পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য কূটনৈতিক সম্পর্কের বহুমুখীকরণ ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা: সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো— কূটনৈতিক সম্পর্কের বহুমুখীকরণ এবং কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা।
আজ বুধবার জাতীয় সংসদে নেত্রকোনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হিলালীর লিখিত প্রশ্নের উত্তরে এ কথা জানান তিনি।
রফিকুল ইসলাম হিলালী তার লিখিত প্রশ্নে জানতে চান, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী ও বহুমুখীকরণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
লিখিত জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'আমরা একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ঐতিহ্যগত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করছি। অন্যদিকে, আসিয়ানভুক্ত দেশ, পূর্ব ও মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র সৃষ্টি করছি।'
তিনি বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলের সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অভিবাসন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় কোনো একক অঞ্চল বা শক্তিকেন্দ্রের উপর নির্ভরশীল না থেকে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রদর্শিত বাস্তববাদী ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায় এবং প্রধানমন্ত্রীর 'সবার আগে বাংলাদেশ' দর্শনের আলোকে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হচ্ছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অতীতে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করেছে। বর্তমান সরকারের অবস্থান পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতা।
প্রতিবেশির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ন্যায্যতা, সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখছে। ভারতের সাথে ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সংযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতাসহ বিদ্যমান অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানে সরকার গঠনমূলক কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। এছাড়া মিয়ানমারের সাথেও বাংলাদেশ কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে বাংলাদেশ নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।
তিনি বলেন, আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের কল্যাণে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সার্ককে পুনরায় কার্যকর ও ফলপ্রসূ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। একই সঙ্গে বিমসটেককে গতিশীল করার জন্যও আমরা কাজ করছি।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শিল্প সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উদ্ভাবন, গবেষণা ও উন্নয়ন, সরবরাহ শৃঙ্খল সংযোগ এবং ব্লু ইকোনমির মতো নতুন ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার জন্য আমরা কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করেছি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, পূর্ব ও মধ্য এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকাকে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের নতুন গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার ও পণ্যের একটি ম্যাপিং এর কাজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সাথে সমন্বয় করে পরিচালনা করছে।
ড. খুলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে জনশক্তি রপ্তানি ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। বর্তমানে আমাদের শ্রমবাজারের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রীক। কিন্তু পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় শ্রমবাজারের বহুমুখীকরণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও পূর্ব ইউরোপের উদীয়মান বাজারগুলোতে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
