শ্রমজীবীদের কাছ থেকে ‘গলাকাটা অভিবাসন ব্যয়’ নেওয়া হয়, ‘অবশ্যই কমাতে হবে’: প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী
বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য দেশের গরিব শ্রমজীবী মানুষের কাছ থেকে 'গলাকাটা অভিবাসন ব্যয়' নেওয়া হয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। তিনি বলেছেন, 'অবশ্যই এই খরচ কমাতে হবে।'
বৃহস্পতিবার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্মের (ওইপি) 'অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থাপনা মডিউল'-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং শরণার্থী ও অভিবাসন গবেষণা ইউনিট (আরএমএমআরইউ) যৌথভাবে রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অভিবাসনের নামে প্রতারণা, ভুয়া বিজ্ঞাপন ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধেও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'যারা অভিবাসন নিয়ে প্রতারণার চক্র হিসেবে কাজ করছেন, তারা ভালো হয়ে যান। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবাই নজরদারি করছে। এখন আর রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই। এখনও যদি এসব বন্ধ না করেন, তাহলে আপনাদের জন্য কঠিন পরিণতি অপেক্ষা করছে।'
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী জানান, তার কাছে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০টি অভিযোগ আসে। এর বেশির ভাগই বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পরিবার বা চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে। অনেককে যে কাজের কথা বলে বিদেশে পাঠানো হয়, সেখানে গিয়ে তারা সেই কাজ পান না।
তিনি বলেন, 'কেউ নির্যাতনের শিকার হন, কেউ জিম্মি হয়ে মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হন, আবার কেউ প্রতারণার শিকার হন।'
সম্প্রতি সার্বিয়ায় নেওয়ার কথা বলে ২০০ থেকে ৭০০ জনের একটি গ্রুপের কাছ থেকে জনপ্রতি ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। এছাড়া ইউরোপে পাঠানোর নামে ১০-১৫ জনের বিভিন্ন গ্রুপের কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও এসেছে। এসব ঘটনায় পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নুরুল হক নুর বলেন, 'সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত মালয়েশিয়া, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামে চটকদার বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই মন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমোদন নেই। মাত্র ৩০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তাই এসব ভুয়া প্রচারণাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।'
তিনি বলেন, 'বিএমইটির ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ক্ষমতা রয়েছে। তাই ভুয়া বিজ্ঞাপন ও প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।'
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, 'সরকার মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন শ্রমবাজারে স্বচ্ছ ও কম খরচে কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই কিছু অসাধু চক্র পাসপোর্ট জমা, মেডিকেল সিরিয়াল এবং টাকা নেওয়ার নামে প্রতারণা শুরু করে দিয়েছে।'
তিনি জানান, দেশে প্রায় তিন হাজার রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স থাকলেও এতগুলোর প্রয়োজন রয়েছে কি না, সেটিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অনেক এজেন্সি লাইসেন্সের শর্তই পূরণ করতে পারে না। আবার কেউ কেউ সিন্ডিকেট করে শ্রমিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে।
সিঙ্গাপুরে কর্মী পাঠানোর খরচের প্রসঙ্গ তুলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'একজন শ্রমিকের কাছ থেকে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটি সিঙ্গাপুর সরকারের নির্ধারিত খরচ নয়; বরং কিছু সিন্ডিকেটের কারণে এই ব্যয় বেড়েছে। এসব সিন্ডিকেট গরিব মানুষের রক্ত চুষে শত শত কোটি টাকার মালিক হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকেও সাধারণ প্রবাসীদের ঋণ দিতে গিয়ে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তিন লাখ টাকার ঋণ পেতে যদি দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা ঘুষ চাওয়া হয়, সেটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।'
নুরুল হক নুর বলেন, 'অভিবাসন শুধু রেমিট্যান্স আয়ের বিষয় নয়; এটি দেশের মর্যাদা ও ভাবমূর্তির সঙ্গেও জড়িত। তাই বৈধ, নিরাপদ ও নৈতিক অভিবাসন নিশ্চিত করতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। প্রতারণা ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে।'
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বিএমইটি, আরএমএমআরইউ এবং সিস্টেক ডিজিটাল লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থাপনা মডিউলটি তৈরি করা হয়েছে। নতুন ওইপি মডিউলের মাধ্যমে দেশের সব জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস এবং বিএমইটির কেন্দ্রীয় অভিযোগ ব্যবস্থাপনাকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনা হবে।
এই মডিউলের মাধ্যমে অভিযোগের প্রতিটি ধাপ অনলাইনে অনুসরণ করা যাবে। ফলে সেবার মান আরও উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রবাসী কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অনলাইনে অভিযোগ দাখিল, প্রয়োজনীয় নথি আপলোড, অভিযোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন ধাপে নোটিফিকেশন পাবেন।
বিএমইটির কর্মকর্তারা ডিজিটাল পদ্ধতিতে অভিযোগ নিবন্ধন, তদন্ত, মধ্যস্থতা বা সালিস, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নিষ্পত্তি, তদারকি ও প্রতিবেদন তৈরির পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে পারবেন।
অনুষ্ঠানে মডিউলটির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করা হয়। অভিযোগ দাখিল থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াও উপস্থাপন করা হয়। এর আগে বিএমইটি এবং জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের ১০০ কর্মকর্তাকে মডিউল পরিচালনার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাস এবং হেলভেটাস বাংলাদেশের সহায়তায় আরএমএমআরইউর মাধ্যমে পরিচালিত 'স্ট্রেনথেনড অ্যান্ড ইনফরমেটিভ মাইগ্রেশন সিস্টেমস' প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের আওতায় উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা এবং অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবা প্রদানের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ এবং শরণার্থী ও অভিবাসন গবেষণা ইউনিটের নির্বাহী পরিচালক ড. তাসনীম সিদ্দিকী।
