ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে: ব্যয় বেড়ে ২৭,০৪৬ কোটি টাকা, মেয়াদ বাড়ল ২০৩০ সাল পর্যন্ত
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদন করেছে সরকার। এতে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৫৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে এবং মেয়াদ চার বছর বাড়িয়ে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
আজ বুধবার (২২ জুলাই) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে এই সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় সংশোধনীর অধীনে, প্রকল্প ব্যয় প্রথম সংশোধনে অনুমোদিত ১৭,৫৫৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৭,০৪৫.৬৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ এই প্রস্তাবে প্রকল্পের ব্যয়ে নতুন করে ৯,৪৯২ কোটি টাকা যুক্ত হয়েছে।
প্রকল্পটি শুরুতে ১৬,৯০১.৩২ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে অনুমোদন পেয়েছিল। সর্বশেষ সংশোধনে সরকারি তহবিলের অংশ অতিরিক্ত ৫,৯৪২ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে, যা ৭৫.৫৯ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। পাশাপাশি প্রকল্পে ঋণের অংশও ৩,৫৫০ কোটি টাকা বা ৩৬.৬৩ শতাংশ বেড়েছে।
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে এই মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, তখন বাস্তবায়ন সম্পন্ন করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। প্রথম সংশোধনীতে সেই মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। কাজের বাস্তব অগ্রগতি ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের ওপর ভিত্তি করে একনেক এখন আরও চার বছরের মেয়াদ বৃদ্ধি অনুমোদন করেছে।
পরিকল্পনা কমিশন এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তন, অতিরিক্ত উপাদান সংযোজন, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামা এবং ইউটিলিটি স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তার কারণে প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ উভয়ই বেড়েছে।
মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশের মুদ্রা– টাকার অবমূল্যায়ন এই ব্যয় বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। মূল প্রকল্প প্রস্তাবে ডলারের বিনিময় হার ধরা হয়েছিল ৮০.৫৭ টাকা, যা পরবর্তীতে বেড়ে দাঁড়ায় ৮৬ টাকা। আর দ্বিতীয় সংশোধনীতে এই হার বাড়িয়ে ১২১.৭৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ডলারের এই উচ্চ বিনিময় হারের কারণে ঠিকাদারদের বকেয়া বা অবশিষ্ট পাওনা বাবদ অতিরিক্ত ৩,৭৩৬.৬১ কোটি টাকা খরচ বাড়ছে, যা মোট ব্যয় বৃদ্ধির প্রায় ৩৯.৩৬ শতাংশ।
ঠিকাদারদের বাড়তি অর্থ পরিশোধের ফলে ভ্যাট ও আয়করের পরিমাণও বেড়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী, অতিরিক্ত ভ্যাট ও কর বাবদ ১,০০০.৩৬ কোটি টাকা প্রয়োজন, যা মোট ব্যয় বৃদ্ধির ১০.৮৫ শতাংশ।
টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানি করা নির্মাণসামগ্রীর খরচও বেড়েছে। আমদানিকৃত সামগ্রীর ওপর উচ্চ কাস্টমস শুল্ক মেটাতে প্রকল্পে ৩৯০.৭৩ কোটি টাকা বা মোট বৃদ্ধি পাওয়া ব্যয়ের প্রায় ৪.১২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
নকশা পরিবর্তনে বাড়ছে প্রকল্প ব্যয়
উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নৌযান চলাচল সুবিধা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বাড়াতে সংশোধিত প্রকল্পে বেশ কয়েকটি প্রকৌশল ও নকশাগত পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নির্দেশনা অনুযায়ী তুরাগ নদীর তিনটি শাখার শ্রেণীবিভাগ উন্নীত করা হয়েছে। এর ফলে ব্রিজের ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স (উচ্চতা) ৭.৬২ মিটার থেকে বাড়িয়ে অন্তত ১২.২ মিটার করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। একইসঙ্গে প্রকৌশলীদের স্প্যানের দৈর্ঘ্য ৯০ মিটার পর্যন্ত বাড়াতে হয়েছে, এতে ব্যয় বেড়েছে ৫৯৭.৬৬ কোটি টাকা বা ৬.৩০ শতাংশ।
ঢাকা-টঙ্গী রেল করিডোর দুটি ট্র্যাক থেকে চার ট্র্যাকে সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যতে ছয় ট্র্যাকে উন্নীত করার সুযোগ রাখার পরিকল্পনা থাকায় সেতুর নকশায় পরিবর্তন আনতে হয়েছে। সংশোধিত নকশায় স্প্যানের দৈর্ঘ্য ১২৫ মিটার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, যা ব্যয়ে আরও ১৫৩.২০ কোটি টাকা বা ১.৬১ শতাংশ যোগ করেছে।
এছাড়া যানজট কমাতে বাইপাইল এলাকায় একটি ট্রাম্পেট ইন্টারচেঞ্জ যোগ করা হয়েছে, যার জন্য খরচ হচ্ছে ৬১০.০৭ কোটি টাকা বা ৬.৪২ শতাংশ বেশি। আশপাশের অবকাঠামো ১৮ মিটারে উন্নীত করতে লাগছে ১৬৬.৪১ কোটি টাকা এবং হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের সঙ্গে এক্সপ্রেসওয়েকে যুক্ত করতে একটি নতুন র্যাম্প নির্মাণের ফলে আরও ২৪৩.৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে যোগ হয়েছে।
