চট্টগ্রামে বন্যায় বেড়েছে সাপের উপদ্রব, ৭ দিনে আক্রান্ত ৮৬; বাড়ছে পানিবাহিত রোগও
টানা ভারি বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় সাপের উপদ্রব বেড়েছে। গত সাত দিনে জেলার বন্যাকবলিত এলাকায় সাপের কামড়ে অন্তত ৮৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন। একই সময়ে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
সোমবার চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাপে কাটার ৮৬ জনের মধ্যে দুইজন বিষধর সাপের দংশনের শিকার হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম টিবিএসকে বলেন, 'বন্যার পানিতে সাপের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় লোকালয় ও বসতবাড়িতে সাপের উপস্থিতি বেড়েছে। ফলে সাপে কাটার ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে।'
তিনি জানান, বিষধর সাপের দংশনের শিকার দুইজনই বোয়ালখালী উপজেলার বাসিন্দা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা ও অ্যান্টি-স্নেক ভেনম দেওয়ার পর তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে তারা চিকিৎসাধীন থাকলেও তাদের প্রাণহানির আশঙ্কা নেই।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাপে কাটার রোগীদের মধ্যে বোয়ালখালীতে ২০ জন, পটিয়ায় ১৮ জন, বাঁশখালীতে ১২ জন, রাউজানে ৯ জন, হাটহাজারীতে ৮ জন, সাতকানিয়ায় ৬ জন, আনোয়ারায় ৫ জন, রাঙ্গুনিয়ায় ৩ জন, চন্দনাইশে ৩ জন এবং লোহাগাড়ায় ২ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, সাপে কাটার রোগীদের চিকিৎসার জন্য জেলার ১৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৮০০ ভায়াল এবং জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ৩০০ ভায়ালসহ মোট ১ হাজার ১০০ ভায়াল অ্যান্টি-স্নেক ভেনম মজুত রয়েছে।
বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, রাতে চলাচলের সময় টর্চলাইট ব্যবহার, পানিতে নামার আগে লাঠি দিয়ে জায়গা পরীক্ষা করা এবং ঘরের আশপাশ পরিষ্কার রাখা জরুরি। সাপে কামড়ালে ঝাড়ফুঁক বা বিলম্ব না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে বলা হয়েছে।
বাড়ছে পানিবাহিত রোগ
বন্যার কারণে চট্টগ্রামে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের প্রকোপও বাড়ছে। গত সাত দিনে জেলার বন্যাকবলিত ১৫টি উপজেলায় অন্তত ১০২ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। আক্রান্তদের প্রায় ৭০ শতাংশই শিশু বলে জানিয়েছে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের ধারণা, চিকিৎসার বাইরে আরও অনেক আক্রান্ত ব্যক্তি থাকতে পারেন।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, বন্যার সময় বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার সংকট তৈরি হওয়ায় ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে বাঁশখালী উপজেলায় চারজন এবং সাতকানিয়ায় ছয়জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন।
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে মোট ২ লাখ ৩ হাজার ৪০০ প্যাকেট ওআরএস মজুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সাতকানিয়ায় ৫ হাজার এবং বাঁশখালীতে ১৫ হাজার প্যাকেট ওআরএস সংরক্ষিত রয়েছে।
এ ছাড়া বন্যাকবলিত এলাকায় মোবাইল মেডিকেল টিমের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। ডায়রিয়া, চর্মরোগ, চোখের সংক্রমণসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ওপর নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।
ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, 'বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। অ্যান্টি-স্নেক ভেনম, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, কলেরা স্যালাইন ও ওআরএসসহ জরুরি ওষুধ নিয়মিতভাবে প্রতিটি উপজেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রয়োজন অনুযায়ী ঢাকার কেন্দ্রীয় মেডিকেল স্টোর (সিএমএসডি) থেকেও সরবরাহ নেওয়া হচ্ছে। গতকালও ঢাকা থেকে ৩০০ ভায়াল অ্যান্টি-স্নেক ভেনম এবং ৪০০টি ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট আনা হয়েছে। পাশাপাশি জেলা মেডিকেল স্টোর থেকেও প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন উপজেলায় ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে।'
