সামাজিক সুরক্ষায় জিডিপির মাত্র ০.৯% ব্যয় বাংলাদেশের, দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে অনেক কম
বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা খাত স্বল্প বরাদ্দ, লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যর্থতা এবং বিচ্ছিন্ন কর্মসূচির সংকটে ভুগছে। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দারিদ্র্য দূরীকরণ কেন্দ্রিক মূল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বাংলাদেশ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ০.৯ শতাংশ ব্যয় করে, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর গড় ব্যয় ৩.৮ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২২ সালে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৬৭.১ শতাংশই সামাজিক সুরক্ষার সুবিধার বাইরে ছিল। অন্যদিকে, বিদ্যমান সুবিধাভোগীদের ৬২.৮ শতাংশই দরিদ্র বা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল না; যা সামাজিক নিরাপত্তার অর্থ বণ্টনে মারাত্মক অপচয় ও সঠিক সুবিধাভোগী নির্বাচনে ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে।
আজ মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জিইডি আয়োজিত এসডিজি অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো সংক্রান্ত জাতীয় সম্মেলনের "ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন ও এসডিজি অর্জন" শীর্ষক সমান্তরাল অধিবেশনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়।
জিইডির মূল্যায়ন অনুযায়ী, কিছু কর্মসূচিতে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বাদ পড়ার (এক্সক্লুশন) হার অত্যন্ত বেশি। উদাহরণস্বরূপ, বিধবা ভাতা কর্মসূচিতে এই বাদ পড়ার হার ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে; যার অর্থ এই সুবিধার যোগ্য বিপুলসংখ্যক মানুষ তালিকা থেকেই বাদ পড়েছেন।
একই সঙ্গে, অনভিপ্রেত অন্তর্ভুক্তির (ইনক্লুশন) উচ্চ হারের কারণে সরকারি সম্পদ এমন অনেকের কাছে পৌঁছাচ্ছে যারা আদতে দরিদ্র বা ঝুঁকিপূর্ণ নন। প্রতিবেদনে এটিকে সামাজিক নিরাপত্তা বরাদ্দের অপচয় এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে ("এলিট ক্যাপচার") চলে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা
বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাটি অত্যন্ত বিক্ষিপ্ত ও খণ্ডবিখণ্ড। মূল অর্থায়ন ৯৫টি ওভারল্যাপিং বা প্রায় একই ধরনের একাধিক কর্মসূচির মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে।
এর মধ্যে ছোট আকারের ৫০টি কর্মসূচির পেছনে মোট বরাদ্দের মাত্র ২.৩ শতাংশ ব্যয় হয়, যা প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি, একই কাজের পুনরাবৃত্তি এবং দুর্বল সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিক্ষিপ্ত এই ব্যবস্থার কারণে কর্মসূচিগুলোর সঠিক নজরদারি ও সার্বিক প্রভাব মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদনে শহুরে দরিদ্রদের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে চালু থাকা ১৪০টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে মাত্র ২৩টি বিশেষভাবে শহরের মানুষের জন্য তৈরি, যা সামাজিক সুরক্ষার মোট বরাদ্দের মাত্র ৪ শতাংশ।
এর ফলে শহরের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষ, বিশেষ করে যারা অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল এবং জীবনযাত্রার বর্ধিত ব্যয়ের কারণে চাপের মুখে রয়েছেন, তারা সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশল
বাংলাদেশ যখন ২০২৬–২০৩১ মেয়াদের জন্য একটি নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো চালু করতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই এই মূল্যায়ন সামনে এলো। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১ ও ১০ নং লক্ষ্য—দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য হ্রাস—এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই কৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই কৌশলে ডিজিটাল নিবন্ধনের মাধ্যমে অপচয় কমানো, সুবিধাভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা আনা এবং ওভারল্যাপিং কর্মসূচিগুলোকে একীভূত করার ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এই কাঠামোর আরেকটি উদ্দেশ্য হলো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে শহরের দরিদ্র পরিবারগুলোর কাছে সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা পৌঁছে দেওয়া।
দেশের অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আসা ধাক্কার পর দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এ খাতের সংস্কার আরও জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে মধ্যম দারিদ্র্য ১৮.৭ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্য ৫.৬ শতাংশে নেমে এসেছিল। তবে ২০২৫ সালের মধ্যে এই হার যথাক্রমে বেড়ে ২৭.৯৩ শতাংশ এবং ৯.৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দারিদ্র্য ও বৈষম্য বাড়তে থাকায় জিইডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগণকে সুরক্ষার আওতায় আনতে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই।