নকশায় পরিবর্তন, নতুন ইন্টারচেঞ্জ ও টোল প্লাজা সুবিধার সম্প্রসারণের কারণে ভূমি অধিগ্রহণের পরিধি ১০.৮৯ হেক্টর থেকে বাড়িয়ে ১৪.৫ হেক্টর করতে হয়েছে। এতে প্রকল্প ব্যয়ে অতিরিক্ত ৭৪৭.৫৫ কোটি টাকা বা ৭.৮৮ শতাংশ যুক্ত হয়েছে।
মূল প্রকল্প পরিকল্পনায় ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর এবং জমি ভাড়ার খরচ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সংশোধিত প্রস্তাবনায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির লাইন সরানোর জন্য ৫১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি জমি ভাড়ার জন্য ১ কোটি টাকা যুক্ত করে মোট অতিরিক্ত বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৫১৬ কোটি টাকা, যা ব্যয় বৃদ্ধির ৫.৪৪ শতাংশ।
ঢাকার যানজট নিরসনের লক্ষ্য
২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি— হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছের কাওলা থেকে শুরু হয়ে আশুলিয়া হয়ে সাভারের শ্রীপুর পর্যন্ত যাবে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে যানজট কমানো এবং প্রধান অর্থনৈতিক করিডোরগুলোতে পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে সরকার এই মেগা প্রকল্পটি হাতে নেয়।
ঢাকা, সাভার ও আশুলিয়ায় দ্রুত নগরায়ন এবং নিত্যদিনের যাত্রী সাধারণের চাপের কারণে প্রতিনিয়ত এই রুটে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। যানজটের সমস্যার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্য পরিবহনে নিয়মিত বিলম্ব ঘটে।
তৈরি পোশাক কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করাই এই প্রকল্পের লক্ষ্য। নিত্যদিনের যাতায়াত, পণ্য পরিবহন এবং ঈদের মতো উৎসবের সময়—তীব্র যানজটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কাঁচামাল পরিবহন এবং উৎপাদিত পণ্য বন্দরে পৌঁছাতে প্রায়শই বিলম্ব হয়।
প্রকল্পের ইতিহাস
আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল রুটের জন্য ২০১৫ সালে প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৫ সালের ২২ জানুয়ারি সরকার চায়না ন্যাশনাল মেশিনারিজ ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশনের (সিএমসি) সঙ্গে জি-টু-জি (জিটুজি) ব্যবস্থার অধীনে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে।
২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর একনেক ১৬,৯০১.৩২ কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করে প্রকল্পটি অনুমোদন করে। সরকার ২০১৭ সালের ২৯ নভেম্বর বাণিজ্যিক চুক্তি সই করে। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ২০২২ সালের ১০ মে থেকে কার্যকর হয়।
প্রকল্প বাস্তবায়ন চলাকালে চীনের এক্সিম ব্যাংক তার অর্থায়ন নীতি পরিবর্তন করে এবং প্রকল্প ব্যয়ের সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ অর্থায়নে রাজি হয়। বাকি ১৫ শতাংশ অর্থ বাংলাদেশকে নিজস্ব তহবিল থেকে সংস্থান করতে হয়। মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনের পাশাপাশি এই অর্থায়ন সমন্বয়ের ফলে ২০২২ সালের ১ জুন অনুমোদিত প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৭,৫৫৩.০৪ কোটি টাকা।
কোভিড-১৯ মহামারির কারণে প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু হতে দেরি হয়। অর্থায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এবং পরিস্থিতির উন্নতি হলে– ২০২২ সালের ২৮ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়।
প্রকল্পের মধ্যে পাঁচ বছর দুই মাসের নির্মাণ সময়কাল এবং পরবর্তীতে দুই বছরের 'ত্রুটি দায়বদ্ধতা কাল' (ডিফেক্টস লায়াবিলিটি পিরিয়ড বা ডিএলপি) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদন
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নকশার পরিবর্তন, অতিরিক্ত কাজ, বিনিময় হারের ওঠানামা এবং জমি ও ইউটিলিটি স্থানান্তর সংক্রান্ত জটিলতার কারণে দ্বিতীয় সংশোধনীর প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।
সংশোধিত প্রস্তাবে দুই বছরের ডিএলপিসহ মেয়াদ বাড়িয়ে ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রথম সংশোধিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৫৪ শতাংশ বেড়ে এখন প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৭,০৪৫.৬৮ কোটি টাকা।
২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) বৈঠকে সংশোধিত প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করা হয়, যার পর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পুনর্গঠন করা হয়।
