দেশজুড়ে পথশিশুদের পুনর্বাসনে ৪২০ কোটি টাকার প্রকল্প নিচ্ছে সরকার
পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের আবাসন, শিক্ষা, পুনর্বাসন এবং দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে প্রায় ৪২০ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার।
'পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের আবাসন সুবিধাসহ পুনর্বাসন প্রকল্প' শীর্ষক এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমি।
চলতি বছর প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয়ে ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রায় ৪২০ কোটি টাকার পুরো ব্যয়ই সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন (জিওবি) থেকে বহন করা হবে। রোববার প্রকল্প প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী, সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং তাদের সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করাই প্রকল্পটির প্রধান লক্ষ্য।
আশ্রয়, শিক্ষা ও পরিবারে পুনর্মিলন
প্রকল্পের আওতায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ৬ হাজার ৬০০ শিশুকে পুনরায় পরিবার ও সমাজের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ছাড়া ১ হাজার ৯০০ পথশিশুর জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হবে এবং ৪ হাজার ৫০০ শিশুকে আনুষ্ঠানিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় আনা হবে। ঝুঁকিতে থাকা পথশিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমও বাস্তবায়ন করা হবে।
শেল্টার হোমে থাকা আগ্রহী শিশুদের বাজারের চাহিদাভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—এমন শিশুদের এককালীন আর্থিক অনুদান বা সমমূল্যের প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম দেওয়া হবে।
এ ছাড়া ৫ হাজার ৭০০ পথশিশুকে স্বাবলম্বী করতে আর্থিক সহায়তা এবং ৫ হাজার ৫০০ শিশু বা তাদের পরিবারের জন্য শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা (কন্ডিশনাল ক্যাশ ট্রান্সফার) দেওয়া হবে।
কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণদের দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী উপযুক্ত উপকারভোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করা হবে।
সারাদেশে সম্প্রসারণ
ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পটি দেশের ৩১টি জেলা, ৩৪টি উপজেলা, ১২টি সিটি করপোরেশন এবং ৮টি পৌরসভায় বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্প এলাকার মধ্যে রয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর, গাজীপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন।
এ ছাড়া সাভার, গজারিয়া, সন্দ্বীপ, কুমিল্লা সদর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, নোয়াখালী সদর, হাইমচর, বরিশাল সদর, মেহেন্দিগঞ্জ, উজিরপুর, মুলাদী, ভোলা সদর, লালমোহন, মনপুরা, তজুমুদ্দিন, পিরোজপুর সদর, পটুয়াখালী সদর, বাউফল, বরগুনা সদর, আমতলী, পাথরঘাটা, খুলনা সদর, হবিগঞ্জ সদর, সুনামগঞ্জ সদর, রাজশাহী সদর, নাটোর সদর, রংপুর সদর, গাইবান্ধা সদর, ভালুকা, ভৈরব ও নেত্রকোণা সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন পৌরসভা প্রকল্পের আওতায় থাকবে।
ডিপিপিতে বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকা এবং দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও জেলা শহরে পথশিশুর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তবে সচেতনতা বৃদ্ধি, গণযোগাযোগ, পুনর্বাসন এবং পরিবারে পুনর্মিলন কার্যক্রম সারা দেশেই পরিচালিত হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) 'সার্ভে অন স্ট্রিট চিলড্রেন ২০২২'-এর তথ্যের ভিত্তিতে প্রকল্প এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে।
নতুন আশ্রয়কেন্দ্র ও উন্মুক্ত স্কুল
প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র (শেল্টার হোম), ৩টি ট্রানজিট হোম এবং ১৫০টি উন্মুক্ত পথশিশু স্কুল স্থাপন ও পরিচালনা করা হবে।
এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের নিরাপদ আবাসন, শিক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা হবে।
