জনস্বার্থ উপেক্ষা করে এনসিটি ও সিসিটি ইজারা দিলে প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি বন্দর রক্ষা কমিটির
জনগণের মতামতকে তোয়াক্কা না করে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান দুটি টার্মিনাল কোনো দেশি বা বিদেশি অপারেটরের হাতে, বিশেষ করে দুবাই-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'ডিপি ওয়ার্ল্ড'-এর কাছে ইজারা দেওয়ার যেকোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে দেশব্যাপী তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে একটি নাগরিক প্ল্যাটফর্ম।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বন্দর নগরীর হোটেল সৈকতে 'চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ও সিসিটি ইজারা: বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব' শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এই সতর্কবার্তা দেয় 'চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি'।
কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু। প্রবন্ধে ইজারা প্রক্রিয়ার বিষয়ে কমিটির নানাবিধ উদ্বেগ ও আপত্তির কথা তুলে ধরা হয়।
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন, জনগণের টাকায় নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসি-টি) এবং চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) নির্মাণ করা হয়েছে। বহু বছর ধরে বাংলাদেশি পেশাজীবীরা অত্যন্ত সফলতার সাথে এগুলো পরিচালনা করে আসছেন। এমন পরিস্থিতিতে এই টার্মিনালগুলোর ব্যবস্থাপনা হঠাৎ করে কোনো বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার পেছনে সরকারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় এই টার্মিনালগুলো পরিচালনার সক্ষমতা প্রমাণিত হওয়ার পরও, কেন এগুলোর অপারেশনাল দায়িত্ব একটি বিদেশি কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে—সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
প্রবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, এনসিটির বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ১১ লাখ টিইউএস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কনটেইনার) হলেও বর্তমানে এটি বছরে প্রায় ১৩ লাখ টিইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে। এমনকি চলতি বছরের মে মাসেই টার্মিনালটি রেকর্ড ১ লাখ ২৬ হাজার টিইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে, যা স্থানীয় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও সফলতারই বহিঃপ্রকাশ বলে দাবি করে কমিটি।
কমিটি আরও উল্লেখ করে, এনসিটি বর্তমানে দেশের সবচেয়ে আধুনিক ও যান্ত্রিক কনটেইনার টার্মিনাল। এর অধিকাংশ গ্যান্ট্রি ক্রেন, রাবার-টায়ার্ড গ্যান্ট্রি (আরটিজি) ক্রেনসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতির বয়স মাত্র চার থেকে পাঁচ বছর। ফলে আধুনিক বন্দর অবকাঠামোতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিনিয়োগের সুফল কেন একটি বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়া হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বক্তারা।
আলোচকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ইজারা বা কনসেশন মডেলের আওতায় টার্মিনালগুলোর আনুষ্ঠানিক মালিকানা রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকলেও এর পরিচালন নিয়ন্ত্রণ, শুল্ক নির্ধারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কার্যত বিদেশি কোম্পানির হাতে চলে যেতে পারে।
তারা অভিযোগ করেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর তার উদ্বৃত্ত আয়ের পুরো টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়। কিন্তু ইজারা দেওয়া হলে ম্যানেজমেন্ট ফি, রয়্যালটি এবং লভ্যাংশের নামে মুনাফার একটি বিশাল অংশ বিদেশে পাচার হয়ে যাবে।
কনসেপ্ট পেপারে আরও দাবি করা হয়, ইজারা চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ ইতোমধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, উৎপাদনকারী এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর ব্যয়ের বোঝা চেপে বসবে।
একই সাথে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে কমিটি জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ঘাঁটি, ইস্টার্ন রিফাইনারি এবং জ্বালানি তেল মজুত ডিপোসহ দেশের বেশ কিছু কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে।
প্রবন্ধে সতর্ক করে বলা হয়, একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে এই টার্মিনালগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন নিয়ন্ত্রণ থাকাটা কেবল কোনো অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এর সাথে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও জড়িত।
সংগঠনটির অভিযোগ, প্রস্তাবিত এই ইজারা চুক্তির মেয়াদ, আর্থিক কাঠামো, রাজস্ব ভাগাভাগির প্রক্রিয়া এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট সুরক্ষাকবচগুলো এখনো সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ করা হয়নি।
গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্ট কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এবং প্রায় এক হাজার ৫০০ বছরের গৌরবময় ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি প্রাচীন সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার।
তিনি বলেন, 'জাতীয় স্বার্থের সাথে জড়িত এমন একটি কৌশলগত সম্পদের বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আগামী ৫০ বছরে দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে, তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মূল্যায়ন করা উচিত।'
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, জনগণের মতামত উপেক্ষা করে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
বৈঠকে বক্তারা অবিলম্বে প্রস্তাবিত ইজারা সংক্রান্ত সকল নথিপত্র জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানান। একই সাথে যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরের আগে একটি স্বাধীন অর্থনৈতিক, আইনি ও নিরাপত্তা বিষয়ক মূল্যায়ন কমিটি গঠনের তাগিদ দেন। তারা বিষয়টি নিয়ে সংসদীয় তদন্ত এবং আরও ব্যাপক পরিসরে গণশুনানির আহ্বান জানান।
বন্দর পরিচালন ব্যবস্থার উন্নয়নে বাংলাদেশ বিদেশি কারিগরি সহায়তা নিতে পারে—এমনটি স্বীকার করলেও আলোচকরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালন ব্যবস্থার মূল নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকতে হবে।
কমিটি হুশিয়ারি দিয়ে বলেছে, সরকার যদি জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো ইজারা চুক্তি নিয়ে সামনে অগ্রসর হয়, তবে এর বাস্তবায়নে বাধা দিতে সাধারণ জনগণকে সাথে নিয়ে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
