বন্যায় ১৪০.৮২ কোটি টাকার সবজি নষ্ট, চট্টগ্রামে কেজিতে দাম বেড়েছে ২০-৫০ টাকা
টানা ভারী বৃষ্টি ও সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ১৪০ কোটি ৮২ লাখ টাকার গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে উৎপাদনকারী এলাকা থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে বিভিন্ন সবজির দাম কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
বন্যাকবলিত এলাকা থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে; এতে অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মধ্যে পড়েছেন মধ্য ও নিম্নআয়ের মানুষেরা।
৬ হাজার ৫৯১ হেক্টর সবজিক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ থেকে ১৮ জুলাইয়ের বন্যায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে মোট ৬ হাজার ৫৯১ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজিক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুই জেলায় আবাদ হওয়া মোট ২০ হাজার ৫৪৮ হেক্টর সবজিক্ষেতের মধ্যে চট্টগ্রামে ১৭ হাজার ৮২৮ হেক্টরের মধ্যে ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর এবং কক্সবাজারে ২ হাজার ৭২০ হেক্টরের মধ্যে ৬৮৪ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ ক্ষয়ক্ষতির কারণে দুই জেলার ৬৩ হাজার ৮৭৫ জন সবজি চাষি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, টানা বৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষেতের ফসল নষ্ট হওয়ায় পাইকারি বাজারে সবজির সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে পাইকারি পর্যায়ে বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হওয়ায় খুচরা বিক্রেতারাও বাড়তি দামে বিক্রি করছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভোক্তাদের ওপর।
তবে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, চট্টগ্রামের বাজারে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সবজি আসে এবং উত্তরাঞ্চল বন্যাকবলিত হয়নি। তার অভিযোগ, দুর্বল বাজার তদারকির সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী বন্যাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে দাম বাড়াচ্ছেন।
সবজির দাম বেড়েছে ব্যাপকভাবে
নগরের বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, কয়েক দিন আগের তুলনায় প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায় এবং কাঁকরোল ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। এ ছাড়া পটোল ৮০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ও ঝিঙে ১০০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং শসা ১২০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এক সপ্তাহ আগে ৬০ টাকায় বিক্রি হওয়া একটি লাউ এখন ৮০ থেকে ৯০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, গাজর ১৬০ টাকা, কাঁকরোল ৯০ থেকে ১০০ টাকা এবং পেঁপে ৫০ টাকা কেজি দরে।
রান্নার নিত্যপ্রয়োজনীয় সাধারণ কাঁচা মরিচের প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৪০ টাকায়, যদিও বাজারভেদে এতে ৫ থেকে ১০ টাকার পার্থক্য রয়েছে। নিত্যপণ্যের এমন ঊর্ধ্বমুখী বাজারে মধ্যবিত্ত পরিবারের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
নগরের মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা রহমান নাসির বলেন, "নিম্ন আয়ের মানুষ বেশি বিপাকে পড়েছেন। একদিকে তারা বন্যার ক্ষতিগ্রস্ত, অন্যদিকে বন্যার পর সবজির দাম বেড়েছে। সরকারের এ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।"
কাজির দেউড়ি বাজারের সবজি বিক্রেতা আবুল কাশেম বলেন, "আমাদের বাজারে সাধারণত বাঁশখালী, চন্দনাইশসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার স্থানীয় সবজি বিক্রি হয়। কিন্তু এবার বন্যায় এসব এলাকার অধিকাংশ ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম কিছুটা বেড়েছে।"
ক্ষতির মুখে ১ লাখ ৫০ হাজার ৮০ জন কৃষক
বন্যার প্রভাব শুধু সবজিক্ষেতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; ধানজাতীয় ফসলেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। দুই জেলায় ৩৩ হাজার ৪৭৩ হেক্টর আউশ আবাদি জমির মধ্যে ১০ হাজার ৯১৫ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৫৮ হাজার ২৫০ জন কৃষক ১৪৬ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
অন্যদিকে, ৩ হাজার ৬২৩ হেক্টর আমনের বীজতলার মধ্যে ১ হাজার ৪০১ হেক্টর নষ্ট হওয়ায় ২১ হাজার ৯৩৫ জন কৃষক ৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। এতে কৃষি খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দুই জেলার মোট ২৮টি উপজেলায় ১৯ হাজার ২৪৯ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ১ লাখ ৫০ হাজার ৮০ জন কৃষক চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। সব মিলিয়ে কৃষি খাতে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, "কৃষি খাতের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য প্রস্তুত করে জরুরি আর্থিক সহায়তার জন্য ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানানো হয়েছে। ধানের কিছু বীজ ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে, যা পর্যায়ক্রমে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। বাকি সহায়তা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।"