এ ছাড়া ১৫টি কাউন্সেলিং বুথ স্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে পথশিশুর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে একটি বেইসলাইন জরিপ পরিচালনা, বায়োমেট্রিক ডাটাবেজ তৈরি এবং প্রত্যেক শিশুর জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে তাদের জন্য সমন্বিত সেবা প্রদান সহজ হয়।
পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের পুনরায় পরিবার ও সমাজে ফিরিয়ে আনতে একটি পৃথক নীতিমালা ও গাইডলাইন প্রণয়ন করা হবে।
পাশাপাশি বিত্তশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে শিশু পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা হবে। সরকারি প্রণোদনার মাধ্যমে পালক পরিবার (ফস্টার ফ্যামিলি) নির্বাচন করে নির্দিষ্টসংখ্যক শিশুর পরিবারভিত্তিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন ও সচেতনতা
আশ্রয়কেন্দ্র ও উন্মুক্ত স্কুলে থাকা শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনীয় বিশেষ সেবা দেওয়া হবে।
পাশাপাশি তাদের জন্য বাজার উপযোগী কারিগরি ও আয়বর্ধক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারে।
ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জন্য বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় ১২৫টি ইউনিয়নে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে।
এ ছাড়া বিলবোর্ড, পোস্টার, লিফলেট, বুকলেট, স্টিকার ও নিউজলেটার প্রকাশের পাশাপাশি পথনাটক, জারি, সারি, গম্ভীরা, মূকাভিনয়, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে, যাতে শিশু অধিকার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ে।
কেন শিশুরা পথে নামে
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, দারিদ্র্য, নদীভাঙন, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ ও সহিংসতার কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবিকার সন্ধানে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য শহরে চলে আসে।
এসব শিশু রাস্তা, ফুটপাত, সেতুর নিচে, পার্ক, বাস ও রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করে।
জীবিকার তাগিদে পথশিশুরা ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ, বাদাম ও সিগারেট বিক্রি, হোটেলে কাজ, কুলির কাজ, গাড়ি পরিষ্কার, হকারি ও ভিক্ষাবৃত্তিসহ নানা ধরনের অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হয়।
অনেক শিশু মাদক পরিবহন, মাদক বিক্রি, চুরি, পকেটমার কিংবা ভাসমান যৌনকর্মের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ে।
ডিপিপিতে বলা হয়েছে, ব্রাজিল, ভারত ও সিয়েরা লিওনের সফল পুনর্বাসন কর্মসূচির অভিজ্ঞতা প্রকল্পটি প্রণয়নে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বেশিরভাগ পথশিশু পরিবারে ফিরতে চায়
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী, ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ পথশিশু দিনে রাস্তায় কাজ করে পরিবারে ফিরে যায়। ১৯ শতাংশ শিশু স্থায়ীভাবে রাস্তায় বসবাস করে, ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারের সঙ্গে রাস্তায় থাকে এবং ৫ দশমিক ৬ শতাংশ অন্য পরিবারের কাছে ফিরে যায়।
সমীক্ষায় আরও দেখা যায়, ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ পথশিশুর বাবা-মা উভয়েই জীবিত এবং ৯১ দশমিক ২ শতাংশ শিশু পরিবারের সঙ্গে থাকতে চায়। তবে ৭১ দশমিক ৬ শতাংশ পুনর্বাসন কেন্দ্রে যেতে আগ্রহী নয়।
ডিপিপিতে বলা হয়েছে, দারিদ্র্য ও ক্ষুধাই শিশুদের বাড়ি ছাড়ার সবচেয়ে বড় কারণ। বিবিএসের সমীক্ষা অনুযায়ী, ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ পথশিশু দারিদ্র্য বা ক্ষুধার কারণে বাড়ি ছেড়ে শহরে এসেছে।
সহজ যোগাযোগব্যবস্থা, বিশেষ করে রেলপথ ব্যবহার করে অনেক শিশু ঢাকায় আসে। পরে অন্যান্য পথশিশুর মাধ্যমে তারা শহরের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।
প্রকল্পের আওতায় প্রত্যক্ষভাবে ২৪ হাজার ৮৫০ জন এবং পরোক্ষভাবে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ১৫০ জনসহ মোট প্রায় ৫ লাখ শিশু উপকৃত হবে বলে ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
