গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ; সমালোচনা না করে বিরোধী দলগুলোকে বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান
চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সরকার সংকট কমাতে জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।
আজ শনিবার ঢাকা-১৭ আসনের আওতাধীন মহাখালী টিঅ্যান্ডটি মাঠে চেক বিতরণ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, "বিদ্যুৎ সংকটের কারণে মানুষের যে দুর্ভোগ হচ্ছে, তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আল্লাহর রহমতে আশা করছি, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গ্যাস সংকট অনেকটাই কমে আসবে।"
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে সরকারের সমালোচনা করা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে সমস্যা সমাধানে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পরিকল্পনা তুলে ধরতে হবে।
বিএনপি ও দলটির অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ৮১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। অনুষ্ঠানে ৬৮২ জন অসহায়, দুস্থ ও অসুস্থ মানুষের মধ্যে আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছেন। সরকার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছে।
তিনি জানান, তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতেও সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে যে গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ হলো বাংলাদেশের সীমিত এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর (রিগ্যাসিফিকেশন) করার সক্ষমতা।
তিনি বলেন, "একসময় গ্যাস ছিল বাংলাদেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্তু গত ১৭ বছরে স্বৈরাচারী সরকার নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে উদ্যোগ নেয়নি। ফলে পুরো জ্বালানি খাতকে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা হয়েছে।"
তারেক রহমান জানান, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দেশের মাটিতে নতুন গ্যাসের সন্ধান ও অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মাধ্যমে এই কাজ এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য হলো দেশের গ্যাসক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের মানুষের হাতেই রাখা।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের প্রয়োজনীয় গ্যাসের একটি বড় অংশ আমদানি করতে হয়। বিদেশ থেকে গ্যাস আনার জন্য ব্যবহৃত জাহাজে তা সংরক্ষণ ও রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা ছিল মাত্র দুটি ভাসমান টার্মিনালের। আগের সরকার আরও একটি টার্মিনাল আনার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার সেই উদ্যোগ বাতিল করে দেয়। ফলে বিদ্যমান দুটি টার্মিনালের একটিতে হঠাৎ দুর্ঘটনা ঘটার পর বর্তমান গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্যাস সরবরাহের সঙ্গে সম্পর্কিত কারিগরি সমস্যাগুলো ইতোমধ্যে সমাধান করা হয়েছে। তিনি বলেন, "মানুষকে যত দ্রুত সম্ভব এই দুর্ভোগ থেকে মুক্ত করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।"
তিনি জানান, নতুন গ্যাস টার্মিনাল নির্মাণ ও দ্রুত দেশে আনার জন্য চীনসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সরকার কাজ করছে।
তারেক রহমান আরও বলেন, দেশের গ্যাসের প্রয়োজন মেটাতে সহযোগিতা চেয়ে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে কথা বলেছেন।
তিনি জনগণকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিশেষায়িত এলএনজি জাহাজ তৈরি করতে যথেষ্ট সময় লাগে এবং বিশ্বের খুব অল্প কয়েকটি দেশ এ ধরনের জাহাজ নির্মাণ করতে পারে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে সরকারের সমালোচনা করা রাজনৈতিক দলগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদেরও বাস্তবসম্মত বিকল্প পরিকল্পনা তুলে ধরা উচিত।
তিনি বলেন, "আপনাদের কাছে যদি আরও ভালো কোনো পরিকল্পনা থাকে, তাহলে সেটি সংসদ ও জনগণের সামনে উপস্থাপন করুন। পরিকল্পনাটি যদি বাস্তবসম্মত হয় এবং ছয় মাসের মধ্যে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয়, তাহলে আমরা সেটিই বাস্তবায়ন করব।"
রাজনৈতিক নেতাদের বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে জনগণকে পরিস্থিতির জটিলতা ও সম্ভাব্য সমাধান সম্পর্কে বোঝানোর আহ্বান জানান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সরকারের পরিকল্পনা আগামী সংসদ অধিবেশনে উপস্থাপন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জ্বালানিসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো পুনর্গঠনের কাজ করে যাচ্ছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সব সমস্যা মাত্র ছয় মাসের মধ্যে সমাধান হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, "একটি শিশুও কারও হাত ধরে হাঁটতে শেখার জন্য প্রায় ১৫ থেকে ১৮ মাস সময় নেয়। আর আপনাদের নির্বাচিত সরকারের বয়স মাত্র ছয় মাস।"
তারেক রহমান রাজনৈতিক দলগুলোকে সংঘাতের রাজনীতি পরিহার করে দেশের উন্নয়নের জন্য বাস্তবসম্মত প্রস্তাব ও পরিকল্পনা তুলে ধরার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, "রাজনীতির উদ্দেশ্য জনগণকে বিভ্রান্ত করা নয়। একজন রাজনীতিবিদের দায়িত্ব হলো মানুষকে ধৈর্য ধরতে সাহায্য করা এবং সঠিক পথ দেখানো।"
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ উন্নয়ন, জবাবদিহি এবং জীবনযাত্রার মানের উন্নতি চায়। তারা রাজপথে আন্দোলন, অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা চায় না।
তিনি বলেন, "রাজপথে ধ্বংসযজ্ঞ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির রাজনীতি শেষ হয়েছে। মানুষ এখন আর এ ধরনের রাজনীতিকে সমর্থন করে না।"
তারেক রহমান বলেন, দেশের ২০ কোটি মানুষকে কার্যকরভাবে দক্ষ ও উৎপাদনশীল জনশক্তিতে রূপান্তর করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দেওয়া সম্ভব। তার ভাষায়, এই ২০ কোটি মানুষ মানে ৪০ কোটি কর্মক্ষম হাত, যাদের দক্ষ ও উৎপাদনশীল করে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, "আমি কী পেয়েছি, সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং এই দেশ ও দেশের মানুষের জন্য আমি কী দিতে পেরেছি, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।"
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ৮১তম জন্মবার্ষিকীতে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পথে দেশকে এগিয়ে নিতে নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
