রথযাত্রার সময় মেট্রো স্টেশনের নিচে রাখা ছাতা-বোমাটি খুললেই বিস্ফোরিত হতো
গত শুক্রবার (২৫ জুলাই) রাজধানীর মতিঝিলে মেট্রো স্টেশনের নিচে পরিত্যাক্ত ছাতার ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া বোমাসদৃশ বস্তুটি ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) বলে জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, ছাতাটি খুললেই বিস্ফোরণ ও হতাহত হওয়ার শঙ্কা ছিল।
বোমাটি যখন পাওয়া যায়, তখন ওই এলাকা দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব উল্টো রথযাত্রার একটি র্যালি যাচ্ছিল। যেখানে শত শত মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। তদন্তকারীরা মনে করছেন, ছাতাটি খুললেই বিস্ফোরণে ১৫-২০ জন হতাহত হওয়ার শঙ্কা ছিল।
সেদিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে মেট্রো স্টেশনের নিচে পরিত্যক্ত ওই ছাতাটি দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন মেট্রোরেলের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা। ছাতাটিতে মিট মিট করে লাল লাইট জ্বলছিল ও শব্দ হচ্ছিল। পরে ডিএমপির বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট গিয়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে আইইডি বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে। নিষ্ক্রিয় করার সময় মিরাজ আহমেদ (৩৩) নামের এক পথচারী বাঁ চোখে আঘাত পেয়ে আহত হয়েছেন।
কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) সূত্রে জানা যায়, উদ্ধার হওয়া আইইডি বোমাটি ব্যাটারি, ইলেকট্রিক সার্কিট ও ডেটোনেটর (ব্লাস্টিং ক্যাপ) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছিল। এটি এমনভাবে সংযুক্ত ছিল যে ছাতার সুইচ চাপলেই বিস্ফোরণ ঘটত। বোমাটির ভেতরে প্রায় ১ থেকে ১.৫ কেজি সালফার, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক সার্কিট ও অসংখ্য লোহার বল (স্প্লিন্টার) ব্যবহার করা হয়েছিল। বিস্ফোরণের ক্ষয়ক্ষতি বাড়াতে পাইপের ভেতরে স্প্লিন্টার ভরে রাখা হয়েছিল।
তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, উল্টো রথযাত্রার র্যালিকে লক্ষ্য করেই বোমাটি মেট্রো স্টেশনের নিচে রাখা হয়েছিল। কারণ ওই বোমাটির মেট্রোরেল স্থাপনার ক্ষতি করার মতো সক্ষমতা ছিল না। তবে জনবহুল জায়গায় বিস্ফোরণ হলে ১৫-২০ হতাহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
এই ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা দায়ের করেছেন মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মির্জা মোহাম্মদ মুক্তা। মামলায়ও উল্টো রথযাত্রার কথা উল্লেখ রয়েছে।
এজাহারে বলা হয়, শুক্রবার দুপুর ১টা থেকে উল্টো রথযাত্রার শোভাযাত্রা শুরু হয়। শোভাযাত্রাটি ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শুরু করে দৈনিক বাংলা মোড় হয়ে মতিঝিলের শাপলা চত্ত্বর প্রদক্ষিণ করে ইত্তেফাক মোড় হয়ে স্বামীবাগ আশ্রমে গিয়ে শেষ হয়। মেট্রো স্টেশনের নিচে জেনারেটর রুমের পাশে ছাতাটি পাওয়ার পর ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশে ওই স্থান কর্ডন করা হয়। রথযাত্রার র্যালী সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় র্যালীর মানুষদের বলা হয়, বিদ্যুতের শর্ট সার্কিট হয়েছে এবং লোকজনকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।
এজাহারে আরো বলা হয়, রথযাত্রার র্যালী চলে যাওয়ার পর বম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে খবর দেওয়া হয়। পরে তারা ৭ মিনিটে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে।
ঘটনাস্থল থেকে খয়েরি রঙের ছাতার পোড়া কাপড়, ছাতার বাঁট, সানলাইট ব্যাটারির অংশ, ৯ ভোল্ট ব্যাটারির অংশ, ছাতার রডের খণ্ড, জিআই পাইপের টুকরা ও ১২টি বিয়ারিং বল উদ্ধার করা হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে ঘটনাস্থলে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় কে বা কারা ছাতাটি সেখানে রেখে গেছে, তা এখনো জানতে পারেনি পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, এজন্য আশপাশের ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি রথযাত্রায় দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও ড্রোনের কয়েকশো ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজনদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের ডিসি হারুন অর রশিদ বলেন, স্থানীয় থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি, সিটিটিসি ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বোমাটি রাখা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস্) মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, 'আমরা সবকিছু মাথায় রেখেই তদন্ত করছি। এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বোমাটি রাখা হয়েছিল কি না।'
