চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ ফেরি রুটের মূল ভূখণ্ডের জেটি সংস্কারে ১৩৬ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সন্দ্বীপ ফেরি রুটের মূল ভূখণ্ডের প্রধান টার্মিনাল বাঁশবাড়িয়া জেটি শক্তিশালীকরণ ও সংস্কারে ১৩৬ কোটি টাকার একটি নতুন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। জোয়ারের ক্ষয়ক্ষতিতে দ্বীপবাসীর নিরাপদ যাতায়াত ব্যাহত হওয়ার ১৭ মাস পর এ প্রকল্প অনুমোদন পেল।
বুধবার (১৯ আগস্ট) পরিকল্পনা কমিশন চত্বরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) চট্টগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ২৪ মার্চ উদ্বোধনের মাত্র এক মাসের মধ্যেই প্রবল জোয়ারে জেটিটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নতুন অনুমোদিত প্রকল্পের লক্ষ্য হলো অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করে সন্দ্বীপ রুটে নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ ফেরি চলাচল নিশ্চিত করা।
তবে একনেকে 'চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট এবং বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট হতে কুমিরা ঘাট পর্যন্ত উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালীকরণ' শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবিত সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার সুপারস্ট্রাকচারসহ আরও কয়েকটি কাজ অনুমোদন পায়নি। ফলে আগে আলোচনায় থাকা ৫৫৮ কোটি টাকার বড় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়নি। কেবল জেটির অতিজরুরি অংশগুলোর আধুনিকায়ন ও সংস্কারকাজই ১৩৬ কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে।
প্রকৌশলীরা জানান, বাঁশবাড়িয়া জেটি শক্তিশালী করা হলে সন্দ্বীপের সঙ্গে দ্বীপবাসীর ফেরি যোগাযোগ স্থায়ীভাবে নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ হবে। অনুমোদিত প্রকল্পের মাধ্যমে বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত হাই-ওয়াটার জেটির পাশাপাশি শীতকালে যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত লো-ওয়াটার জেটিরও প্রয়োজনীয় টেকসই সংস্কার করা হবে।
বর্তমানে জেটিতে ফেরিতে যানবাহন ওঠানামার সময় র্যাম্প ও লেভেলসংক্রান্ত যেসব জটিলতা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর সেসব সমস্যারও স্থায়ী সমাধান হবে বলে জানান তারা।
জেটির আগের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বিভাগ-২-এর নির্বাহী পরিচালক ড. তানজীর সাইফ আহমেদ টিবিএসকে বলেন, "সন্দ্বীপের মানুষের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের দ্রুত যোগাযোগ স্থাপনের জরুরি প্রয়োজন থেকে ২০২৫ সালের ২৪ মার্চ অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে জেটিটি উদ্বোধন করা হয়েছিল। কিন্তু উদ্বোধনের পরের মাসেই সমুদ্রের প্রবল জোয়ারের চাপে জেটিটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।"
তিনি বলেন, "আগেরবার প্রয়োজনীয় ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাই এবং বিস্তারিত প্রকৌশল নকশা তৈরির প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনুসরণ করা সম্ভব না হওয়ায় মূলত এই দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল। মূল লক্ষ্য ছিল দ্রুত যোগাযোগ চালু রাখা। ফলে কারিগরি দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার বিষয়টি তখন উপেক্ষিত থেকে যায়।"
তিনি আরও জানান, "প্রকৌশলীরা এবার দায়িত্ব পাওয়ার পর সব ধরনের নিয়ম, স্ট্যান্ডার্ড ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং প্রয়োজনীয় প্রকৌশলগত প্রক্রিয়া সঠিকভাবে অনুসরণ করে জেটিটির নতুন নকশা তৈরি করেছেন। নতুন নকশা অনুযায়ী সংস্কার ও শক্তিশালীকরণের কাজ সম্পন্ন হলে ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জোয়ার বা ঢেউয়ের চাপে জেটিটি যাতে পুনরায় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা হবে।"
সন্দ্বীপের প্রায় চার লাখ অধিবাসীকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে ২০২৫ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় বাঁশবাড়িয়া-সন্দ্বীপ ফেরি সার্ভিস। দীর্ঘদিন ধরে নৌদুর্ঘটনায় বহু প্রাণহানির পর এটি ছিল দ্বীপবাসীর স্বপ্নের একটি সমাধান।
তবে চালুর মাত্র এক বছরের মাথায় সমুদ্রের তীব্র জোয়ার, পরিবেশগত ছাড়পত্রের অভাব, অনিয়মিত ড্রেজিং এবং চ্যানেলে দ্রুত পলি জমার কারণে প্রকল্পটি নানা পরিচালনাগত সংকটে পড়ে। এতে প্রায় ১২০ কোটি টাকার প্রাথমিক সার্বিক বিনিয়োগ ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
নতুন অনুমোদিত ১৩৬ কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ফেরিঘাটের অবকাঠামোগত মূল ত্রুটি কাটবে। একই সঙ্গে সমুদ্র উপযোগী ফেরি যুক্ত করা সম্ভব হলে দ্বীপবাসীর নিরাপদ যাতায়াতের সংকট চিরতরে মিটবে বলে প্রত্যাশা করছেন কর্মকর্তা ও স্থানীয়রা।
