ইমেরিটাস অধ্যাপক পদ বাতিল ঘিরে বিতর্ক, জনসমর্থন পাচ্ছেন ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ
দেশে অনেক সহকারী অধ্যাপক এখন রোগীপ্রতি কমপক্ষে ১ হাজার টাকা ভিজিট নেন। আর জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের ভিজিট সাধারণত ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা বা তারও বেশি। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের অন্যতম জ্যেষ্ঠ এক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এখনো তার ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগীপ্রতি মাত্র ৩০০ টাকা ভিজিট নেন।
অত্যন্ত দরিদ্র রোগীদের ক্ষেত্রে তিনি অনেক সময় ভিজিটই নেন না। প্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হলে বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীদের জন্য ছাড়ের ব্যবস্থাও করে দেন।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক ও লেখক হিসেবে দেশের স্বাস্থ্য খাতে অবদান রেখে চলেছেন তিনি। এই চিকিৎসক হলেন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ—বাংলাদেশে অন্যতম পরিচিত চিকিৎসক।
গত কয়েক দিন ধরে তিনি জনআলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন। অনেকেই ডা. আবদুল্লাহর সততা, মানবিকতা এবং অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এড়িয়ে চলার চর্চার প্রশংসা করছেন। তার অনেক সাবেক শিক্ষার্থীও তার কাছ থেকে পাওয়া সহায়তা ও দিকনির্দেশনার কথা লিখেছেন।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সিন্ডিকেট তার আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপকের নিয়োগ বাতিল এবং ওই পদে পাওয়া বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর তাকে নিয়ে নতুন করে এ আলোচনা শুরু হয়।
কেন বাতিল হলো ইমেরিটাস পদ?
বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস আদেশে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২০ জুন অনুষ্ঠিত ৯২তম সিন্ডিকেট সভায় আলোচ্যসূচির বাইরে 'ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ অধ্যাদেশ' সংশোধন করে তাকে পুনরায় আজীবন মেয়াদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। যেহেতু প্রক্রিয়াটি বিধিবহির্ভূত ছিল, তাই সেই নিয়োগ অনুমোদনযোগ্য নয়।
একই সঙ্গে ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার উত্তোলিত বেতন-ভাতাও ফেরত দিতে বলা হয়।
বিএমইউ কর্তৃপক্ষের দাবি, ইমেরিটাস অধ্যাপক হওয়ার পর প্রায় দুই বছর তিনি নিয়মিত কর্মস্থলে আসেননি, শিক্ষাদান বা গবেষণায় সম্পৃক্ত ছিলেন না। তবে তিনি ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন। এ বাবদ প্রায় ১৪ লাখ টাকা গ্রহণ করেছেন বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি।
তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমি নিয়মিত বিএমইউতে যেতাম। তারা আমাকে কোনো ক্লাস দেয়নি। ইমেরিটাস অধ্যাপকদের ক্লাস দিতে হয়, একাডেমিক মিটিংয়ে ডাকতে হয়। ক্লাস ও রুটিন না দিলে আমি কীভাবে ক্লাস নেব?"
তিনি আরও বলেন, "টাকার যে হিসাব দেওয়া হয়েছে সেটিও সঠিক নয়। আমি তো অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক, পেনশন পাবই। পেনশনের টাকার সঙ্গে এটি যোগ করে হিসাব করা হয়েছে। এটি অন্যায়। অনেকেই আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে আমি নিরীহ মানুষ, দেখি তারা কী করে।"
'সম্মানিত মানুষকে অসম্মান করা ঠিক হয়নি'
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "বিধিবিধানের সমস্যার সমাধান বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। এতে ব্যক্তির দায় নেই। ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ ইমেরিটাস অধ্যাপক হওয়ার জন্য অযোগ্য নন। তাকে অযোগ্য বলা হয়নি, বলা হয়েছে বিধিবিধান ঠিক ছিল না।"
তার মতে, "বিধিবিধান ঠিক করার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের। এজন্য একজন সম্মানিত মানুষকে অসম্মান করা জাতির জন্য ভালো বার্তা নয়। এটি যদি রাজনৈতিক বিষয়ও হয়ে থাকে, তাহলেও তা দুঃখজনক। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননার ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।"
চার দশকের বেশি সময়ের চিকিৎসা ও শিক্ষাজীবন
বাংলাদেশের চিকিৎসা অঙ্গনের সুপরিচিত নাম অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ। চার দশকের বেশি সময় ধরে চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক ও লেখক হিসেবে দেশের স্বাস্থ্য খাতে অবদান রেখে চলেছেন তিনি।
১৯৫৪ সালে জামালপুরের ইসলামপুরে জন্ম নেওয়া ডা. আবদুল্লাহ ১৯৭৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। কর্মজীবনের শুরুতে গ্রামে চিকিৎসাসেবা দেন তিনি। পরে যোগ দেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পাঁচ বছর সৌদি আরবে কাজ করার পর যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানস থেকে এমআরসিপি ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৯৫ সালে তৎকালীন পিজি হাসপাতাল, বর্তমান বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে, সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন তিনি। পরে মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান এবং টানা তিনবার মেডিসিন অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি ১০টি বই লিখেছেন। এছাড়া বিশ্বখ্যাত Davidson's Principles and Practice of Medicine এবং Kumar & Clark's Clinical Medicine–এর আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য তিনি।
গবেষণা ও চিকিৎসা শিক্ষায় অবদানের জন্য তিনি ইউজিসি অ্যাওয়ার্ড, একুশে পদক ও বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলোশিপ পেয়েছেন। ২০১৯ সালে তিনি ইউজিসি অধ্যাপক হন। একই বছর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে সচিব পদমর্যাদায় নিয়োগ পান।
২০২২ সালে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়। পরবর্তীতে পুনরায় ওই পদে নিয়োগ পেলেও সম্প্রতি তা বাতিল করা হয়েছে।
