাটোর দিকে তাকান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ন্যাটো তাদের আর্টিকেল ৫ গ্রহণ করে। এতে বলা হয়েছে, জোটের কোনো একটি সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ ন্যাটোর সদস্যরা সম্মিলিতভাবে এর প্রতিক্রিয়া জানানোর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আমার জানামতে, ন্যাটো এখন পর্যন্ত মাত্র একবার আর্টিকেল ৫ প্রয়োগ করেছে—৯/১১-এর হামলা এবং টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর। এরই প্রেক্ষাপটে পরবর্তী সময়ে ন্যাটোর সদস্যরা আফগানিস্তানে বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেয়।
তবে ন্যাটো মূলত ওয়ারসো চুক্তি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের হুমকির জবাব দিতে গঠিত হয়েছিল। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য ছিল না। কিন্তু অনেক দেশ ইউক্রেনকে সমর্থন করায় তারা দেশটিকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিতে পেরেছে।
বাংলাদেশ কখনো এমন পরিস্থিতিতে পড়লে আমাদের সহায়তা করবে কে? আমাদের আশপাশে এমন কেউ নেই, যারা তা করতে বাধ্য—বা এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ন্যাটো বা অন্য কোনো জোটের অংশ হওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব সদস্য একসঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে—এমন নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে অনেক ছোটখাটো যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাত হয়েছে। কিন্তু ন্যাটো নিজেই অন্য কোনো বড় শক্তির, যেমন রাশিয়ার বিরুদ্ধে, কতবার সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে?
তাই জোটে যোগ দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ব—এমন যুক্তি ঝুঁকিকে অতিরঞ্জিত করে দেখানোর শামিল। কিছু ক্ষেত্রে আমার মনে হয়, এসব যুক্তি আমাদের মনোবল দুর্বল করা এবং জোটে যোগদানে নিরুৎসাহিত করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের চেয়ারম্যান।
