মাত্র একদিনের মধ্যে গুম প্রতিরোধ আইনের খসড়ার ওপর মতামত আহ্বান প্রহসনমূলক: টিআইবি
প্রস্তাবিত 'গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬'-এর খসড়ার ওপর অংশীজনদের মতামত দেওয়ার জন্য মাত্র এক দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে জনপরামর্শের নামে 'প্রহসন' বলে তীব্র সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
আজ বুধবার (২৯ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি এই আইন চূড়ান্ত করার আগে মতামতের সময়সীমা অন্তত দুই সপ্তাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে। একইসঙ্গে গুমের শিকার ব্যক্তি, তাঁদের পরিবার এবং অন্যান্য অংশীজনদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
দুর্নীতিবিরোধী এই সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, এরই মধ্যে 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬' সহ বেশকিছু আইনের ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি লঙ্ঘন করে সম্পূরক কার্যসূচি হিসেবে বিল উত্থাপন ও তড়িঘড়ি করে আইন পাশের অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে। আলোচ্য খসড়াটির ক্ষেত্রেও একইভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতার অপব্যবহারের দৃষ্টান্ত হিসেবে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত খসড়ায় গুমের ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে পুলিশের ওপর এককভাবে ন্যস্ত করা হয়েছে।এক্ষেত্রে পুলিশের পক্ষে কতটা নির্মোহ ও নিরপেক্ষ থেকে গুমের ন্যায় স্পর্শকাতর বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তকার্য সম্পন্ন করা সম্ভব, সেই প্রশ্ন রেখে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'দেশে গুমের যত ঘটনা ঘটেছে, তার সিংহভাগের সঙ্গে পুলিশ, গোয়েন্দা তথা নিরাপত্তাসংস্থা ও শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের একাংশের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশে গুমের ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। অথচ বিপুল জনরায়ে অভিষিক্ত ক্ষমতাসীন সরকার, বিগত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে যাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাকর্মীসহ সাধারণ নাগরিকের শৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে গুম ও হত্যার শিকার হওয়ার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের পক্ষে এ রকম বিধানসহ আইনের খসড়া কীভাবে প্রণীত হতে পারে! তাহলে কী আমরা ধরে নিব যে, কর্তৃত্বপরায়ণ আমল থেকে বর্তমানে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক মহল কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করেনি?'
বিবৃতিতে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, খসড়া আইনটিতে বেশকিছু ইতিবাচক ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেমন- গুমকে একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি ও চলমান অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও নির্দেশদাতাদের জবাবদিহির আওতায় আনা, গুমের ঘটনায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অথবা অন্য ধরনের অজুহাতকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা ইত্যাদি।
তবে তার মতে, অংশীজনদের মতামত প্রদানের জন্য মাত্র একদিনের সময় দেওয়ায় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি আইনের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও অংশীজনদের মতামত সংগ্রহের ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতি দৃশ্যমান হয়েছে। তাছাড়া এরই মধ্যে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের ক্ষেত্রে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি লঙ্ঘনের ঘটনাও আমাদেরকে শঙ্কিত করে তুলেছে যে, আলোচ্য খসড়াটির ক্ষেত্রেও একইভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতার অপব্যবহারের চর্চা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
টিআইবি আরও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, খসড়ায় এমন কিছু বিধান রাখা হয়েছে যার ফলে অধস্তন তদন্তকারীরা পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরতে ব্যর্থ হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পার পেয়ে যেতে পারেন। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, এ ধরনের ধারা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখবে এবং গুমের মামলাগুলোর ওপর রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সুযোগ করে দেবে।
তাই সংসদে আইনটি উত্থাপনের আগে গুমের শিকার পরিবার, সংশ্লিষ্ট অংশীজন এবং আন্তর্জাতিক মানের সর্বোত্তম চর্চা থেকে প্রাপ্ত সুপারিশগুলো অন্তর্ভুক্ত করে একটি সর্বজনীন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খসড়াটির প্রয়োজনীয় সংযোজন, বিয়োজন ও পরিমার্জন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
