দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল শেখ হাসিনার সরকার: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে শুধু দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কারণেই আগের সরকার প্রত্যাবাসন উদ্যোগকে ব্যর্থ করে দিয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনার সরকার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেই এটার বারোটা প্রথমেই বাজিয়ে দিয়েছিল। যখন বিএনপি সরকার রোহিঙ্গা রিপ্যাট্রিয়েশন (প্রত্যাবাসন) করেছিল, তখন প্রথমেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় তিনি একটি ট্রাইপার্টাইট এগ্রিমেন্ট (ত্রিপক্ষীয় চুক্তি) করেছিলেন। জাতিসংঘ সেই চুক্তির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিল। সে কারণে ওআইসিভুক্ত প্রতিটি দেশসহ প্রত্যেক অংশীদার এটায় যুক্ত হয়েছিল। বিগত সরকার সেটি করতে ব্যর্থ হয়েছিল।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
রোহিঙ্গা সংকটের জটিলতা দিন দিন বাড়ছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, '২০১৭ সালে সংকট শুরু হওয়ার পর প্রথম তিন-চার বছরের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব হলে পরিস্থিতি এত জটিল হতো না। এখন মিয়ানমারের পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ায় সংকটও ঘনীভূত হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'শুধু শব্দের খেলায় বা ডিপ্লোম্যাটিক ভাষায় বললে তো হবে না, বস্তুত তো আমাদের এটা অ্যাকশনে পরিণত করতে হবে।'
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ও পরিচয় নিয়ে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাংলাদেশ একমত নয় জানিয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, 'এ বিষয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এটিকে রাষ্ট্রদূতকে 'তলব' বলা ঠিক হবে না।'
তিনি বলেন, 'মিয়ানমারের দিক থেকে যে স্টেটমেন্টটা করা হয়েছে, সেখানে সংখ্যার কিছু বিভ্রাট আছে, যেটার সঙ্গে বাংলাদেশের সরকার বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একমত না।'
আলোচনায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছেন জানিয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, 'তিনি মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে কথা বলবেন এবং চলমান যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া দ্রুত করার উদ্যোগ নেবেন বলে জানিয়েছেন। 'সেই ভেরিফিকেশন প্রসেসটা তারা শুরু করেছে, কিন্তু ধীরগতিতে।'
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'মানবিকতা ও মানবাধিকারের কথা বিবেচনা করেই বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে। তারা যেন সুস্থভাবে, স্বাভাবিকভাবে এবং নিরাপদ পরিবেশে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে, সেটিই বাংলাদেশের প্রত্যাশা।' 'তাদের একটা নিজেদের আইডেন্টিটি আছে, সেই আইডেন্টিটি নিয়েই তারা ফেরত যাবে,' বলেন তিনি।
মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনায় আন্তর্জাতিক চাপের বিষয়টিও উঠে আসছে জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'শুধু মিয়ানমার সরকারের ওপর নয়, আরাকান আর্মির ওপরও চাপ প্রয়োগ প্রয়োজন।' চীনের পক্ষ থেকেও মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগের আশ্বাস পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
তার কথায়, 'একটা আন্তর্জাতিক চাপ যে প্রয়োগ করতে হবে মিয়ানমার সরকারের ওপরে, আরাকান আর্মির ওপরে, সেটা কিন্তু পরিষ্কারভাবে আমরা সবসময় বলছি এবং আলোচনার ক্ষেত্রেও সেটা উঠে আসছে।'
আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে বাংলাদেশ কাজ করছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেশন হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আদালতের রায়সহ বিভিন্ন বিষয়কে কাজে লাগিয়ে মিয়ানমারের ওপর যতটা সম্ভব আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে।'
তিনি বলেন, 'আমাদের এখানে ভূ-রাজনীতির একটা ব্যাপার আছে, আমাদের আঞ্চলিক রাজনীতির ব্যাপার আছে, সবকিছু মিলিয়েই আমাদের ডিপ্লোম্যাটিক কাজটা আমরা চালিয়ে যাচ্ছি।'
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের কৌশলে পরিবর্তন আনা হয়েছে জানিয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, 'আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টিতে আরও জোরালোভাবে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।' তিনি বলেন, 'আমরা ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটিকে আরও বেশি জোর দিচ্ছি, তারাও যেন মিয়ানমারের ওপরে সেই প্রেশারটা ক্রিয়েট (চাপ সৃষ্টি) করে।'
এদিকে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে গঠিত জাতীয় কমিটিতে শুধু নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে—এমন বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, 'কমিটিতে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল-কায়েদা সেল গঠনের চেষ্টা করছে বলে যে তথ্য এসেছে, সে বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য নেই বলে জানান শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, 'এখন পর্যন্ত কোনো স্পেসিফিক ডেটা আমাদের কাছে নেই। কোনো ফ্যাক্টস অ্যান্ড ডেটা নেই যার ওপরে আমি এটা নিয়ে কথা বলতে পারি।'
জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলেও জানান তিনি।
এ ব্যাপারে জাতিসংঘের কাছে তথ্য চাওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবেন।'
এ সময় ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা 'র'-এর প্রধান বাংলাদেশে এসে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশকে যুক্ত না হওয়ার বার্তা দিয়েছিলেন—ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের এমন বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'এ বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই।'
ভারত এ বিষয়ে বাংলাদেশকে কোনো অনুরোধ বা আহ্বান জানিয়েছে কি না—প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, 'না, দেয়নি।'
