ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে, হাসপাতালে ভর্তি রোগীর ৭৮% বিভিন্ন জেলার
ঢাকার বাইরে দ্রুতগতিতে বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। চলতি বছর এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর ৭৮ শতাংশই ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলার। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি ঢাকার বাইরে হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু সংক্রমণ এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নেই; এটি দেশের অন্যান্য এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক কৌশলের বদলে সারা দেশে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তুতি বাড়ানো জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকাল পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজার ৩১৭ জন। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ৮৮৮ জন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে সাতজনই রাজধানীর বাইরের।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ডেঙ্গু একবার কোনো এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তা ধীরে ধীরে 'এপিডেমিক সাইকেল' অনুযায়ী বাড়ে এবং একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে গিয়ে কমতে শুরু করে।
তিনি বলেন, "ডেঙ্গুর বিস্তার মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে—ভাইরাস, বাহক মশা এবং সংবেদনশীল মানুষ। ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থাকায় এখানে ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ ইতোমধ্যে কোনো না কোনোভাবে সংক্রমিত হয়েছে। ফলে এখানে সংক্রমণের হার এখন কিছুটা কমতির দিকে।"
ড. কবিরুল বাশার আরও বলেন, অন্যদিকে যেসব জেলায় এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ সংক্রমিত হয়নি, সেসব এলাকায় ডেঙ্গু দ্রুত বাড়ছে। ঢাকা থেকে ডেঙ্গু ধীরে ধীরে অন্যান্য জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে এবং নতুন নতুন 'হটস্পট' তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, বরগুনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুরসহ উপকূলীয় জেলাগুলোতে ইতোমধ্যে সংক্রমণ বাড়ছে। একইসঙ্গে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলও ঝুঁকিতে রয়েছে। ভবিষ্যতে গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, চাঁদপুর, মাদারীপুর ও ময়মনসিংহে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেন তিনি।
"এটি এপিডেমিওলজিক্যাল ফোরকাস্টিংয়ের অংশ, যেখানে বিভিন্ন ফ্যাক্টর বিশ্লেষণ করে আগাম ঝুঁকি নির্ধারণ করা হয়," বলেন ড. কবিরুল বাশার।
ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার বেশি হওয়ার পেছনে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, "যেখানে রোগী ব্যবস্থাপনা ভালো, সেখানে মৃত্যুহার কম। আর যেখানে ব্যবস্থাপনা দুর্বল, সেখানে মৃত্যু বেশি।"
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এ বছর বরিশালে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। এখন পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে ১ হাজার ৪৪০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এরপর চট্টগ্রামে ১ হাজার ১৯ জন, ঢাকা বিভাগে সিটি করপোরেশনের বাইরে ৬৬৮ জন, খুলনায় ৫৮০ জন, রাজশাহীতে ১৯১ জন এবং ময়মনসিংহে ১৪৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম রংপুর ও সিলেটে। এই দুই বিভাগে যথাক্রমে ৩০ ও ৬০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ড. বেনজীর আহমেদ টিবিএসকে বলেন, ঢাকা সিটি বা বড় শহরগুলোতে মশক নিধন কর্মসূচি থাকলেও এবার মূল উদ্বেগ ঢাকার বাইরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে।
তিনি বলেন, "ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। গত বছর ঢাকার বাইরে ব্যাপক হারে ডেঙ্গু ছড়িয়েছে। তাই আমাদের ছোট পৌরসভা ও গ্রামগুলোর দিকে নজর দিতে হবে।"
দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ, এডিস মশা নিধন এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে প্রধান করে ১৯ সদস্যের একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করেছে সরকার।
বুধবার সকালে রাজধানীর গুলশান-২ এলাকায় টাস্কফোর্সের প্রথম মাঠপর্যায়ের অভিযান ও গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন টাস্কফোর্স প্রধান ও এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী।
এদিকে, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে এবং সারাদেশে ১৫৭ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। রাজধানীতে নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ১১ জন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং ২৮ জন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার।
ডেঙ্গুতে সর্বশেষ মৃত্যু দুটি হয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগে। সেখানে নতুন করে আরও তিনজন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
